
‘হরিজন নারীর অধিকার ও কর্মপরিবেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে বাদাবন সংঘ ও প্রথম আলো।
১০ বাই ১০ বর্গফুটের ছোট ঘর। সেই ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। অস্বাস্থ্যকর টয়লেট। এমন পরিস্থিতিতে মাসিকের সময় সবচেয়ে বিপাকে পড়ে নারী ও কিশোরীরা। হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে নারী-কিশোরীরা আরও বেশি প্রান্তিক অবস্থানে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘হরিজন নারীর অধিকার ও কর্মপরিবেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথাগুলো উঠে আসে। যৌথভাবে বৈঠকটির আয়োজন করে বাদাবন সংঘ ও প্রথম আলো।
বৈঠকে বক্তারা বলেন, হরিজন সম্প্রদায়ের নারীদের বৈষম্য আর আর্থিক অনটনে পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়। পারিবারিক সহিংসতা ও বাল্যবিবাহের চাপ বাড়ে। এর মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করার কারণে হরিজন সম্প্রদায়ের নারী–পুরুষের প্রতি সমাজের উপেক্ষা তো আছেই। সিটি করপোরেশনের তালিকাভুক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে থাকতে না পারলে কলোনিতে থাকার জায়গা পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় হরিজন নারীরা জীবনমান উন্নয়ন ও নিজের পছন্দমতো জীবিকা পরিবর্তনের অধিকার চান।
‘চাইলেই পরিবর্তন আনা সম্ভব’
বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সভাপতি লেবু বাসফোর বলেন, হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতি মানুষের যে বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, সেটির প্রভাব পড়ে হরিজন নারীদের ওপরও। তাঁর ছোটবেলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনি পান করার জন্য এক পানির পাত্র থেকে পানি নিতে পারতেন না। একবার চাঁদা পরিশোধ করে এলাকার বনভোজনে যেতে পারেননি। এখনো অনেক জায়গায় হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি সমাজের বৈষম্যমূলক দৃষ্টি বিদ্যমান। দোকান থেকে একটি পান কিনে চুন নিতে গেলে দোকানকর্মী চুনের কৌটা স্পর্শ করতে দেন না। এ ধরনের বৈষম্যের মধ্যে হরিজন নারীদের এগিয়ে নিতে কী করা দরকার, সে বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে নেওয়া দরকার।
জীবিকা ও জীবনযাপনের মানে পরিবর্তন চান উল্লেখ করে দলিত নারী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সনু রানী দাস বলেন, যিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতে চান, তাঁকে সেভাবে কাজের সুযোগ দিতে হবে। তেমনি যাঁরা শিক্ষিত হয়ে উঠছেন, তাঁরা যেন চাইলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পেশা পরিবর্তন করতে পারেন—সেই সুযোগও দিতে হবে। সনু রানী দাস দাবি করেন, উচ্চমাধ্যমিক বা গ্র্যাজুয়েট হরিজন নারী চাকরি করতে গিয়ে চাকরি পাননি। কারণ, তাঁদের ঠিকানা দেখে নিয়োগকর্তা বুঝে যেতেন যে তাঁরা হরিজন সম্প্রদায়ের।
বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিমল ডোম বলেন, একদিকে পড়াশোনা করা শিক্ষিত হরিজন ছেলেমেয়েরা শুধু হরিজন হওয়ার কারণে চাকরি পাচ্ছেন না, অপর দিকে সিটি করপোরেশনে হরিজনদের জন্য নির্ধারিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কঠিন করে তোলা হয়েছে। আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান চাকরি দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের টাকা চায়। তিনি আরও বলেন, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে হরিজন নারীরাই বেশি ভূমিকা পালন করেন। এরপরও অধিকার বঞ্চনার কারণে নারীরা নিজেদের সম্প্রদায়েও অধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন।
হরিজন সম্প্রদায়ে পঞ্চায়েত থাকলেও সেখানে নারী প্রতিনিধিত্ব নেই জানিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য ইলিরা দেওয়ান বলেন, একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজে হেডম্যান ও কার্বারি পদে (ঐতিহ্যগত স্থানীয় সরকারের পদ) নারীরা ছিলেন না। এখন বেশ কিছু জায়গায় নারীরা এসব পদে আছেন। চাইলেই পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সূচনা বক্তব্যে বাদাবন সংঘের নির্বাহী পরিচালক লিপি রহমান বলেন, নারীদের মধ্যে হরিজন নারীরা আরও প্রান্তিক অবস্থানে। বাদাবন কাজ করছে হরিজন সম্প্রদায়ের নারীদের প্রতি বৈষম্য, নির্যাতনসহ অন্যান্য সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধানের উপায় বের করার জন্য। এ সমস্যাগুলো তুলে এনে সমাধানের উপায় বের করার ক্ষেত্রে হরিজন তরুণ–তরুণীদের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এসব সমস্যা নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানোই এই কার্যক্রমের লক্ষ্য।
‘রাজনীতিবিদদের আন্তরিক হতে হবে’
বৈঠকে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন শেখ বোরহানউদ্দিন কলেজের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. রহমত উল্লাহ। রাজধানীর পুরান ঢাকার মিরন জল্লা হরিজন সিটি কলোনিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত একটি ছোট গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, হরিজন সম্প্রদায়ে বৈষম্য অদৃশ্য হয়ে যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে এর রূপ পরিবর্তিত হয়েছে। একজন মেয়ে হয়তো এখন স্কুলে সরাসরি জাতিগত গালির শিকার হচ্ছে না; কিন্তু আর্থিক অনটন, পরিবারের কাজ, ছোট ভাইবোনের দেখাশোনার কারণে তাকে পড়াশোনা ছাড়তে হতে পারে। একজন নারী হয়তো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা পাচ্ছেন; কিন্তু তাঁকে এমন পরিবেশে থাকতে হচ্ছে, যেখানে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, ব্যক্তিগত স্যানিটেশনের সুবিধা নেই। গবেষণায় ৭ কিশোরী-তরুণীসহ ১৫ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে ‘বর্ণ ও বংশপরিচয়ভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিবিষয়ক কর্মপরিকল্পনা’ তৈরির সুপারিশ করা হয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা, মাসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর প্রতিনিধিত্ব, বিভিন্ন সামাজিক সেবা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়।
বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি কৃষ্ণ লাল বলেন, পঞ্চায়েতের বিধিতে এমন কোনো নিয়ম নেই যে নারীরা প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন না। হরিজন নারীদের মধ্যে ধীরে ধীরে শিক্ষার হার বাড়ছে। একদিন পঞ্চায়েতে নারী প্রতিনিধি আনার জন্যও পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন, নারী–পুরুষের অধিকার আদায়ে নিজের ইচ্ছেমতো পেশা পরিবর্তন ও জীবনমান উন্নয়নে পরিবর্তন আসা দরকার। এ বিষয়ে রাজনীতিবিদদের আন্তরিক হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাশেদা রওনক খান বলেন, হরিজন নারীদের সক্ষমতা রয়েছে; কিন্তু তাঁদের দাবিয়ে রাখা হয়। এই দাবিয়ে রাখার জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। হরিজন নারীদের তাঁদের শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসতে দিতে হবে। সেই শক্তি তৈরি করে দিতে হবে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পঞ্চায়েত ও যুবদের।
পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ‘আমরাই পারি’র (উই ক্যান) প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক বলেন, যারা শোষণ করে, তারাই কাজকে এভাবে ‘ছোট কাজ’, ‘বড় কাজ’ বলে ভাগ করেছে। এই ফাঁদে না পড়ে দাবি আদায় করতে হবে যে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ গুরুত্বপূর্ণ পেশা। এই পেশার যথাযথ সম্মান, অধিকার ও কর্মপরিবেশ দরকার।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন অভিযানের নির্বাহী পরিচালক বনানী বিশ্বাস, মধুপুরের আচিক মিচিক মহিলা উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সুলেখা ম্রং, কাটনারপাড়া নারী উন্নয়ন সংস্থার লতিফা ইয়াসমিন, সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের কারিগরি বিশেষজ্ঞ পারমিতা দাশ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কারী রুমা সুলতানা, বাদাবন সংঘের কর্মসূচি প্রধান ফারিহা জেসমিন, বাদাবন সংঘের ইয়ুথ মেন্টর নাজমুন নাহার ও বাদাবন সংঘের কর্মসূচি কর্মকর্তা নৌশিন নাওয়াল চৌধুরী।
বৈঠকে হরিজন সম্প্রদায়ে বাল্যবিবাহ, বৈষম্য, পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক সমস্যাগুলো তুলে ধরে পরিবর্তনের পক্ষে কাজে যুক্ত যুব প্রতিনিধি (ইয়ুথ শিফটর) প্রিয়াংসু কুমার ও পৃথ্বী সামুন্ধ তাঁদের কাজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত তথ্যচিত্রের নির্মাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাঈদ ওমর আল ফয়সাল, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের দপ্তর সম্পাদক রাজকুমার দাস ও সহদপ্তর সম্পাদক গজন লাল উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।