ইইউর সহযোগিতায় একশনএইডের সুশীল প্রকল্প ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে নাগরিক সংলাপ হয়।
পাহাড়ে আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প নেই। আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা হলে দুর্গম এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থী নেই—এমন নানা অজুহাত দূর হয়ে যাবে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়া সহজ হবে। অনেক অভিভাবকের কাছে মাতৃভাষায় শিক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে, সে বিভ্রান্তি দূর হবে এবং মাতৃভাষার সঙ্গে জাতীয় ভাষার সেতুবন্ধ হলে শিক্ষার গুণগত মান বাড়বে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেটে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা অন্তর্ভুক্তিকরণ: বান্দরবানের পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে এভাবে দুর্গম এলাকায় আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রাধিকারের বিষয়টি উঠে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহযোগিতায় একশনএইডের সুশীল প্রকল্প ও প্রথম আলো যৌথ উদ্যোগে এ সংলাপের আয়োজন করে। বান্দরবান জেলা শহরের হোটেল ডিমোরের মিলনায়তনে সংলাপ আয়োজনে সহযোগী হিসেবে ছিল স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা বিএনকেএস।
সংলাপে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের নেতা ও বিভিন্ন পেশাজীবী অংশ নেন। সংলাপে অংশ নেওয়া অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা বলেছেন, সমতলের সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তবতা এক নয়। কিন্তু বাজেট প্রণীত হয় সামগ্রিকভাবে সমতলের ধারণায়। যেমন সমতলের বাজেটে বিভিন্ন হাসপাতালে দেওয়া অ্যাম্বুলেন্স অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ি সড়কে চালানো যায় না।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাধবী মারমা বলেছেন, জাতীয়ভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট তৈরিতে ঘাটতি রয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না। তবে বর্তমান সরকার সেই ঘাটতিগুলো দূর করার জন্য পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও প্রান্তিক মানুষের চাহিদাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
হেডম্যান-কার্বারি কল্যাণ পরিষদের (হেকাকপ) সভাপতি উনিহ্লা মারমা বলেছেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট প্রতিটি পাড়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেওয়া সম্ভব নয়। তাই দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুদের শিক্ষার আওতার আনার জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে কয়েকটি আবাসিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা দরকার। এতে সরকারের অনেকগুলো বিদ্যালয় নির্মাণ ও শিক্ষক নিয়োগের ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে আবাসিক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালনা করাও সহজ হবে।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অং চ মং মারমা বলেছেন, আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার গুণগত মান বাড়বে, ঝরে পড়ার হার কমবে। শিক্ষার হার ও গুণগত মান বাড়লে উন্নয়ন টেকসই হবে। তিনি বলেন, অপেক্ষাকৃত কম দুর্গম বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও আবাসন ও যাতায়াতের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা দরকার। এর ফলে কর্মস্থলে শিক্ষক অনুপস্থিতি ও প্রক্সি শিক্ষকের সংখ্যা কমে আসবে।
উনিহ্লা ও অং চ মং মারমা উত্থাপিত প্রস্তাব সংলাপে বেশির ভাগ অংশগ্রহণকারী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা দরকার বলে মত প্রকাশ করেন।
বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য অংজাই উই চাক ও রাজুময় তঞ্চঙ্গ্যা বলেছেন, জলবায়ুজনিত পরিবেশগত সংকটে পাহাড়ে যেভাবে পানির সংকট তীব্র হচ্ছে; এর সমাধান না হলে পাহাড়ে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠবে।
রাজুময় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, এখানে উন্নয়ন অপরিকল্পিতভাবে হচ্ছে। পাহাড়ের উন্নয়ন পাহাড়ি মানুষ জানে না। উন্নয়ন করতে গিয়ে বন নাই হয়ে যাচ্ছে। সবশেষে পানির উৎসে পানি নাই হয়ে উঠেছে। স্থানীয় মানুষের মতামত ও অংশগ্রহণ না থাকায় একটি উন্নয়নে পরিবেশগত অবনয়ন হচ্ছে বহুভাবে।
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জসীম উদ্দিন বলেছেন, পানির সংকট সমাধানের বিষয়টি বান্দরবানের সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক নুক্রাচিং মারমা বলেছেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয়ের সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিবেশও বিপন্ন হয়ে পড়ছে। যেমন ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী প্লুং বা বাঁশি তৈরিতে বিশেষ প্রজাতির লাউয়ের খোল ও মৌমাছির মোম দরকার। কিন্তু প্রাকৃতিক বন সীমিত হয়ে আসায় জুমচাষ কম হচ্ছে। বিশেষ প্রজাতির লাউ চাষও কম হচ্ছে। বনাঞ্চল না থাকায় মৌমাছি উধাও হয়ে গেছে। তাই উপকরণের সংকটে ম্রো বাঁশিও একদিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু বাজেট যাঁরা তৈরি করেন, তাঁরা এসব বিষয় ভাবেন?
বান্দরবান প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেছেন, বাজেটে পার্বত্য অঞ্চলের কৃষিকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এই খাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও বহু স্তরে কর্মসংস্থান হতে পারে।
জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আব্দুচ সালাম আজাদ বলেছেন, পাহাড়ের মানুষ জুমচাষে অভ্যস্ত, এখন জুমচাষের পাশাপাশি উদ্যান ফসলের চাষ হচ্ছে। এই উৎপাদন ব্যবস্থাকে বহুস্তরীয় করার জন্য পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলায় গুরুত্ব দিতে হবে।
জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ম্যাম্যানু মারমা ও হেকাকপ সভাপতি উনিহ্লা মারমা বলেন, পর্যটন উন্নয়নে স্থানীয় লোকজনের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি করার সম্ভাবনা রয়েছে। আর স্থানীয় লোকজনের উদ্যোগ ও অংশগ্রহণ ছাড়া পর্যটন হলে ক্ষতির সম্মুখীনও হতে পারেন স্থানীয় লোকজন। সে জন্য স্থানীয় প্রাধান্য দিয়ে পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনা হতে পারে। এতে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে বাজেট বরাদ্দ থাকা দরকার।
আব্দুচ সালাম আজাদ বলেন, স্থানীয়ভাবে ইকোট্যুরিজম উন্নয়নে বাজেটে উদ্যোক্তাদের জন্য সুদবিহীন ঋণের বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।
আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং মারমা বলেন, বাজেট প্রণয়নে জনসম্পৃক্ততা না থাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে উন্নয়ন অবহেলার শিকার হয়। জাতীয় বাজেটে আলাদা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় না।
সংলাপের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর বান্দরবান প্রতিনিধি বুদ্ধজ্যোতি চাকমা। একশনএইডের লিড (উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটি) মরিয়ম নেছা সুশীল প্রকল্পের বাজেট সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সমষ্টির নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুর জামান। সংলাপ সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।