‘প্রতিটি হৃৎস্পন্দনই জীবন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে
‘প্রতিটি হৃৎস্পন্দনই জীবন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে

গোলটেবিল বৈঠক

হৃদ্‌রোগ নিয়ে সচেতনতা প্রয়োজন

বিশ্ব হার্ট দিবস সামনে রেখে এ বৈঠকের আয়োজন করে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ও প্রথম আলো

দেশে দেড় কোটির বেশি মানুষ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত। বছরে যত মানুষ মারা যায়, তাদের তিনজনের একজনের মৃত্যুর কারণ হৃদ্‌রোগ। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে হৃদ্‌রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। যা আছে, তারও বেশির ভাগ ঢাকাকেন্দ্রিক। অথচ যথাযথ চিকিৎসা ও নিয়মকানুন মেনে চললে হৃদ্‌রোগ ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। তাই হৃদ্‌রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘প্রতিটি হৃৎস্পন্দনই জীবন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে আসে। ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬ পালিত হবে। এ উপলক্ষে যৌথভাবে বৈঠকটির আয়োজন করে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ও প্রথম আলো। আয়োজনে সায়েন্টিফিক পার্টনার হিসেবে ছিল ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, বাংলাদেশে হৃদ্‌রোগের চিকিৎসার অবস্থা ভয়াবহ। রোগীদের জন্য সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত জায়গা নেই, অনেকে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এমনকি বেসরকারি হাসপাতাল, যেখানে লাখ লাখ টাকা লাগে, সেখানেও সিট নেই। সরকারি–বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে দেশে আইসিইউ বেড আছে মাত্র তিন হাজার। তারও বেশির ভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক। দুই শতাধিক কার্ডিয়াক সার্জনের মধ্যে ঢাকার বাইরে আছেন মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন। কার্ডিয়াক নার্স নেই বললেই চলে, কার্ডিয়াক টেকনিশিয়ানেরও প্রচুর ঘাটতি রয়েছে।

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসার প্রসার ঘটাতে চাইলে বিভাগীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করতে হবে উল্লেখ করে আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, চিকিৎসা সাশ্রয়ী করতে হলে সরকারকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। চিকিৎসাক্ষেত্রে ও হাসপাতালে কর আরও কমাতে হবে। বেসরকারি খাত যাতে এগিয়ে আসতে পারে, সে জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। গুরুত্ব দিয়ে হেলথ ইনস্যুরেন্স চালু করতে হবে।

‘বড় কিছু হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব’

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ফজিলা-তুন-নেসা মালিক বলেন, একজন ব্যক্তির জীবনে প্রতিটি হৃৎস্পন্দনই মূল্যবান। এগুলোকে যেন আমরা মূল্য দিই। ছোট ছোট লক্ষণকে অধিকাংশ মানুষই উপেক্ষা করেন। প্রতিটি হৃৎস্পন্দন ও লক্ষণকে গুরুত্ব দিলে বড় কিছু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সারা দেশে হৃদ্‌রোগ চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। ঢাকাটাই বাংলাদেশ—এই মনস্তত্ত্ব নিয়ে থাকলে হবে না। আমাদের চিকিৎকেরাও ঢাকার বাইরে যেতে চান না, রোগীরাও ঢাকার বাইরে আস্থা পান না। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে চিকিৎসাব্যবস্থার পরিসর অবশ্যই বাড়াতে হবে।’

দেশের আট বিভাগে সরকারি উদ্যোগে আটটি কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়ে নাজমুল হোসেন বলেন, এসব কেন্দ্রে একই প্যাকেজের মধ্যে ক্যানসার, কিডনি ও শিশু হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা থাকবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘দেশের ১২ থেকে ১৩ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাঁদের ক্ষেত্রে সহজে স্বাস্থ্যবিমা চালু করা সম্ভব। কিন্তু বাকি যে ৮৭ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছেন, তাঁদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা দুঃসাধ্য ব্যাপার। এখন এই ৮৭ শতাংশ মানুষের প্রিমিয়াম যদি সরকার ভর্তুকি বা বিনা মূল্যে দিতে চায়, রাষ্ট্রের সেই সক্ষমতা তৈরি হয়নি। আবার সরকারি হাসপাতালকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনতে হলে আমাদের পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট রুলে (সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিধি) পরিবর্তন আনতে হবে।’ স্বাস্থ্যবিমার বিকল্প হিসেবে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল গঠনের পরামর্শ দেন তিনি।

ফ্যাক্টর ‘দক্ষিণ এশিয়া’

বৈশ্বিকভাবে ও বাংলাদেশে হার্ট অ্যাটাকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে জানিয়ে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ বদিউজ্জামান বলেন, একসময় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বেশি কোলেস্টেরেলকে ঝুঁকি বলা হতো। এর সঙ্গে এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে, আপনি দক্ষিণ এশিয়ার কি না। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দা হওয়াকে একটি আলাদা ঝুঁকির ফ্যাক্টর হিসেবে দেখে। এর কারণের মধ্যে আছে জিনগত বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে লাইপোপ্রেটিন(এ)—যার ওপর কোনো ওষুধ বা খাদ্যের প্রভাব নেই। সারা বিশ্বের লাইপোপ্রোটিন(এ)-এর এক-তৃতীয়াংশ দক্ষিণ এশিয়ায়। পরিবারে কারও হার্টের সমস্যা থাকলে শিশু অবস্থা থেকে তাঁকে স্বাস্থ্যকর খাবারসহ সুরক্ষায় রাখতে হবে।

দেশে এখন বাইপাস সার্জারির ৯০ শতাংশই দেশে হয় জানিয়ে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মেজর (অব.) এম কামরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘এই সার্জারি ঝুঁকিপূর্ণ, তাই এই চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত লোক দরকার। প্রশিক্ষিত লোক যথেষ্ট নেই, যা আছে বেশির ভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ আলাদা হলেও কারণগুলো একই রকম। রক্তনালির অসুখ হলে তার প্রভাব মস্তিষ্কে পড়বেই। এই দুই রোগের প্রতিরোধের ব্যবস্থাও একই। সমন্বিত প্রয়াসে এই রোগ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধ করা সম্ভব। সেদিকে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

দেশে ১৫ লাখের মতো মানুষ জন্মগত হদ্‌রোগ নিয়ে বড় হচ্ছে উল্লেখ করে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. তওফিক শাহরিয়ার হক বলেন, সন্তানের সুস্থতার বিষয়ে সবার আগে সচেতন হতে হবে মায়েদের। মায়ের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা থাকলে আগে থেকে তাঁকে সচেতন হতে হবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম সাইফুদ্দিন বলেন, ‘ডায়াবেটিসের রোগীদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি। আমাদের রোগীদের ধারণা, শুধু উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই হার্ট অ্যাটাক কমে যাবে। আসলে একটা হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ (সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি) দরকার।’

দরকার সুষ্ঠু খাদ্যাভ্যাস

ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক আশরাফ উদ্দীন আহমেদ বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্‌টা প্রথম থেকেই দেশে নতুন নতুন ওষুধ নিয়ে আসতে চেষ্টা করেছে। কত কম দামে ওষুধ মানুষকে দেওয়া যায়, এখন সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।

পুষ্টিবিদ ও খাদ্যবিশেষজ্ঞ সৈয়দা ফারহানা মাহমুদ বলেন, ‘তরুণদের হার্টের রোগের ক্ষেত্রে যাঁদের সমস্যা বংশগত, সেখানে কারও হাত নেই। হাত আছে আমাদের দৈনিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভাসে। লাইফস্টাইল মোডিফিকেশন (জীবনযাত্রার পরিবর্তন) এলে এর প্রকোপ কমানো যাবে। তাই শিশু বয়স থেকে পরিবারেই সুন্দর-সুষ্ঠু খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।