প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
এম শামসুল আলম
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা। অধ্যাপক ও ডিন, প্রকৌশল অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
আমরা বহু বছর ধরে লড়ছি—ফুলবাড়ি থেকে রামপাল, শনির আখড়া থেকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—প্রতিটি জায়গায় আন্দোলন হয়েছে, মানুষ প্রাণ দিয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম, সরকারকে কথা শোনাতে পারব।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝেছি, বিদায়ী সরকার ইডকলের সোলার হোম সিস্টেম ও মিনিগ্রিডের গল্প শুনিয়ে শেষ মুহূর্তে মিনিগ্রিড ন্যাশনালাইজ করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ কেনার কথা বলা হলেও, সেই বিদ্যুৎ কোথায় গেল, তার কোনো জবাব আমরা পাইনি।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে করতে আমরা এক জায়গায় পৌঁছেছি—নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। তেল আমদানি কমানো যায়, ডলার সাশ্রয় করা যায়।
ঠিক তখনই সরকারের পরিবর্তন হলো এবং আমরা মনে করলাম, এটি একটি বড় সুযোগ। কিন্তু দেখা গেল, এই সরকারের আমলেই ঘাটতি ৯৪ শতাংশ বেড়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে ১২ টাকার ওপরে।
যেখানে পাকিস্তান বা ভারত কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, সেখানে আমরা এখনো নিজেদের সক্ষম মনে করতে পারছি না।
এখন আরও স্পষ্ট যে দেশে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। টাকা তৈরি হচ্ছে, আর সেই টাকা পাচার হচ্ছে। শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, শুধু বিদ্যুৎ খাত থেকেই ছয় বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে।
আজ বিদ্যুতের দাম যদি ১২ টাকায় থাকে, আর প্রতিবেশী দেশ থেকে ৮–৯ টাকায় বিদ্যুৎ আসে, তাহলে আমরা নিজেদের বাজারে আমদানির সুযোগ তৈরি করছি। ট্রান্সমিশন লাইন এখন প্রস্তুত, ব্যবসায়ীদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনও নেই।
আমরা যখন বুঝতে শিখেছি যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমাদের সমস্যার সমাধান হতে পারে, তখন অবস্থা এমন হয়েছে যে নিজের উৎপাদনের প্রয়োজনই আর রইল না।
যে রাষ্ট্রযন্ত্র লুটপাটের কাঠামো তৈরি করেছে, তাকে শুধু টাকা দিয়ে ঠিক করা যাবে না।
যার নীতি ও দর্শন ঠিক নেই, সে ভুলে ভরা মাস্টারপ্ল্যান বানিয়ে যাবে। এই অর্থনীতিতে যত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তার কোনো বাস্তব জায়গা নেই—যেখানে রাষ্ট্রের শক্তি ব্যবহার করে লুটপাট হয় এবং টাকা পাচার হয়। সরকার মানুক বা না মানুক, ইতিহাস যেন জানে আমরা চুপ করে থাকিনি।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাংলাদেশের জন্য কোনো মিথ নয়, এটি এখন বাস্তবতা। গত সরকারের সময় জমি নেই, খরচ বেশি—এ ধরনের যুক্তি দিয়ে একে অবাস্তব প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। আজ এটি সফল প্রযুক্তি, বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর প্রযুক্তি হিসেবে প্রমাণিত।
যত দিন ফসিল ফুয়েল খাত প্রাধান্য ধরে রাখবে এবং ফেজ আউট হবে না, তত দিন নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারী তখনই আসবেন, যখন তাঁরা রিটার্নের নিশ্চয়তা দেখবেন। তাই ফসিল ফুয়েল থেকে জায়গা তৈরি না করলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সব সময় চ্যালেঞ্জের মুখে থাকবে।
এখানে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ম্যাক্রো থেকে মেসো ও মাইক্রো পর্যায়ে আনতে হবে। নীতিনির্ভর আলোচনার বাইরে গিয়ে বাস্তবায়ন, অপারেশন ও লজিস্টিক দিকগুলোতে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
আমাদের ইনস্টিটিউশনগুলো এখনো ফসিল ফুয়েলকেন্দ্রিক। এই কাঠামো দিয়ে এনার্জি ট্রানজিশন সম্ভব নয়। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য। বোর্ড, প্রশিক্ষণ, মানবসম্পদ—সব জায়গায় ফসিল ফুয়েলের প্রভাব আছে। বিদ্যুৎ–সংযোগ দেওয়ার দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান সংযোগ দেয় না; কারণ, ফসিল প্ল্যান্ট থেকে তাদের আয় আসে। এটি একধরনের প্রতিরক্ষামূলক স্বার্থ।
কাগজে ভালো কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। ইপিএসএমপির ভেতরে নীতিগত ভ্রান্তি রয়েছে। টেকনিক্যাল পর্যায়ে কর্মরত জনবলের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, ফলে আগ্রহও নেই। মানবসম্পদ পর্যায় থেকেও বাধা তৈরি হচ্ছে।
ফসিল ফুয়েলের জন্য একধরনের আর্থিক সুবিধা কাঠামো আর নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য অন্যটি—এই বৈষম্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কম প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে। ব্যাংকগুলো ক্যাপাসিটি পেমেন্টের নিশ্চয়তা না পেলে ঝুঁকি নিতে চায় না।
গত সরকারের সময় সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি খাত, বিদেশি কোম্পানি ও বিদেশি সরকারের মধ্যে একটি শক্ত নেক্সাস তৈরি হয়েছিল। এমনকি নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এর প্রভাব পড়েছে। বিদেশি দেশগুলো পলিসি প্রণয়নে ঢুকে পড়েছে, যেখানে এলএনজি ও কয়লাকে ঘুরিয়ে নবায়নযোগ্য খাত বানানোর চেষ্টা দেখা গেছে। সমাধানের পথে আমাদের ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জিতে জোর দিতে হবে।
নবায়নযোগ্য খাতকে এগিয়ে নিতে জ্বালানি সাংবাদিক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের বদলে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি সাংবাদিক’ ও ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ’ প্রয়োজন।
শফিকুল আলম
লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট (বাংলাদেশ), আইইইএফএ
আমরা আঞ্চলিক বাস্তবতার দিকে তাকাই। ভারত বহু বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কাজ করছে। প্রথমে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭৫ গিগাওয়াটের লক্ষ্য নির্ধারণ করে তারা বুঝেছে, সেটি আরও আগেই অর্জন সম্ভব। তাই লক্ষ্য বাড়িয়ে ৫০০ গিগাওয়াটে নেওয়া হয়েছে। এখন তারা শুধু ইনস্টল ক্যাপাসিটি নয়, মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এর জন্য তারা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, রিনিউয়েবল এনার্জি সার্টিফিকেট, ক্যাপিটাল সাবসিডিসহ নানা নীতিগত উপকরণ ব্যবহার করেছে। ভারতের ইউটিলিটি স্কেল সৌর প্রকল্পের সাফল্যের বড় কারণ হলো জমির সহজ প্রাপ্যতা ও উচ্চ সৌর বিকিরণ।
আমাদের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা আছে। বছরে গড়ে চার ঘণ্টার কম সৌর বিকিরণ অনেক প্রকল্পেই দেখা যায়, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। পাকিস্তান বা ভারতের তুলনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। ডলারনির্ভর ঋণ ও আর্থিক কাঠামোর কারণে আমাদের সৌরবিদ্যুতের দাম বেড়েছে।
শ্রীলঙ্কার মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার বড় অংশ নবায়নযোগ্য, যেখানে সৌরবিদ্যুতের উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে রুফটপ সোলার থেকে। অর্থাৎ রুফটপ সোলারে সাফল্য শুধু আমাদের জন্য অধরা নয়, অন্যরাও তা পারছে।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—আমরা কেন পারছি না? এর উত্তর খুঁজতে গেলে ২০১০ সালের পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে সংশোধনগুলো দেখতে হয়। বারবার বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি যোগ করলে খরচ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো। নবায়নযোগ্য না বাড়িয়েও বিদ্যুতের গড় খরচ ২ টাকা ৬০ পয়সা থেকে বেড়ে ১২ টাকার বেশি হয়েছে।
তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার অভাব আছে। ক্যাপটিভ জেনারেশন হিসাবের বাইরে রেখে সক্ষমতার হিসাব দেখানো হয়, যা প্রকৃত চিত্র আড়াল করে।
পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের দ্রুত বিস্তার হয়েছে ভয়াবহ বিদ্যুৎ–সংকটের চাপে। বাংলাদেশেও সংকট ছিল, কিন্তু সেই চাপ নীতিতে রূপ নেয়নি।
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রকল্প ও বিনিয়োগ পাইপলাইনের অভাব, ক্রেডিট রেটিংয়ের দুর্বলতা এবং বড় অঙ্কের পেমেন্ট বকেয়া।
এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হচ্ছে না। রুফটপ সোলার ছিল একটি বড় সুযোগ। কিন্তু কর্মসূচি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যেখানে সীমাবদ্ধতা আগে থেকে বিবেচনায় আনা হয়নি। শুল্ক ছাড়, ধাপে ধাপে লক্ষ্য নির্ধারণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি নির্ধারণ হলে ফল ভিন্ন হতে পারত।
মোস্তফা আল মাহমুদ
সভাপতি, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উত্তরণ কেন ঘটছে না—এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যার শিকড় মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নীতিনির্ধারণের স্তরেই আটকে আছে। এই জায়গায় দৃঢ় ও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়। বিদ্যুতের গড় খরচ নিয়ে যে সংখ্যা আমরা দেখি, বাস্তবে তার পেছনের অনেক ব্যয় হিসাবের বাইরে থেকে যায়—গ্রিড অবকাঠামো, আমদানি জ্বালানির করমুক্ত সুবিধা, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি অপচয় ও চুরি—এসব উপাদান বিবেচনায় না রেখে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ব্যয়বহুল বলা হচ্ছে।
এটি একধরনের রাজনৈতিক অর্থনীতির ফল, যেখানে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোকে সুবিধা দিতে পুরো ব্যবস্থাই এমনভাবে সাজানো হয়েছে।
সৌর প্যানেলের কর নির্ধারণে বাস্তব বাজারদর প্রতিফলিত হচ্ছে না। বিশ্ববাজারে দাম কম হলেও আমদানি পর্যায়ে এখনো উচ্চ কর বহাল, যা এই খাতের বিকাশকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করছে।
অথচ প্রযুক্তিগতভাবে সৌরবিদ্যুতে বড় কোনো সীমাবদ্ধতা নেই—রিসাইক্লিং ছাড়া প্রায় সব দিকেই এটি প্রতিযোগিতামূলক ও কার্যকর। তবু নীতিগত জটিলতা, অতিরিক্ত কর এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।
মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট। বিএসটিআই পরীক্ষাসহ বিভিন্ন অনুমোদনে মাসের পর মাস সময় লাগে। একটি কারখানায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চার মাসেও সংযোগ পায় না—ফলে বিনিয়োগের সুদ, উৎপাদন ক্ষতি ও আস্থার সংকট তৈরি হয়।
এই বাস্তবতা ব্যবসায়ীদের ধৈর্য ভেঙে দিচ্ছে। নীতিমালা প্রণয়নে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা উপেক্ষিত হয়—ফলে বড় লক্ষ্য ঘোষণা করেও বাস্তবে অগ্রগতি শূন্যের কাছাকাছি থাকে। এতে রাষ্ট্র ও ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়।
নীতিগত সাহসী সিদ্ধান্ত নিলে চিত্র বদলানো সম্ভব। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হলে গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গায় দেশি-বিদেশি পুঁজি আসবে। সেই সঙ্গে কর্মসংস্থান তৈরি হবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
চরাঞ্চল বা নদীবেষ্টিত এলাকায় সৌর ও কৃষির সমন্বিত ব্যবহার, অ্যাগ্রো-সোলার কিংবা রুফটপ সোলার—এসবের বাস্তব সম্ভাবনা আছে। প্রাইভেট সেক্টরের সক্ষমতাও ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিকভাবে দৃঢ়, সমন্বিত ও দ্রুত সিদ্ধান্ত। নবায়নযোগ্য জ্বালানি আর বিকল্প নয়—এটাই একমাত্র পথ।
মো. মহিউদ্দিন
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, প্রথম আলো
প্রায় ছয় দশক আগে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্য দিয়েই দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথচলা শুরু। যদিও কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র করার সময় পাহাড়িদের উচ্ছেদসহ কিছু বিষয় নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে এটা সত্য, ১৯৫৭ সালে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়েই দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার শুরু। দুঃখজনক হলো, এরপর দীর্ঘ সময় আমরা আর নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে এগোতে পারিনি।
২০০৫-০৭ সময়ে দেশে ব্যাপক বিদ্যুৎ–ঘাটতি তৈরি হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল। ২০০৮ সাল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়তে শুরু করে এবং আজ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। ২০১২-১৩ সালেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ওই সময় থেকে প্রতিবছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে থাকে। আর উল্টো দিকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত কমতে থাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। গত এক যুগে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বেড়েছে মাত্র ২.১৬ শতাংশ।
তবে মহাপরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বারবার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৬ সালের পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ২০২১ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসবে। সেটি হয়নি। পরে ২০২৫ সালের কথা বলা হলো। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে এসে দেখি, মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ মাত্র ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত অংশ প্রায় ৪ শতাংশ।
বিদ্যুৎ খাত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বের হতে পারছে না, এটি এখনো মূলত গ্যাসনির্ভর। গ্রিডের প্রায় ৪৩ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে গ্যাস থেকে, যদিও এর বড় অংশ এখন আমদানি করা এলএনজি, যা আর সস্তা নয়। গ্যাস কমতে শুরু করলে সরকার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঝুঁকে পড়ে—ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল। শুরুতে ফার্নেস সস্তা মনে হলেও পরে ইউনিটপ্রতি খরচ ১৭-২০ টাকায় পৌঁছায়। ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ তো আরও ব্যয়বহুল—৩০-৩৫ টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে যোগ হয় ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের সুবিধা। এমনকি ২০১৮ সালে অপ্রয়োজনীয় একটি বড় ডিজেল কেন্দ্র স্থাপন করা হয়, যা তিন বছরে খুব সামান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও বিপুল ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ হয়নি।
কাগজে-কলমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বড় বড় লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে অগ্রগতি ছিল না। বর্তমান সরকার ২০৩০ সালে ২০ শতাংশ ও ২০৪১ সালে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। নীতিমালাও হয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি চোখে পড়ে না; বরং বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের পর বেসরকারি খাতের ৩৭টি নবায়নযোগ্য প্রকল্পের সম্মতিপত্র বাতিল করা হয়েছে। পরে দরপত্র আহ্বান করার পর আগের চেয়ে খরচ অনেক কমেছে। তবে আমরা অন্তত দেড় বছর পিছিয়ে গেছি। দরপত্রও খুব একটা প্রতিযোগিতামূলক হয়নি। বিদেশিরা আগ্রহ দেখায়নি। পুনঃদরপত্র ডাকতে হয়েছে।
টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, নবায়নযোগ্য প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে আমাদের ইউনিটপ্রতি খরচ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। ২০১০-২৩ সময়ে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ হলেও এর মাত্র ৩ শতাংশ গেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে; বাকি গেছে জীবাশ্ম জ্বালানিতে, যেখানে দ্রুত মুনাফার সুযোগ ছিল।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার কথা বললেই বারবার জমির সংকটের কথা বলা হয়। কিন্তু ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিশাল সম্ভাবনা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। ভিয়েতনাম যেখানে ছাদ ব্যবহার করে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, সেখানে আমাদের সরকারি ভবনের ছাদে ঘোষিত লক্ষ্যের সামান্য অংশও অর্জিত হয়নি। কিছু অগ্রগতি হয়েছে শিল্পকারখানার ছাদ ব্যবহার করে। তবু গতি খুব ধীর। লক্ষ্য আছে, পরিকল্পনা আছে, কিন্তু বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা ও দৃঢ়তা নেই।
তানজিনা দিলশাদ
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়ন
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই চালু করা হয়েছে বাংলাদেশ রিনিউএবল এনার্জি ফ্যাসিলিটি। এই উদ্যোগে ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) থেকে প্রাপ্ত ৩৫০ মিলিয়ন ইউরোর ইউরোপীয় ইউনিয়ন-গ্যারান্টেড ঋণের সঙ্গে ৪৫ মিলিয়ন ইউরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুদান (গ্রান্ট) যুক্ত করা হয়েছে, যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ সম্ভব হয়।
ইআইবি বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্লাইমেট ব্যাংক হিসেবে কাজ করছে এবং গ্লোবাল গেটওয়ে ও টিম ইউরোপ কাঠামোর আওতায় গ্রান্ট, গ্যারান্টি ও টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স একসঙ্গে ব্যবহার করে ঝুঁকি কমিয়ে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাই এ কৌশলের মূল লক্ষ্য। টিম ইউরোপ বাংলাদেশে গ্রিন এনার্জি ট্রানজিশনে সমন্বিতভাবে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করেছে।
শুরুতে বাংলাদেশে সীমিত মেগাওয়াট প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম থাকলেও সরকারি ইউটিলিটি-স্কেল প্রকল্প এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য তুলে ধরে ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
ফ্যাসিলিটির অনুদানের একটি অংশ টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক মানে ব্যাংকেবল পর্যায়ে পৌঁছায়।
প্রাথমিকভাবে ইউটিলিটিগুলোর সাড়া সীমিত থাকলেও ধারাবাহিক সংলাপের মাধ্যমে কয়েকটি প্রাথমিক প্রকল্প চিহ্নিত হয়েছে। অনেক প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি থাকলেও আন্তর্জাতিক মান পূরণ হয়নি।
তাই প্রাক্-সম্ভাব্যতা যাচাই ও মান উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন নিশ্চিত হলে প্রকল্পের অর্থায়ন সম্ভব হয়। স্পষ্ট প্রকল্প পাইপলাইন, আন্তর্জাতিক মানের ভূমি প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি মেগাওয়াট লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কার্যকর উত্তরণের জন্য নীতিগত সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি জমির প্রাপ্যতায় স্পষ্টভাবে ল্যান্ড জোনিং নির্ধারণ করে, তবে বেসরকারি খাতের জন্য সমতাভিত্তিক পরিবেশ তৈরি হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির নির্ধারিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বিত ও ধারাবাহিক নীতি সংলাপ অব্যাহত রাখা অপরিহার্য।
হাসিবুর রহমান
নির্বাহী পরিচালক, মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের উত্তরণ কেবল প্রযুক্তিগত বা নীতিগত বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এ প্রক্রিয়ায় সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা নীতি নির্ধারণে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যমে জ্বালানিবিষয়ক, বিশেষত জ্বালানি রূপান্তর সংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সংখ্যা এখনো খুবই সীমিত। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমের মালিকানার সঙ্গে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের নেক্সাস। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরাও গভীরতাধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশে অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন। পাশাপাশি মামলার ভয়ও একটি বড় কারণ। ফলে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের মধ্যে সক্ষমতা ও সাহস থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না।
এই প্রেক্ষাপটে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে সহযোগিতা একটি কার্যকর পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সঙ্গে একটি পত্রিকার যৌথ উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে সাংবাদিক ও গবেষকদের মধ্যে সংযোগ তৈরি হলে প্রতিবেদনগুলো আরও মানবকেন্দ্রিক, প্রভাবশালী এবং নীতিনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। সাংবাদিকতা ও নীতি বিশ্লেষণের সমন্বিত প্রয়াস এই খাতকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে। এ ধরনের সহযোগিতা দেশের ভেতরে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও (ক্রস-বর্ডার কোলাবোরেশন) এর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নিউজরুমের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা অনেক সময় এই সম্ভাবনাগুলোকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়।
আমাদের মতে, নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জ্বালানিবিষয়ক সাংবাদিকতায় যুক্ত করা হলে প্রতিবেদনে নতুন ও ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হবে। নিউজরুমে কর্মরত প্রত্যেক সাংবাদিকই নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিবেদন তৈরির সক্ষমতা রাখেন, এখন মূল কাজটি হলো সেই সক্ষমতাকে বিকশিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সৃষ্টি করা। একই সঙ্গে জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে হলে এ খাতে যুক্ত নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের মধ্যে কার্যকর যোগসূত্র গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ।
ফারাহ আনজুম
বাংলাদেশ লিড, গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনস কাউন্সিল (জিএসসিসি)
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিতে শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন সুসংগঠিত রোডম্যাপ, স্বচ্ছ নীতিপ্রক্রিয়া এবং গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা।
আইপিএমপি বা এলএনজি এক্সপ্যানশন–কেন্দ্রিক নীতি থাকলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কোনো সুসংগঠিত রোডম্যাপ নেই। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালে ২০ শতাংশ ও ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা অর্জন, কিন্তু বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও রোডম্যাপ স্বচ্ছ নয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি নেই বললেই চলে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সঠিক ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই, সবখানে অস্পষ্টতা দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে লোন পুনর্বিন্যাস করে নবায়নযোগ্য প্রকল্পে ব্যবহার করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা এখানে কাজে লাগানো হচ্ছে না।
বাংলাদেশে ফসিল ফুয়েল–নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য খাতের উত্তরণ সম্ভব। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ নীতিমালা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সদ্ব্যবহার, মিডিয়ার স্বাধীন ভূমিকা এবং স্পষ্ট রোডম্যাপ। নবায়নযোগ্য খাতের জন্য প্রযুক্তি বা টাকা কেবল একটি অংশ মাত্র। গণমাধ্যম ও নীতিপ্রক্রিয়া মিলিয়ে কাজ না করলে বাংলাদেশের ফসিল ফুয়েল–নির্ভরতা কমানো কঠিন হয়ে থাকবে।
নেওয়াজুল মওলা
কো–অর্ডিনেটর (এনার্জি গভর্ন্যান্স), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হওয়ার মূল কারণ হলো নীতিমালা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিরাট ফারাক। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক অসামঞ্জস্য দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে। সর্বশেষ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা অনেক দক্ষভাবে তৈরি হলেও এটি পূর্বের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিকে উপেক্ষা করেছে। এতে ২০৩০ সালে ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালে ৩০ শতাংশ লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে কোনো সুসংগঠিত রোডম্যাপ নেই। ফলে নীতির সঙ্গে বাস্তবায়নের ফারাক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও কার্যক্রম সীমিত। সীমিতসংখ্যক জনবল দিয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসার–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণয়ন এবং কার্যক্রম বাস্তবায়নে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না।
অন্যদিকে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলো গ্রহণ বা সমন্বয় হচ্ছে না। এ খাত নিয়ে পরিচালিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ফলাফলের প্রতি সরকারের স্বীকৃতি না থাকা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত খরচ প্রাক্কলন এবং মেয়াদ বৃদ্ধিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি এ খাতের কার্যকারিতাকে আরও হ্রাস করছে।
নেট মিটারিংয়ের প্রসারসহ গ্রাহক পর্যায়ে সহনশীল প্রণোদনা এখনো সীমিত। ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত মাত্র ৩৭৬৩ সংযোগ হয়েছে, যা সামষ্টিকভাবে ১৮৫ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় ও আবাসিক পর্যায়ে এবং বেসরকারি উদ্যোগের প্রতি উদাসীনতা এবং প্রশাসনিক সহায়তার অভাব, এ অগ্রগতিকে আরও সীমিত করেছে।
এই বাস্তবতার মধ্যে প্রয়োজন—যোগ্য ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ নীতিপ্রক্রিয়া, সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় এবং সহনশীল প্রণোদনা। নীতিমালা বা পরিকল্পনা শুধু দাপ্তরিক নথি হিসেবে নয় বরং এগুলোকে বাস্তবায়নের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
পুরোনো ও অকার্যকর জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
গ্রিড আধুনিকীকরণ/উন্নয়ন/স্মার্ট গ্রিড সিস্টেমের জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজন।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক কর বা আর্থিক নীতিমালা প্রত্যাহার।
গৃহস্থালি, শিল্প, কৃষি ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিতরণের জন্য বৈচিত্র্যময় আর্থিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে জ্বালানি রূপান্তর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সাংবাদিক ও গবেষকদের মধ্যে কার্যকর সংযোগ জোরদার করা প্রয়োজন
নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক কমাতে স্পষ্ট ও সুসংগঠিত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সংশোধনী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একটি কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এম শামসুল আলম
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা। অধ্যাপক ও ডিন, প্রকৌশল অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
শফিকুল আলম
লিড এনার্জি এনালিস্ট (বাংলাদেশ), আইইইএফএ
মোস্তফা আল মাহমুদ
সভাপতি, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)
তানজিনা দিলশাদ
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়ন
হাসিবুর রহমান
নির্বাহী পরিচালক, মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)
ফারাহ আনজুম
বাংলাদেশ লিড, গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনস কাউন্সিল (জিএসসিসি)
নেওয়াজুল মওলা
কো অর্ডিনেটর (এনার্জি গভর্নেন্স),
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)
মো. মহিউদ্দিন
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, প্রথম আলো
সঞ্চালনা:
ফিরোজ চৌধুরী
সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো