‘টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যটন খাতে বিনিয়োগ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) খালিদ আহমেদ, মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী, আব্দুর রউফ, ম্যাক্স টুনন ও জাবেদ আহমেদ। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে
‘টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যটন খাতে বিনিয়োগ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) খালিদ আহমেদ, মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী, আব্দুর রউফ, ম্যাক্স টুনন ও  জাবেদ আহমেদ। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে

গোলটেবিল বৈঠক

পর্যটন বিকাশে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে 

‘টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যটন খাতে বিনিয়োগ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনার আয়োজক বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও প্রথম আলো

নীতি, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও সমন্বয়ের ঘাটতিতে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগছে না। টেকসই উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, দক্ষ জনবল ও পর্যটনকেন্দ্রের কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পাশাপাশি দেশের পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।

‘টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যটন খাতে বিনিয়োগ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন আলোচকেরা। গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও প্রথম আলোর আয়োজনে সহযোগিতায় ছিল জাতিসংঘের শ্রমবিষয়ক সংস্থা আইএলও বাংলাদেশ।

বৈঠকে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, পর্যটন খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দীর্ঘদিনের মহাপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। স্থানীয় বিনিয়োগ আরও টেকসই করতে ব্যাংক খাত থেকে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণে সমন্বিত বিধিমালা ও আচরণবিধি প্রণয়ন এবং বাংলাদেশের পর্যটনকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পর্যটন অনুবিভাগ) মো. আব্দুর রউফ বাংলাদেশের পর্যটনকে শুধু বিনোদনের খাত হিসেবে না দেখে শিল্প, সেবা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পর্যটনের আকর্ষণ ও সম্ভাবনা অনেক থাকলেও সেগুলোকে কার্যকর পর্যটন গন্তব্যে রূপান্তরের ক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবহন, নিরাপত্তা, আবাসন, খাবারসহ নানা ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। নীতিনির্ধারণ, কৌশল, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যটনের বিকাশ হলে নারী, পুরুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পর্যটন খাতের উন্নয়নে সমন্বয় ও পরিকল্পনার ঘাটতি দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন ম্যাক্স টুনন। আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ও প্রচারে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। এ ছাড়া দূতাবাস পর্যায়ে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা ও বিমানবন্দরের সেবাও বাড়ানো প্রয়োজন।

বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিতভাবে আসেনি

বৈঠকে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রোগ্রেস প্রকল্পের সমন্বয়কারী জাবেদ আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন মহাপরিকল্পনায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন ‘স্পট’ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি পর্যটন পণ্যে রূপ পেয়েছে, বাকিগুলো এখনো পর্যটনসম্পদ হিসেবেই রয়েছে। তাঁর মতে, পর্যটন খাতকে সরকারের অগ্রাধিকার না দেওয়ায় এ খাতে প্রয়োজনীয় সরকারি বিনিয়োগ হয়নি। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগও প্রত্যাশিতভাবে আসেনি।

টেকসই পর্যটন উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ, গণপরিবহন, বর্জ্য নিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল সংযোগের উন্নয়ন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন জাবেদ আহমেদ। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, গবেষণা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

পর্যটন খাতের সমস্যা ও করসংক্রান্ত জটিলতা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে জানাতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আহ্বান জানান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (বোর্ড প্রশাসন) খালিদ আহমেদ।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক মো. জিয়াউল হক হাওলাদার বলেন, পর্যটন খাতে খণ্ডিত বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ খাতে বড় প্রকল্প ও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা সরকারি অর্থায়নে সব সময় সম্ভব নয়। তাই সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকদের কাছ থেকে ফি

অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কারণে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্রগুলোর প্রতিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার। তিনি বলেন, পর্যটন টেকসই করতে হলে পর্যটকদের কাছ থেকে পরিবেশ সংরক্ষণের খরচ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের উপপরিচালক (পিপিপি বিভাগ) তাপস চন্দ্র বোস বলেন, পর্যটন খাতে পিপিপি প্রকল্প নিতে হলে আগে বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক মডেল, ঝুঁকি ভাগাভাগি ও দেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নির্ধারণ করতে হবে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ বলেন, পর্যটন খাতে অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, সেবার মান, প্রচার, সমন্বয় ও বিনিয়োগের পরিবেশ—এসব ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চ্যালেঞ্জ দূর করে দেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক ও দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, পর্যটন খাতে ২৭টি সরকারি সংস্থার সম্পৃক্ততার কারণে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠছে। এই সমন্বয়হীনতা ‘বিদেশি পর্যটন চেইন’ ও বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

‘কার্যকর সমন্বয় নেই’

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যামিউজমেন্ট পার্ক অ্যান্ড অ্যাট্র্যাকশনের প্রধান সমন্বয়ক এবং কনকর্ড গ্রুপের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক অনুপ কুমার সরকার বলেন, নিরাপত্তা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা দেওয়া না হলে এ খাতে বিনিয়োগ আরও কমতে পারে।

বেঙ্গল ট্যুরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ পর্যটনকে যথাযথভাবে প্রচার না করা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। তাঁর দাবি, পর্যটনের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় ২০টি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই।

উচ্চ কর ও ভ্যাটের কারণে বাংলাদেশের পর্যটন প্যাকেজের খরচ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেড়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সাইমন ওভারসিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফসিয়া জান্নাত সালেহ। তাঁর মতে, এ কারণে বিদেশি পর্যটকেরা বাংলাদেশে আসার পরিবর্তে অন্য গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন।

দেশের পর্যটন খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ওয়ান্ডারওম্যানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী সাবিরা মেহরিন সাবা। পর্যটন খাতের বিকাশে বিনিয়োগের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি।

পর্যটন খাতে নতুন বিনিয়োগ আনার আগে দেশে ইতিমধ্যে যাঁরা বিনিয়োগ করেছেন, তাঁদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইটাব) সভাপতি ইমরানুল আলম।

বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন আইএলও বাংলাদেশের হেড অব প্রোগ্রাম গুঞ্জন ডালাকোটি, প্রোগ্রেস প্রকল্পের প্রধান কারিগরি উপদেষ্টা পেদ্রো জুনিয়র বেলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন খান, বাংলালিংকের হেড অব এনভায়রনমেন্টাল, সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্ন্যান্স মো. তৌফিকুজ্জামান চৌধুরী, ভূমি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব এম কে হাসান মোর্শেদ। বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।