গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) মাহবুবুল করিম, শরিফুল ইসলাম হাসান, আরিফুল হক চৌধুরী, নুরুল কাদের ও আল-মামুনুল আনছারী। গতকাল কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে
গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) মাহবুবুল করিম, শরিফুল ইসলাম হাসান, আরিফুল হক চৌধুরী, নুরুল কাদের ও আল-মামুনুল আনছারী। গতকাল কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে

গোলটেবিল বৈঠক

বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও প্রথম আলো এই গোলটেবিল বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করে।

বাংলাদেশ থেকে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয় ও দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, তাঁদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ বাড়াতে হবে। অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও প্রতারণা বন্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

‘নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশফেরতদের পুনঃএকত্রীকরণ: বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় এর যৌথ আয়োজক ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও প্রথম আলো

বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বৈধতা, বিদেশে কর্মীর চাহিদাসহ অন্যান্য তথ্য ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আনা হবে। অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে সমাজের প্রতিটি স্তরকে যুক্ত করতে হবে।

প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী বলেন, অবৈধ পথে বিদেশ লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত চক্র চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ–হবিগঞ্জ থেকে শুরু করে মাদারীপুরসহ কয়েকটি জেলায় আগামী এক মাস ব্যাপক প্রচার চালানোর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

সচেতনতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দিয়ে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বিদেশি নিয়োগকর্তারা যে ধরনের কর্মীর চাহিদা দেন, অনেক ক্ষেত্রে সেই ধরনের দক্ষ কর্মী পাঠানো হয় না। এতে কর্মী ও নিয়োগকর্তা—উভয়েই সমস্যায় পড়েন। এ ক্ষেত্রে কোনো দেশ নির্দিষ্ট দক্ষতার কর্মী চাইলে সে দেশের নিয়োগকর্তার প্রতিনিধিদের যাচাই করে নেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ছয় হাজার গাড়িচালক সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।

প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর সরকারি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই কার্ড চালুর বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। এ ছাড়া আরবি ভাষায় অনেকটা এগিয়ে থাকা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অল্প সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলা, বিদেশে দক্ষ জনবল পাঠাতে দেশের বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা, নতুন নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, বিদেশফেরত কর্মীদের আগের পেশায় ফেরাতে সহায়তা, বিদেশে মারা যাওয়া প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনার পাশাপাশি পরিবারকে সহায়তার কথা তুলে ধরেন আরিফুল হক চৌধুরী।

গোলটেবিল বৈঠকে ধারণাপত্র তুলে ধরেন ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম হাসান। এতে বলা হয়, বিদেশফেরত ব্যক্তিদের বড় সমস্যা হলো সঞ্চয় না থাকা, বিদেশে অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ না পাওয়া এবং দেশে ফিরে নতুন করে জীবিকা শুরু করতে না পারা। নিরাপদ অভিবাসনের জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, পুলিশ ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাচারকারীদের প্রচারণা মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ধারণাপত্রে।

ব্যবসায়িক মডেল হিসেবে দেখার আহ্বান

ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রোগ্রাম ম্যানেজার নুরুল কাদের বলেন, অভিবাসনকে একটি ব্যবসায়িক মডেল হিসেবে দেখে সরকার, ব্যাংক, রিক্রুটিং এজেন্সিসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ ও দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে। তিনি বলেন, প্রতারণার শিকার হয়ে বিপুল অর্থ খরচ করে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে মানুষের মানসিকতা ও সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ডিআইজি (অপারেশনস) মো. আল-মামুনুল আনছারী বলেন, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে বিমানবন্দর, পাসপোর্ট ও ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ ব্যবস্থায় সমন্বয় দরকার। পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে দেওয়ার পর অনিয়মের ঝুঁকি বেড়েছে।

প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারী কর্মী পাঠানো গেলে সমস্যার বড় অংশ কমানো সম্ভব বলে মনে করেন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের যুগ্ম সচিব এবং রেইজ প্রকল্পের পরিচালক এ টি এম মাহবুব-উল করিম। তিনি বলেন, বিদেশ যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে ফেরত আসা কর্মীদের পুনর্বাসনের সমস্যাও চলতেই থাকবে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, অভিবাসন খাতের অনিয়ম বন্ধে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করে একটি সমন্বিত নীতি তৈরি করতে হবে। এ খাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসন—দুই ক্ষেত্রেই দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে উল্লেখ করে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) পরিচালক (দক্ষতামান ও পাঠ্যক্রম) জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বিদেশফেরত কর্মীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক (কিউএ অ্যান্ড আই) স্কোয়াড্রন লিডার রাকিব আহমেদ তাওয়াব বলেন, বিদেশফেরত অনেক কর্মী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় দেশে ফেরেন। তাঁদের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ভুয়া ভিসা, নথি ও বিএমইটি কার্ড নিয়ে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা ঠেকাতে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

বিদেশফেরত ব্যক্তিদের নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কাজের সমন্বয় করার পরামর্শ দেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার মাহসিন হামুদা। তিনি বলেন, যাঁরা বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন, তাঁদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগকে আরও সহজ করতে হবে।

বায়রার যুগ্ম সচিব ও প্রশাসক মো. বদরুল হক বলেন, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে হলে গ্রামপর্যায় পর্যন্ত দালাল ও অনিয়মের চক্র নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প জাতীয় সমিতির নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুর রিফাত খান বলেন, নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, বিদেশে দীর্ঘদিন কাজ করে ফেরত আসা অনেকের মধ্যে মানসিক চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট ও মূলধারায় যুক্ত হতে না পারার সমস্যা রয়েছে।

বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসন ও ব্যবসা শুরুতে অর্থায়ন সহজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এ টি এম আবু আসাদ বলেন, পাসপোর্ট নবায়নে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে ভুল তথ্য বা একাধিক পরিচয়ে পাসপোর্ট নেওয়ার পুরোনো প্রবণতার কারণে বিদেশের দূতাবাসগুলোতেও বাংলাদেশি পাসপোর্টের তথ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বৈঠকে লিবিয়াফেরত বাংলাদেশি হৃদয় চৌধুরী, মাহবুবুর রহমান, কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ফেরত তোফায়েল আহমেদ তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। আরও বক্তব্য দেন প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী লাবণ্য প্রজ্ঞা। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।