‘বরিশালের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্থানীয় সরকারের সমন্বয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) এ কে এম মশিউল মুনীর, বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন, শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল ও এস এম মনজুর-এ-এলাহী
‘বরিশালের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্থানীয় সরকারের সমন্বয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) 
এ কে এম মশিউল মুনীর, বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন, শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল ও এস এম 
মনজুর-এ-এলাহী

বরিশালে গোলটেবিল

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ের তাগিদ

স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করা অপরিহার্য। কারণ, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এই দুটি প্রতিষ্ঠানই সরাসরি জনগণের সঙ্গে কাজ করে। তাই পারস্পরিক সমন্বয় থাকলে তারা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে। এর মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জন–আস্থা অর্জন করা সম্ভব হবে।

‘বরিশালের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্থানীয় সরকারের সমন্বয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় নগরের বান্দ রোডের হোটেল গ্র্যান্ড পার্কের মিলনায়তনে এই বৈঠকের আয়োজন করে প্রথম আলো ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল।

সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা অংশ নেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান (শিরীন) বলেন, স্বাস্থ্য খাত দেশের সবচেয়ে বড় সেবা খাত, যার সঙ্গে কোটি মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন জড়িত। এ খাত নিয়ে আরও বেশি আলোচনা প্রয়োজন। তবে সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যদি তাঁদের পেশার সঙ্গে একাত্ম না হন, তাহলে সেবায় ঘাটতি থাকবেই। এই মানসিকতার ঘাটতি রয়েছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। দায়বদ্ধতা ছাড়া সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।

স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে এই খাতের উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করতে চান উল্লেখ করে বিলকিস আক্তার জাহান আরও বলেন, মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যেমন চিকিৎসকদের দায়িত্ব, তেমনি জনগণের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা তাঁর দায়িত্ব। তাই পারস্পরিক সমন্বয় করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ। সমস্যাগুলো জানাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বরিশাল অঞ্চলের প্রধান সরকারি হাসপাতাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নানা সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আরও বলেন, এসব সমস্যার পেছনে শুধু চিকিৎসক বা অবকাঠামো দায়ী নয়, বরং শক্তিশালী সিন্ডিকেট বড় বাধা। প্রশাসন যখনই এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চায়, তখনই তারা বাধার সৃষ্টি করে। তা সত্ত্বেও সাহস নিয়ে এদের বিরুদ্ধে কথা বলার আহ্বান জানান তিনি।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দেখেছেন হাসপাতালের ভেতরে মোটরসাইকেল চলাচল করছে, এমনকি রোগীদের লিফটেও মোটরসাইকেল ওঠানো-নামানো হচ্ছে। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড গড়ে তুলে ব্যবসা চলছিল। এ ছাড়া সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে পুরো ব্যবস্থাই জিম্মি হয়ে পড়েছিল। অনেক চেষ্টায় অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করা হলেও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ, সৌন্দর্যবর্ধন, মূল ফটক নির্মাণ এবং সিসিইউর অচল এসি চালু করা হয়েছে। সেবাগুলো অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে। শিগগিরই রেডিওথেরাপি যন্ত্র স্থাপন করা হবে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এমআরআই মেশিন অকেজো থাকলেও বারবার চিঠি দিয়েও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। জনবলসংকটে অনেক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে গতকাল ২ হাজার ৭৫২ জন রোগী ভর্তি আছেন উল্লেখ করে মশিউল মুনীর আরও বলেন, বহির্বিভাগে প্রতিদিন তিন হাজার রোগী সেবা নেন। সীমিত বাজেট দিয়ে এত বিপুলসংখ্যক রোগীর সেবা নিশ্চিত করা কঠিন।

গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় মানুষ সন্তুষ্ট নয়, এটি বাস্তবতা। তবে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও জনবল, অবকাঠামো ও সরঞ্জাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। তাই শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর দায় চাপিয়ে লাভ নেই। সেবা উন্নয়নে জনপ্রতিনিধিদের আরও সক্রিয় হতে হবে।

সিভিল সার্জন এস এম মনজুর-এ-এলাহী মতামত দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার দেড়-দুই গুণ রোগী থাকে। আমাদের লোকবল, সামর্থ্যও সীমিত। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

বরিশাল সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মলয় কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, ‘হাসপাতালের পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা খুবই নাজুক। আমরা বারবার এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে তাগিদ দিয়েও সাড়া পাচ্ছি না।’

বেসরকারি চিকিৎসা খাত অবজ্ঞা, অবহেলার শিকার

বেসরকারি খাত দেশের ৬৫ শতাংশ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে উল্লেখ করে বৈঠকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, তবু বেসরকারি চিকিৎসা খাত অবজ্ঞা, অবহেলার শিকার। সমালোচনা ও নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। এটা তাঁদের মর্মাহত করে। তিনি বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স সহজ করার দাবি জানান।

বরিশাল জেলা (দক্ষিণ) বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহীন বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকার গত ১৭ বছর যে বঞ্চনার ইতিহাস তৈরি করেছে, তা ঘোচাতে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হবে।’

গোলটেবিল বৈঠকে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা খাতের সমন্বয়ের উদ্যোগ নিতে সিটি করপোরেশনকে আহ্বান জানান নগর জামায়াতের নায়েবে আমির মাহমুদ হোসাইন।

স্বাস্থ্য খাতে গত ২৫ বছরে ৫ শতাংশ বাজেটও বাড়েনি উল্লেখ করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) জেলা সমন্বয়ক মনীষা চক্রবর্ত্তী বলেন, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বাজেট অন্তত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা উচিত। কারখানায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে যে আইন রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

সুজনের নগর সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, ক্লিনিক্যাল বর্জ্য যত্রতত্র খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে; যা নগরে স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমেই বাড়াচ্ছে। এ জন্য দ্রুত আধুনিক ব্যবস্থাপনা দরকার।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ‘চিকিৎসাসেবার সঙ্গে আমাদের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে এই সেবা আমরা প্রতিনিয়ত করছি। এটা যাতে বৃদ্ধি করা যায়, সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নিতে হবে।’

গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতে মাল্টি অ্যাডভোকেসি ফোরামের সদস্যসচিব মাহমুদ আল হোসাইন মামুন একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ, গণ অধিকার পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, এনসিপির জেলা আহ্বায়ক আবু সাঈদ মুছা, চন্দ্রদ্বীপ সোসাইটির প্রধান নির্বাহী সামিয়া আলী অন্না, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ব্লাড ডোনার ক্লাবের সভাপতি কামরুন নাহার মোহনা প্রমুখ। সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর বরিশালের নিজস্ব প্রতিবেদক এম জসীম উদ্দীন এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের উপপরিচালক দীপু হাফিজুর রহমান।