বিনোদন মাধ্যম ও জেন্ডার-সংবেদনশীলতা

নেদারল্যান্ডস সরকারের সহযোগিতায় প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট পরিচালিত ‘সমতায় তারুণ্য’ প্রকল্পের উদ্যোগে ‘বিনোদন মাধ্যম ও জেন্ডার-সংবেদনশীলতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২৩ জুলাই ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।

‘বিনোদন মাধ্যম ও জেন্ডার-সংবেদনশীলতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২৩ জুলাই ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
‘বিনোদন মাধ্যম ও জেন্ডার-সংবেদনশীলতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২৩ জুলাই ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।

আলোচনা

ডা. জাহেদ উর রহমান

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতি উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা)

আমরা এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আছি, যেখানে বিনোদন মাধ্যমও বাজার ও মুনাফার হিসাবের বাইরে নয়। ফলে যে ধরনের কনটেন্টের চাহিদা বেশি, নির্মাতারা স্বাভাবিকভাবেই সেদিকেই ঝুঁকবেন। কিন্তু জেন্ডার-সংবেদনশীল বিনোদন মাধ্যম নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু বাজারকে দায়ী করলে হবে না। আমাদের বুঝতে হবে, দর্শকের চাহিদা কীভাবে তৈরি হয় এবং কেন কিছু নির্দিষ্ট ধরনের কনটেন্ট বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ বাস্তবতাকে আরও জটিল করেছে। এখন অনেক সময় উসকানিমূলক, সংঘাতপূর্ণ বা বিতর্কিত কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা জেনে কিংবা না জেনে এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। তবে শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা দিয়ে এ পরিস্থিতির সমাধান সম্ভব নয়; বরং আমাদের এমন একটি পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করতে হবে, যেখানে দায়িত্বশীল ও জেন্ডার-সংবেদনশীল কনটেন্টও সমানভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে ও গ্রহণযোগ্যতা পায়। এ ক্ষেত্রে শিল্পের স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন। বয়সভিত্তিক সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যেতে পারে, যেন দর্শক উপযুক্ত কনটেন্ট বেছে নেওয়ার সুযোগ পান।

জেন্ডার-সংবেদনশীল বিনোদন মাধ্যম গড়ে তোলা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমষ্টিগত প্রক্রিয়া। এ জন্য রাষ্ট্র, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নির্মাতা, গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব পক্ষকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে সংবেদনশীল ও মানসম্মত কনটেন্ট নির্মাণে নীতিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। বাজারের বাইরে থেকেও ভালো কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

শুধু সমালোচনা করে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, ইতিবাচক উদ্যোগকে শক্তিশালী করাও জরুরি। তাই রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তার মাধ্যমে যাঁরা জেন্ডার-সংবেদনশীল বিনোদন মাধ্যম নিয়ে কাজ করতে চান, তাঁদের উৎসাহিত করতে হবে। কাজটি সহজ নয়। কারণ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও বৈশ্বিক বাস্তবতা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তারপরও আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

মাশফিকা জামান সাটিয়ার

সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার (জেন্ডার অ্যান্ড সিভিল সোসাইটি), নেদারল্যান্ডস দূতাবাস, ঢাকা

জেন্ডার-সংবেদনশীলতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, যখনই নারীর প্রতি সহিংসতা বা বৈষম্যের কথা বলি, তখনই বলা হয়, পুরুষেরও সমস্যা আছে। এটি একটি একপেশে ধারণা। পুরুষতান্ত্রিক একটি সমাজে বেড়ে ওঠায় নারী–পুরুষ–নির্বিশেষে পিতৃতান্ত্রিকতা দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত। কিন্তু এর প্রভাবে যাঁরা কাঠামোগতভাবে বেশি পিছিয়ে আছেন, তাঁদের এগিয়ে না আনলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সমতার অর্থ সবাইকে একই জায়গায় দাঁড় করানো নয়; বরং যাঁরা পিছিয়ে আছেন, তাঁদের এগিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করা। এ ভাবনাগুলো থেকেই আমাদের উদ্যোগের শুরু।

পরিবর্তনের শুরু পরিবার থেকে হলেও আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অনলাইননির্ভর সময়ে মানুষের চিন্তা ও আচরণ গঠনে বিনোদন মাধ্যমের প্রভাব অনেক বেশি। আমরা কোনো বিষয় পরিবারে না শিখলেও যদি পর্দায় বারবার সেটিকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখি, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে আমাদের মানসিকতার অংশ হয়ে যায়। তাই জেন্ডার-সংবেদনশীল সমাজ গঠনে বিনোদন মাধ্যমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মাধ্যম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

আমরা অতীতেও এর ইতিবাচক প্রভাব দেখেছি। যেমন ‘মীনা’ শিশুদের মধ্যে সমতা ও ন্যায্যতার বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছিল। একইভাবে নাটক, সিনেমা ও অন্যান্য বিনোদনমূলক কনটেন্টও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে। তাই শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, সামাজিক দায়িত্ববোধ নিয়েও কনটেন্ট নির্মাণ প্রয়োজন। ভালো ও সংবেদনশীল গল্প দর্শক গ্রহণ করবে না—এমন ধারণারও বাস্তব ভিত্তি নেই। অতীতে এমন অনেক সৃষ্টিশীল বিনোদনের উদাহরণ রয়েছে, যা দর্শক পুরো পরিবার নিয়ে উপভোগ করেছেন। এ ক্ষেত্রে নীতিগত সহায়তারও প্রয়োজন আছে। কনটেন্টে এমন ভাষা বা উপস্থাপন যেন না থাকে, যা নারী বা পুরুষ—কাউকেই অবমাননা করে বা কোনো ধরনের বৈষম্যকে উৎসাহিত করে। একই সঙ্গে যুবদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ, নতুন প্রজন্ম নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোতে চায়। তারা এমন সমাজ চায়, যেখানে মানুষকে পোশাক, পছন্দ বা পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা হবে না; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।

কবিতা বোস

কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

আমরা চারপাশে যা দেখি, তাই আমাদের চিন্তা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করে, বিশেষ করে শিশুদের মানসিক বিকাশে বিনোদন মাধ্যমের যে প্রভাব সেটি সারা জীবন

থেকে যায়। তাই জেন্ডার-সংবেদনশীল সমাজ গড়ে তুলতে হলে পরিবর্তনের শুরুটা পরিবার থেকে হলেও সেটিকে এগিয়ে নিতে হবে বিনোদন মাধ্যমের মাধ্যমে। শিশুরা যেন শৈশব থেকেই একটি সুস্থ বিনোদন পেয়ে বড় হতে পারে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যেই শিশু, কিশোর-কিশোরী, পরিবার ও অভিভাবকদের নিয়ে কাজ করে। আমরা চাই, সমতার মূল্যবোধ ছোটবেলা থেকেই গড়ে উঠুক। তবে শুধু পরিবার বা শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে এ পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিশু ও যুবদের চিন্তার জগৎ গঠনে নাটক, সিনেমা, গল্প এবং ডিজিটাল কনটেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই এমন গল্প প্রয়োজন, যা তাদের সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার স্বপ্ন দেখাবে।

গল্প বদলালে সমাজও বদলাতে শুরু করে। তাই শুধু সেই পরিচিত দৃশ্যগুলো বারবার দেখানোর প্রয়োজন নেই, যেখানে নারীকে নির্ভরশীল বা দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; বরং এমন গল্প তৈরি হতে পারে, যেখানে নারী-পুরুষ পরস্পরের সহযোগী। একই সঙ্গে নাটক বা সিনেমায় শুধু নারীর সংগ্রাম নয়, পুরুষের দায়িত্ব, মানসিক চাপ ও পারিবারিক বোঝাও তুলে ধরা উচিত। সংসার ও জীবনের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার বার্তা নতুন প্রজন্মকে আরও ইতিবাচকভাবে অনুপ্রাণিত করবে।

তবে সমাজে বৈষম্য ও হয়রানির বাস্তবতা এখনো রয়ে গেছে। এ পরিবর্তনের দায়িত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট বা নেদারল্যান্ডস দূতাবাস একা এ পরিবর্তন আনতে পারবে না। এটি একটি সমষ্টিগত সামাজিক আন্দোলন, যেখানে বিনোদন মাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমার বিশ্বাস, নতুন প্রজন্ম শুধু বিনোদন চায় না; তারা এমন গল্পও চায়, যা তাদের দায়িত্বশীল মানুষ হতে উদ্বুদ্ধ করবে।

মাসুম রেজা

নাট্যকার ও নির্দেশক

আমাদের অধিকাংশ নাট্যকার জেন্ডার-সংবেদনশীল নাটক বা চলচ্চিত্র নির্মাণের বিষয়টি এখনো গভীরভাবে বোঝার জায়গায় পৌঁছাতে পারেননি। আমরা অনেক সময় মনে করি, কোনো পুরুষকে রান্না করতে দেখানো বা ঘরের কাজ ভাগাভাগি করলেই জেন্ডার-সংবেদনশীলতা নিশ্চিত হয়। কিন্তু আমার কাছে প্রশ্নটি আরও গভীর। একজন নারী কোথায় আটকে যান, কোন সামাজিক কাঠামো তাঁর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ সংকুচিত করে—গল্পে সেই বাস্তবতাগুলো উঠে আসা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে

নারীকে জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ‘কবুল’ করতে বা সম্মতি দিতে শেখানো হয়। এই মানসিক কাঠামো না বুঝলে শক্তিশালী নারী চরিত্র নির্মাণও সম্ভব নয়।

আমরা অনেক সময় জেন্ডার-সংবেদনশীলতা, নারী-সংবেদনশীলতা এবং অশ্লীলতার প্রশ্নকে এক করে ফেলি। অথচ মূল বিষয় হওয়া উচিত নারীবান্ধব ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষা, পেশা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো বিষয়গুলোও জেন্ডার-সংবেদনশীলতার অংশ। মেয়েদের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে আরও ইতিবাচকভাবে গল্পে তুলে ধরতে হবে।

তবে শুধু নাট্যকারের বোঝাপড়া থাকলেই হবে না। বাস্তবে কাজ করতে গিয়ে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। প্রযোজক বা বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই বলেন, নারীকেন্দ্রিক গল্প চলবে না, দর্শক দেখবে না। এখন পুরো শিল্পে ‘ভিউ’ একটি বড় বাস্তবতা। টেলিভিশনে একটি নাটক এক নামে প্রচারিত হলেও ইউটিউবে সেটির নাম বদলে চটকদার করা হয়, যাতে বেশি দর্শক পাওয়া যায়। এই বাণিজ্যিক চাপ অনেক সময় সংবেদনশীল গল্প বলার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নাট্যকারদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নীতিগত দিকনির্দেশনাও প্রয়োজন। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে অসংবেদনশীল উপস্থাপনাকে নিরুৎসাহিত করা হবে, আবার সৃজনশীল স্বাধীনতাও অক্ষুণ্ন থাকবে। একটি নাটক বা চলচ্চিত্র মানুষের চিন্তা ও আচরণে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, আমরা অতীতে তার উদাহরণ দেখেছি। তাই দায়িত্বশীল গল্প বলার গুরুত্ব অনেক।

নিশাত সুলতানা

ডিরেক্টর–ইনফ্লুয়েন্সিং, ক্যাম্পেইন ও কমিউনিকেশন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শিশু, বিশেষ করে কন্যাশিশু ও যুব নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে। আমরা এই প্রক্রিয়ায় তরুণদের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করি যেন তাদের নেতৃত্বে সমাজে সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীর প্রতি সহিংসতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিই, শুধু সামাজিক বা পারিবারিক পর্যায়ে নয়, গণমাধ্যম ও বিনোদনমাধ্যমেও জেন্ডার-সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ লক্ষ্যেই আমরা যুব নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি গণমাধ্যম, কনটেন্ট নির্মাতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছি, যাতে তাঁরা সংবেদনশীল ভাষা ও দায়িত্বশীল কনটেন্টের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারেন।

জেন্ডার-সংবেদনশীল চিত্রনাট্য নিয়ে স্ক্রিপ্ট রাইটারদের সঙ্গে আলোচনায় আমরা দেখেছি, তাঁদেরও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একদিকে দর্শকের চাহিদা ও ভিউভিত্তিক বাণিজ্য আর অন্যদিক বিনিয়োগের চাপ ও প্রচলিত সামাজিক ধারণাগত চ্যালেঞ্জ—দুইয়ের মধ্যেই তাঁদের কাজ করতে হয়। আমাদের প্রচলিত নাটক ও চলচ্চিত্রে এখনো নারীকে অনেক ক্ষেত্রে গৃহস্থালি ভূমিকায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়। আবার কর্মজীবী ও আত্মনির্ভরশীল নারীকে অনেক সময় পারিবারিক অস্থিরতার কারণ হিসেবে দেখানো হয়। অন্যদিকে পুরুষ চরিত্রকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন আবেগ প্রকাশ তার জন্য দুর্বলতার বিষয়। শিশুদের কনটেন্টেও একই ধরনের জেন্ডার স্টেরিওটাইপের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। এমনকি নাটকের শিরোনাম ও সংলাপেও অসংবেদনশীল ভাষার ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

এটি শুধু ব্যক্তি বা লেখকের সীমাবদ্ধতা নয়; আমরা সবাই একটি পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বড় হয়েছি। তাই সচেতনতা ও ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। নিয়মিত সংলাপ, সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহারে প্রশিক্ষণ, অভিনয়শিল্পীদের ওরিয়েন্টেশন এবং চিত্রনাট্য রচনায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিশুদের কনটেন্টের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে এবং ভালো কনটেন্টকে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, বিনোদনমাধ্যম শুধু জনপ্রিয়তার জন্য নয়, একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাপূর্ণ সমাজ গঠনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।

মাহিন নেওয়াজ চৌধুরী

পরিচালক–প্রোগ্রামস, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

আমরা প্রায়ই বলি, দর্শকের চাহিদার কারণে নির্দিষ্ট ধরনের কনটেন্ট তৈরি হয়।

কিন্তু সেই দর্শক কারা, তাঁদের চাহিদা কী এবং কোন শ্রেণির মানুষ কী ধরনের কনটেন্ট দেখছেন—এসব বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

বিশেষ করে আমাদের জানা দরকার, বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা কী ধরনের কনটেন্ট দেখছেন এবং তাঁদের প্রত্যাশা কী। দর্শকের সঙ্গে এই সংযোগ ও বিশ্লেষণ ছাড়া আমরা বাস্তবসম্মত ও মানবিক কনটেন্ট তৈরির প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি বুঝতে পারব না। তাই কনটেন্ট নির্মাণের পাশাপাশি দর্শকের অভিজ্ঞতা ও চাহিদা নিয়ে নিয়মিত গবেষণার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য শুধু কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য নয়, সম্প্রচারমাধ্যম, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণই আমাদের আরও দায়িত্বশীল ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

আমাদের অন্যতম দায়িত্ব হলো বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা এবং বিদ্যমান প্ল্যাটফর্মগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে জেন্ডার-সংবেদনশীলতা নিয়ে আরও বিস্তৃত সচেতনতা গড়ে ওঠে। জেন্ডার-সংবেদনশীলতার বিষয়টি কোনো একক ক্ষেত্রের নয়; এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া।

এখানে বিনোদন মাধ্যম, সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাব্যবস্থা, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সহায়তা এবং সামাজিক উদ্যোগ-সবগুলোই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই পরিবর্তন আনতে হলে এই ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

শুধু কনটেন্ট তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, দর্শককে বুঝে, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেইসঙ্গে গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে বিনোদন মাধ্যমকে এগিয়ে নিয়ে যাবার উদ্যোগ প্রয়োজন। সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে এগোলে বিনোদন মাধ্যম জেন্ডার-সংবেদনশীল সমাজ গঠনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

সৌরভ সাহা

প্রজেক্ট ম্যানেজার, সমতায় তারুণ্য, জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট

আমি একটি সিনেমার বাস্তব প্রভাবের উদাহরণ দিতে চাই। ইংলিশ ভিংলিশ সিনেমাটি দেখার পর আমার এক আত্মীয়, যিনি আগে ইংরেজিতে কথা বলতে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না, নিজ উদ্যোগে ভাষাটি শিখেছেন। পরে তাঁর সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, একটি সিনেমা একজন মানুষের চিন্তা, আত্মবিশ্বাস ও জীবনযাপনে কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এ অভিজ্ঞতা আমাকে বিশ্বাস করায় যে বিনোদন মাধ্যম মানুষের আচরণ ও মানসিকতায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।

এ কারণেই আমি মনে করি, বিনোদন মাধ্যমে জেন্ডার-সংবেদনশীল কনটেন্ট তৈরিতে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ‘সমতায় তারুণ্য’ প্রকল্পে আমরা যুবদের নিয়ে কাজ করছি। আমাদের বিশ্বাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় যুবদের যত বেশি সম্পৃক্ত করা যাবে, তত বেশি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। যুবরা শুধু দর্শক নয়, কনটেন্ট নির্মাণের অংশীদার হিসেবেও তাদের যুক্ত করা জরুরি। তারা অতীতেও তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে, এখনো দিচ্ছে।

এই লক্ষ্য থেকেই আমরা প্রতিবছর ‘জেন্ডার-সংবেদনশীল কনটেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ আয়োজন করছি। উদীয়মান সোশাল মিডিয়া কনটেন্ট নির্মাতাদের উৎসাহিত করাই এর উদ্দেশ্য। গত বছর এ আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং অনেক নির্মাতা তাঁদের কনটেন্ট নিয়ে অংশ নিয়েছেন। এ বছরের ডিসেম্বরে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে প্রতিরোধপক্ষ’–এর সময়কে বিবেচনায় রেখে যে আমরা আবারও এই অ্যাওয়ার্ড আয়োজন করব। আমাদের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে আরও মানসম্মত ও জেন্ডার-সংবেদনশীল কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হবে।

এ ধরনের উদ্যোগ শুধু কোনো প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও যদি একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ইতিবাচক কনটেন্ট নির্মাতাদের উৎসাহিত করা হয়, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আরও সুস্থ, দায়িত্বশীল ও জেন্ডার-সংবেদনশীল হয়ে উঠবে।

তানিয়া হক

অধ্যাপক, উইমেন ও জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমরা জেন্ডার-সংবেদনশীল বিনোদনমাধ্যমের কথা বলছি। কিন্তু নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটি দেখলেই হবে না। আমি শুধু নির্মাতাদের নয়, দর্শকদেরও প্রশ্নের মুখোমুখি করতে চাই। আমাদের সমাজে এখনো জেন্ডারকে কেবল নারীর বিষয় হিসেবে দেখা হয়। অথচ জেন্ডার একটি সামাজিক পরিচয়, যা সমাজের তৈরি নানা সামাজিক কাঠামো ও বয়ানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। আর সেই নির্মাণের অন্যতম বড় ক্ষেত্র হলো বিনোদনমাধ্যম।

আমরা নাটক, সিনেমা কিংবা মঞ্চে প্রায়ই দেখি পুরুষকে পরিবর্তনের চালিকা শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আর নারীকে দেখানো হয় সেই পরিবর্তনের গ্রহণকারী হিসেবে। এই চিত্র শুধু বিনোদনমাধ্যমে নয়, নীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোতেও প্রতিফলিত হয়। ফলে একই ধরনের উপস্থাপনাকে আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিই। অনেক সময় নারীকে পণ্যে পরিণত করে উপস্থাপন করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই বিনোদন উপভোগ করছি, নাকি এর ভোগের শিকার হচ্ছি?

একটি জেন্ডার-সংবেদনশীল বিনোদন নীতি প্রয়োজন, যা একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে মিডিয়া-সংশ্লিষ্ট সবার জন্য জেন্ডার বিষয়ে জ্ঞান ও সংবেদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। একই ধরনের গল্পের পুনরাবৃত্তি না করে গল্পে বৈচিত্র্য আনতে হবে, লেখক দলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কনটেন্ট প্রকাশের আগে তার সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের চর্চাও প্রয়োজন।

বিনোদনমাধ্যম শুধু মানুষের বিনোদনের জায়গা নয়; এটি সমাজের মূল্যবোধও নির্মাণ করে। তাই এই মাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সম্মান, মর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় জেন্ডার-সংবেদনশীল বিনোদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি দায়িত্বশীল বিনোদনমাধ্যমই আমাদের আরও সমতাভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনে কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম।

খায়রুল বাসার

অভিনয়শিল্পী

জেন্ডার-সংবেদনশীলতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা প্রায়ই শুধু নারী ও পুরুষের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকি। অথচ শিশুদের কথাও সমানভাবে ভাবা দরকার। একই সঙ্গে শুধু নারীর প্রতি সহমর্মিতা নয়, পুরুষদের দায়িত্ব ও আচরণ নিয়েও আরও বেশি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই মানুষ, আর পারস্পরিক সম্মান ও সমতাবোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের বিনোদনমাধ্যমে ভালো ও সংবেদনশীল কাজ হচ্ছে। কিন্তু সেই কাজের তুলনায় অসংবেদনশীল কাজের সংখ্যা অনেক বেশি। দর্শক হিসেবে আমরা অনেক সময় ভালো গল্পকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না। ফলে প্রযোজকও মনে করেন, নারীকেন্দ্রিক বা সংবেদনশীল গল্পের চাহিদা কম। বাস্তবতা হলো, দর্শকের পছন্দই অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণকে প্রভাবিত করে।

আমার নিজের কাজেও আমি দেখেছি, একটি নাটকের নাম পর্যন্ত বাণিজ্যিক কারণে বদলে দেওয়া হয়, যাতে বেশি ভিউ পাওয়া যায়। অনেক সময় সংবেদনশীল গল্পও চটকদার নামে প্রচার করা হয়। আবার এমন চরিত্র বা গল্প নিয়েও আপত্তি ওঠে, যা সমাজের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরতে চায়। এসবই প্রমাণ করে, শুধু নির্মাতার নয়, দর্শকের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি।

চলচ্চিত্র ও নাটকে এমন গল্প আরও বেশি আসা উচিত, যেখানে নারী ও পুরুষ—দুজনকেই মানুষ হিসেবে দেখা হবে। একজনের সাহসকে যেমন ইতিবাচকভাবে দেখা হবে, অন্যজনের ক্ষেত্রেও একই দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। বিজ্ঞাপন, নাটক বা সিনেমায় নারীকে কেবল বিনোদনের উপকরণ হিসেবে নয়, সমান সক্ষম মানুষ হিসেবেও উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

এই পরিবর্তনের শুরু পরিবার থেকেই হতে হবে। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে, আগে সে মানুষ, তারপর নারী বা পুরুষ। পাশাপাশি বিনোদনমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে এমন গল্প বলার, যা সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করবে।

রাজু আলীম

সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস)

বিনোদনমাধ্যম সমাজে জেন্ডার-সংবেদনশীলতা গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। আমাদের দায়িত্ব হলো বিদ্যমান প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা। কিছু কিছু টেলিভিশন চ্যানেলে এখনো অশালীন বা অবমাননাকর অনেক কনটেন্ট প্রচার করা হয় না। ভালো গল্প, পরিচ্ছন্ন নির্মাণ ও সুস্থ বিনোদনের দর্শক এখনো রয়েছে। তাই মানসম্মত কনটেন্ট যে গ্রহণযোগ্যতা পায়, সেটি আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি।

নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা নতুন নয়; এটি বিশ্বব্যাপী দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। তবে মূলধারার গণমাধ্যম এই প্রবণতাকে উৎসাহ দেয় না। মূল সমস্যা এখন ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে, যেখানে বেশি ভিউর আশায় নাটকের নাম বদলে চটকদার ও জেন্ডার-অসংবেদনশীল শিরোনাম ব্যবহার করা হয়। অথচ একই নাটক টেলিভিশনে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত নামে প্রচারিত হয়েছে।

সুন্দর গল্প ও ভালো নির্মাণের মূল্য এখনো আছে। সাহিত্যনির্ভর নাটক, পরিচ্ছন্ন চিত্রনাট্য এবং শক্তিশালী গল্প দর্শক গ্রহণ করেন।

আমাদের বেশির ভাগ মূলধারার সংবাদমাধ্যম এসব ইতিবাচক কাজকেই গুরুত্ব দেয়। তাই শুধু ভিউনির্ভর কনটেন্টের দিকে না গিয়ে মানসম্মত নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ডিজিটাল মাধ্যমকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই; বরং সেখানেই জেন্ডার-অসংবেদনশীলতার মাত্রা বেশি হওয়ায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, আইসিটি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

সরকার, নির্মাতা, প্রযোজক, শিল্পী, গণমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে নিয়ে বড় পরিসরে নিয়মিত সংলাপ হওয়া উচিত, যাতে সবাই মিলে একটি গ্রহণযোগ্য নীতিগত অবস্থানে পৌঁছানো যায়।

মীর মোকাররম হোসেন

চলচ্চিত্র প্রযোজক

আজ আমরা এমন একটি বৈশ্বিক ও ভারসাম্যহীন বাজারে আছি, যেখানে দর্শক অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল ভোক্তায় পরিণত হয়েছেন। ফলে জেন্ডার-সংবেদনশীল ও মানবিক কনটেন্ট তৈরির সুযোগ থাকলেও বাজারের চাপ সেই কাজকে কঠিন করে তোলে। তবু আমি আশাবাদী। আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভেতরেই বহু আগে থেকে প্রচলিত ক্ষতিকর ধ্যানধারণাকে প্রশ্ন করার ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে আমরা নতুন, মানবিক ও জেন্ডার-সংবেদনশীল গল্প নির্মাণ করতে পারি।

কিন্তু এর জন্য কেবল ভালো উদ্দেশ্য যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন গভীর জ্ঞান, দক্ষ চিত্রনাট্য এবং শক্তিশালী নির্মাণ। উপরিতল থেকে কোনো ঐতিহাসিক বা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে তুলে ধরলে তা সফল হবে না।

আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একটি ওয়েব সিরিজে স্বাভাবিকভাবে নারী চরিত্রের গাড়ি চালানোর মতো বাস্তবতা দেখালেও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়। আবার অনেক সময় চাহিদার যুক্তিতে বিদেশি জনপ্রিয় কনটেন্টের দুর্বল অনুকরণ করা হয়, অথচ তার শিল্পমান বা মানবিক গভীরতা তৈরি করা যায় না। এতে জেন্ডার-সংবেদনশীলতার পরিবর্তে কেবল বাণিজ্যিক প্রবণতাই প্রাধান্য পায়। শুধু কঠোর আইন দিয়ে এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা, শিক্ষা এবং নির্মাতাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা। বিনোদনমাধ্যমে কাজ করা মানুষের জন্য জেন্ডার-সংবেদনশীলতা ও পেশাগত নৈতিকতা শিক্ষাকাঠামোর অংশ হওয়া জরুরি।

সানজিদা আহমেদ

জেন্ডার ফোকাল, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

জেন্ডার-সংবেদনশীলতা বলতে শুধু নারী বা পুরুষকে আলাদা করে দেখা নয়; এটি মূলত ক্ষমতার সম্পর্ক। একজন অন্যজনকে নিয়ন্ত্রণ করবে বা ক্ষমতা প্রয়োগ করবে—এই মানসিকতাই সংবেদনশীলতা বা অসংবেদনশীলতার মূল জায়গা। তাই শুধু একজন শক্তিশালী নারী চরিত্র দেখালেই জেন্ডার-সংবেদনশীলতা নিশ্চিত হয় না।

যদি সেই চরিত্রও ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থানে চলে যায়, তাহলে সেটিও কাঙ্ক্ষিত নয়। একইভাবে শুধু পুরুষ ঘরের কাজ করবে আর নারী বাইরের কাজ করবে—এমন ভূমিকা বদল করলেই জেন্ডার-সংবেদনশীলতা আসে না। পারস্পরিক সম্মান, সমঝোতা ও ক্ষমতার ভারসাম্যই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জেন্ডার-অসংবেদনশীলতা শুধু নারীর জন্য ক্ষতিকর নয়; পুরুষও এর নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হন। আমাদের সমাজে পুরুষকে সব সময় ক্ষমতাবান, কঠোর ও আবেগহীন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে অনেক পরিবারেই বাবার সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব তৈরি হয়।

কর্মজীবন শেষে অবসরে গেলে সেই মানুষটিই অনেক সময় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। অর্থাৎ ক্ষমতাকেন্দ্রিক পুরুষ চরিত্র হয়তো সাময়িকভাবে সুবিধা পায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ধারণা তাঁর নিজের জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই বিনোদন মাধ্যমে এমন সম্পর্ক ও চরিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন, যেখানে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও মানবিকতাই প্রধান হয়ে ওঠে।

সাদিয়া আফরিন হেমা

সেক্রেটারিয়েট ফোকাল, বাংলাদেশ ইয়ুথ কোয়ালিশন

বাংলাদেশের বিনোদন মাধ্যমে একই ধরনের গল্প ও উপস্থাপনা বারবার দেখতে দেখতে আমাদের মধ্যে একধরনের একঘেয়েমি তৈরি হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কিছু নতুন ধরনের গল্প এসেছে, তবু জেন্ডার-সংবেদনশীল উপস্থাপনায় এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে একজন স্বাবলম্বী ও আত্মপরিচয় গড়ে তোলা নারীর চরিত্র নির্মাণে আমরা প্রায়ই তাঁকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করি। নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এমনভাবে দেখানো হয়, যেন সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, স্বেচ্ছাচারী বা সম্পর্কের প্রতি উদাসীন। এতে দর্শকের মনে স্বাবলম্বী নারী সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয় এবং নারীদের নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে।

শক্তিশালী নারী চরিত্র বলতে শুধু তাঁকে আত্মনির্ভরশীল দেখানো নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় নেতিবাচকতা ছাড়া তাঁর সংগ্রাম, সক্ষমতা ও বাস্তবতাকে তুলে ধরা জরুরি। যুবদের ভাষায় ব্যবহৃত অসংবেদনশীল শব্দ বিনোদনমাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা হলে সেগুলো আরও বেশি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। আমাদের উচিত এমন উপস্থাপনাকে নিরুৎসাহিত করা। যুব প্রজন্মের অগ্রাধিকার চটকদার শিরোনাম বা অসংবেদনশীল উপস্থাপনা নয়; তারা প্রাসঙ্গিক, বাস্তবধর্মী ও জেন্ডার-সংবেদনশীল গল্প দেখতে চায়। তাই আমাদের উচিত ইতিবাচক এমন কনটেন্ট নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়া, যা সমাজের প্রচলিত নেতিবাচক স্টেরিওটাইপ ভেঙে নতুন চিন্তার পথ তৈরি করবে।

ইলিয়াস নবী ফয়সাল

প্রতিষ্ঠাতা, ভৈরবী (যুবদের নেতৃত্বাধীন সংগঠন)

বর্তমান বিনোদন মাধ্যমে পুরুষকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তাকে সব সময় শক্তিশালী, কর্তৃত্বপূর্ণ ও পরিবারের প্রধান হিসেবেই দেখা উচিত। কোনো পুরুষকে দুর্বল বা ঘরের কাজ করতে দেখানো হলে সেটি এখনো সহজভাবে গ্রহণ করা হয় না। এই সামাজিক ধারণাই আমাদের গল্প ও চরিত্র নির্মাণে প্রভাব ফেলছে।

নারীকেন্দ্রিক গল্প নির্মাণের ক্ষেত্রেও আমি একটি প্রবণতা দেখি। বাণিজ্যিক সাফল্যের কথা ভেবে অনেক সময় নারী চরিত্রকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা বাস্তবতার চেয়ে প্রচলিত চাহিদাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। অনেক বিজ্ঞাপনেও প্রায়ই পণ্যের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিকভাবে নারীকে যুক্ত করা হয়। প্রশ্ন হলো একই জায়গায় একজন পুরুষ থাকলে কি সেই পণ্য বিক্রি হবে না? ছোটবেলা থেকে এমন উপস্থাপনা দেখতে দেখতে আমাদের মনোজগতেও একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে। সমস্যাটি শুধু দর্শকের নয়; নির্মাতা, প্রযোজক ও বিনিয়োগ–সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও যুক্ত। আমরা যদি চাই, তাহলে ভিন্ন ধরনের গল্পও দর্শক গ্রহণ করবে।

আমাদের লোকজ সংস্কৃতির নানা উপস্থাপনাই তার প্রমাণ। নির্মাণপ্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ এখনো খুবই সীমিত। বিশেষ করে পরিচালক হিসেবে নারীর উপস্থিতি কম। ফলে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা গল্পে পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগও কমে যায়।

সুপারিশ

  • জেন্ডার-সংবেদনশীল বিনোদনমাধ্যমের জন্য জাতীয় নীতিমালা ও ব্যবহারিক নির্দেশিকা

প্রণয়ন করা।

  • চিত্রনাট্য, সংলাপ, শিরোনাম ও চরিত্র নির্মাণে নেতিবাচক জেন্ডার-স্টেরিওটাইপ পরিহার করতে হবে।

  • নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও প্রযোজকদের জন্য নিয়মিত জেন্ডার-সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ।

  • পরিচালক, লেখক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো।

  • যুবদের শুধু দর্শক নয়, কনটেন্ট নির্মাতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবে সম্পৃক্ত করা।

  • জেন্ডার-সংবেদনশীল ও মানসম্মত কনটেন্ট নির্মাণে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, পুরস্কার ও প্রণোদনা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

  • ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিভ্রান্তিকর, অবমাননাকর ও চটকদার শিরোনামের অপব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

  • শিশু ও যুবদের জন্য সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক বিনোদনমূলক কনটেন্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

  • প্রচলিত সামাজিক স্টেরিওটাইপের বাইরে গিয়ে নারী ও পুরুষ—উভয়কেই বহুমাত্রিক ও বাস্তবসম্মত চরিত্রে উপস্থাপন করতে হবে।

  • দর্শকের চাহিদা, কনটেন্ট গ্রহণের ধারা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দেখার অভ্যাস নিয়ে নিয়মিত গবেষণা পরিচালনা করা প্রয়োজন।

  • জেন্ডার-সংবেদনশীলতা বিষয়ে সরকার, গণমাধ্যম, বিনোদনশিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা ও যুবদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ ও সমন্বয় জোরদার করা।