গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) লিপি রহমান, মো. সাইমুম পারভেজ, সেখ ফরিদ আহমেদ ও আজমান আহমেদ চৌধুরী। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে
গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) লিপি রহমান, মো. সাইমুম পারভেজ, সেখ ফরিদ আহমেদ ও আজমান আহমেদ চৌধুরী। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে

গোলটেবিল বৈঠক

উপকূলের নারীদের জীবিকা ও স্বাস্থ্যে নজর দিন

‘জলবায়ু পরিবর্তন, জেন্ডার সমতা: নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে বাদাবন সংঘ ও প্রথম আলো

পারভীন সুলতানা ৬০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে কয়েক বছর আগে একটি জাল কিনেছিলেন। সেই জাল দিয়ে স্বামী–স্ত্রী পশুর নদে মাছ ধরেন। এটাই তাঁদের জীবিকা। মাছ দেওয়ার বিনিময়ে দাদন শোধ করে যাচ্ছেন। তবে ঋণের এই চক্র থেকে বের হতে পারছেন না। আর্থিক সংকটও কাটছে না। মাছ ধরার পাশাপাশি সংসারের কাজ ও সুপেয় পানি সংগ্রহের বাড়তি চাপ, শারীরিক অসুস্থতা আর দাদন শোধের চিন্তায় ঘুরপাক খান উপকূলের ত্রিশোর্ধ্ব এই নারী। তাঁর বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলায়।

গতকাল মঙ্গলবার বাদাবন সংঘ ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এই নারী জানান, তাঁর মতো এলাকার বেশির ভাগ নারী একই ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। অনুষ্ঠানে তিনি আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসেছিলেন।

পারভীনের কথাকে সমর্থন জানিয়ে একই এলাকার সমবয়সী আরেক নারী কুসুম আক্তার জানান, তাঁকে প্রতিদিন দেড়–দুই কিলোমিটার হেঁটে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয়। পরিবারে মা, বাবা আর এক মেয়েসন্তান রয়েছে। সংসার চালাতে বাবার সঙ্গে তিনি বাড়ি লাগোয়া দুই বিঘা জমিতে চিংড়ি চাষ করেন। দিনের বড় একটি সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে গায়ে চুলকানি হয় প্রায়ই। নিজের হাতের কালো দাগ দেখিয়ে তিনি বলেন, এক বছরে ১৭–১৮ হাজার টাকা খরচ করেছেন, তা–ও চুলকানি থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না।

‘জলবায়ু পরিবর্তন, জেন্ডার সমতা: নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা’ শিরোনামের গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে। অনুষ্ঠানে বক্তাদের কথাতেও উঠে আসে উপকূলের নারী ও কিশোরীদের সংকটের কথা। এসব সংকটের অনেকটাই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। কিছু সংকট মানবসৃষ্ট ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে। সমস্যার মূলে গিয়ে কাজ না করার কারণে পূঞ্জীভূত সমস্যা বড় সংকট তৈরি করছে।

ঝুঁকিতে বাংলাদেশ সপ্তম

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে। উপকূল এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে, খাদ্যনিরাপত্তা দেখা দিচ্ছে। একেকটি পরিবার দাদনের চক্রে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে যাচ্ছে। জীবিকার প্রয়োজনে লবণাক্ত পানিতে বেশি সময় থাকার কারণে অনেক নারী প্রজননস্বাস্থ্যের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। পুরুষেরা অন্য এলাকায় কাজের সন্ধানে গেলে সংসারের চাপ নারীর ওপর পড়ে। দারিদ্র্যের কারণে এলাকায় বাড়ে বাল্যবিবাহ, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন পরিকল্পনায় (ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান বা এনএপি) নারীর প্রজননস্বাস্থ্যের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা ও পানির লবণাক্ততার প্রভাব আরও বিশদভাবে আনা, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অংশীদারি সংস্থাগুলোকে আরও জবাবদিহির জায়গায় আনার সুপারিশ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক) মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত যেকোনো দুর্যোগের ক্ষেত্রে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হলেও কোনো নীতি গ্রহণের সময় জেন্ডার দৃষ্টিকোণ বাদ পড়ে যান। যেকোনো নীতি গ্রহণের সময় নারীর প্রতিনিধিত্ব রাখতে হবে। এনএপিতে নারীর প্রজননস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পানির বিষয় অন্তর্ভুক্তির জন্য আলোচনা করা হবে বলে তিনি জানান।

মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ‘জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ মডেল গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পরিচালক ও জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ইকবাল কবীর। তিনি বলেন, সাধারণভাবে একজন নারী লবণাক্ততার কারণে প্রজননস্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে পড়েন না। তবে উপকূলের নারীদের ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হলো অনেকের জরায়ু প্রোল্যাপ্স (জরায়ু নিচে নেমে আসা) হলেও তাঁরা সামাজিক সংস্কার থেকে তা লুকিয়ে রাখেন, চিকিৎসক দেখান না। ওই অবস্থায় লবণাক্ত পানিতে কাজ করার কারণে তাঁরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁদের হিস্টেরেক্টমি বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ু অপসারণ করতে হয়।

প্রজনন স্বাস্থ্যের সঙ্গে লবণ–পানির সম্পর্ক

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (ত্রাণ কর্মসূচি অধিশাখা) সেখ ফরিদ আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি থেকে পানিসংকট, লবণাক্ততা বাড়া ও নারীর প্রজননস্বাস্থ্যের ঝুঁকি হয় কি না—সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। তবে মতদ্বৈততা থাকলেও এটা সত্যি যে সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে উপকূলের নারীরা দুর্ভোগ বেশি পোহান। শিক্ষার বিস্তার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর নেতৃত্ব না রাখলে এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।

বাদাবন সংঘের নির্বাহী পরিচালক লিপি রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারী কীভাবে পুরুষের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, নারীর জীবন–জীবিকা কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে ও নারী কীভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন—তা নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি।

একশনএইড বাংলাদেশের প্রতিনিধি (কান্ট্রি ডিরেক্টর) ফারাহ্ কবির বলেন, উপকূল এলাকায় গবেষণার ভিত্তিতে তাঁরা দেখেছেন, নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের ঝুঁকির সঙ্গে লবণাক্ত পানির সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ ছাড়া সুপেয় পানির সংকটের কারণে ৯০ শতাংশ পরিবারে স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। তবে চিকিৎসা খাতে পরিবারগুলোর বাজেট কম থাকায় তারা চিকিৎসাসেবা নিতে পারে না।

উপকূল এলাকার সব সংকটের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু দায়ী করলে হবে না মন্তব্য করে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের প্রতিনিধি (কান্ট্রি ডিরেক্টর) আজমান আহমেদ চৌধুরী বলেন, সংকট উত্তরণে সেখানে নারী নেতৃত্ব বিকাশে বিনিয়োগ করা উচিত।

ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, সুন্দরবন এলাকায় পানি সমস্যা সমাধানের বিকল্প নিয়ে ভাবা হচ্ছে না। সেখানে সাত মাস বৃষ্টি হলেও কেন পানি ব্যবস্থাপনা করা যায় না—সেই প্রশ্ন করেন তিনি।

চিংড়িঘেরের কারণে পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে উল্লেখ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক স্নিগ্ধা রেজওয়ানা বলেন, উপকূলের নারীরা নিরাপদ পানি সংগ্রহ করেন। ঋণের মাধ্যমে নারীকে ‘পিংক ট্যাংক’ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ এই নারীরা নিজের মাসিক ব্যবস্থাপনায় ওই পানি ব্যবহার করতে পারেন না। এতে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে।

আরও বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা, ইউএন উইমেনের কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ দিলরুবা হায়দার, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুমিতা তানজিলা, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহফুজা পারভীন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ জেবুন্নেসা রহমান ও প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল।

সূচনা বক্তব্য দেন বাদাবন সংঘের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ফারিহা জেসমিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইনজীবী সারাবন তহুরা জামান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।