
আজকে তারে ঘিরিয়ে মোরা
নাচব সবে রুদ্র তালে,
আরব দেশের করুণ গাথা
আনব টেনে সুরের জালে।
—জসীমউদ্দীন
সোজন বাদিয়ার ঘাট
জারিগান শুনে যাঁরা বাংলাদেশে বেড়ে উঠেছেন, বড় কোনো জারির আসরে গেলে অনিবার্যভাবেই তাঁদের মধ্যে যে ভাবনাটা প্রথমে আসে, তা হলো বয়াতির কণ্ঠে তাঁরা কোন কাহিনিটি শুনতে যাচ্ছেন? কাহিনিগুলো অভিন্ন হলেও গল্প বয়ানের ক্ষেত্রে বয়াতিতে বয়াতিতে ফারাক আছে। বয়ানভঙ্গির এই ভিন্নতাই একেকটি কাহিনিকে চির নতুন, সতেজ ও অনুপ্রেরণাময় করে রাখে।
জারিগানের কাহিনিগুলো বাস্তব ঘটনা ও কল্পনার নান্দনিক মিশ্রণের প্রতিনিধিত্ব করে। যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা যুগ যুগ ধরে বারবার নাটকীয় ঢংয়ে উপস্থাপিত হয়ে আসছে, কাহিনিগুলো মূলত সেসব ঘটনাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। এসব আখ্যানে মিশে থাকে কারবালার লড়াই, নবী-রাসুলের জীবনকথা বা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম সাহিত্য থেকে উদ্ভূত লোকায়ত জ্ঞান। বয়াতিরা কয়েক শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের নানা কোণে কাহিনিগুলো জারিগানের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে এসেছেন। সন্দেহ নেই, ভিন্ন ভিন্ন সময়ের বা এলাকার মানুষের ভিন্ন ভিন্ন রুচির কারণে কবিয়ালরাও জারির কাহিনিতে যুগ যুগ ধরে পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন।
আসলে প্রত্যেক বয়াতিই তাঁর নিজের মতো করে কাহিনি পাল্টেছেন। বয়াতির বর্ণনাচাতুর্যে দূর ভিনদেশের ইতিহাসপট স্থানীয় চেহারা ধারণ করে। দর্শক-শ্রোতার কাছে কাহিনিটি এমনভাবে ধরা দেয়, যেন ঘটনাটি বাংলাদেশেরই কোথাও ঘটেছে। বয়াতির বর্ণনার মায়ায় সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কাহিনির মুখ্যচরিত্র—কোনো নবী, সাধক বা তাপসী—জারিগানের শ্রোতার কল্পনায় অতিচেনা চরিত্র হিসেবে আসন গেড়ে বসে।
জারিগানের আবেদন জাতিধর্ম-নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের কাছেই আছে। ইমাম হোসেনের সঙ্গে তাঁর অনুসারীদের অসীম সাহসের বর্ণনায় হিন্দুরাও মুসলমানদের চেয়ে কম আবেগাপ্লুত হন না। বয়াতি যখন ইমাম হোসেনের খণ্ডিত মস্তক দেখে তাঁর কন্যা ফাতেমার আহাজারির বর্ণনা দেন, তখন হিন্দু দর্শকের চোখও মুসলমানের মতোই অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। রামায়ণ ও মহাভারত-এর গল্প যেমন বাঙালি মুসলমানকে আপ্লুত করে, কারবালার করুণ বিয়োগান্তক ঘটনায় হিন্দুও তেমনই সমব্যথী হয়ে ওঠেন।
কারবালার কাহিনি মূলত আক্রমণোদ্যত সুন্নিদের অবরোধে বন্দী শিয়া শিবিরের বীরত্বগাথা। তবু শিয়াদের মতো সুন্নিদের মধ্যেও এই করুণ কাহিনি সমান আবেদন জাগিয়ে রেখেছে। জারিগানের আসরে সুন্নি শ্রোতারা শুধু সুন্নি খলিফাদের কার্যকলাপেরই নিন্দা করেন না, তাঁরা ইমাম হোসেনের শিবিরের বীর ও বীরাঙ্গনাদের প্রতি সহমর্মী ও শ্রদ্ধাবনত হয়ে পড়েন। পাশাপাশি জারিগানের বর্ণনায় ফুটে ওঠা নাটকীয় দৃশ্যকল্পও দারুণভাবে উপভোগ করেন।
গল্প যখন ইতিহাস
আক্ষরিক অর্থ ও প্রায়োগিক বিবেচনায় জারিগানের কাহিনি বাংলাদেশের ধর্মীয় নেতা ও ইতিহাসবিদদের কাউকে কাউকে বিক্ষুব্ধ করেছে। তাঁরা ক্ষোভের কারণ এই যে বাস্তব ও কল্পনার মিশেলে তৈরি এসব উপাখ্যান সাধারণ মানুষের মধ্যে মুসলিম ইতিহাসের বিকৃত রূপ ছড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও এসব উপাখ্যানে মিশে থাকা অপার্থিব ও আধ্যাত্মিক নীতিশিক্ষা শাশ্বতভাবেই সত্য এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রাপ্ত বা বঞ্চিত সব ধরনের দর্শক-শ্রোতার কাছেই এর আবেদন ব্যাপক।
উদাহরণ দেওয়া যাক। কারবালার যুদ্ধের সময় কাসেম ও সখিনার বিয়ে মহররমের শোভাযাত্রা ও জারিগানের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ। অথচ বহু ইতিহাসবিদের মতে, কারবালায় বিয়ে-শাদির মতো কোনো ঘটনাই আসলে ঘটেনি। তবু একটা সংকটাপন্ন ও শত্রুতাময় পরিবেশে কাসেম-সখিনার বিয়ে এবং মহত্তম উদ্দেশ্যে তরুণ এ দম্পতির ভালোবাসা উৎসর্গ করার কাহিনি নিঃসন্দেহে সবার কাছে মর্মস্পর্শী হয়ে ওঠে।
জারিগান নিয়ে আমি বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। লক্ষ করে দেখেছি, জারিগানের আখ্যানকে আমি ‘গল্প’ বলে উল্লেখ করা মাত্রই তাঁদের অনেকে আপত্তি করছেন। ‘গল্প’ তাঁদের কাছে ‘উপকথা’র সমার্থক। কিন্তু ইতিহাস আর উপকথা তো এক নয়। কারবালার এসব কাহিনিকে তাঁরা এতটাই ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করেছেন যে সেগুলোকে ‘গল্প’ বলতে রীতিমতো অপরাধ বোধ করেন। শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা—কারবালার ঘটনা যাদের আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি—মহররম মাসে ও জারিগানে এ ঘটনা বিশেষভাবেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তাদের কাছে এসব ঘটনাকে ‘গল্প’ বলে উল্লেখ করা মানে পাপ। কারবালার কাহিনি তাদের কাছে ‘গল্প’ নয়, বরং ‘নামা’ বা ঘটনাপঞ্জি। জারিগানের শিরোনামেও সাধারণত ‘নামা’ শব্দটিই ব্যবহৃত হয়ে থাকে, যেমন ‘জহরনামা জারি’। কবি জসীমউদ্দীনের জারিগানের সংকলনেও ‘নামা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
অনেকে মনে করেন, জারিগানে কারবালার ঘটনার অতিরঞ্জন এত বেশি পরিমাণে ঘটেছে, এত অতিরিক্ত কাব্যিক অনুষঙ্গ এতে মিশে গেছে যে এখন তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়ার ঐতিহাসিক যোগ্যতাই হারিয়ে ফেলেছে। মহররমের স্মৃতিতর্পণ ও কারবালার কাহিনিকে অশিক্ষিত কিছু গোষ্ঠীর অর্বাচীন সৃষ্টি বলেই তাঁরা মনে করেন।
জারিগানের বিষয়বস্তু প্রকৃতপক্ষে একই সঙ্গে ইতিহাস ও উপকথাকে ধারণ করে আছে।
গল্পের ভেতরে গল্প
জারিগানের দলে ‘জারি’ শব্দটিকে ‘নামা’ বা ‘পালা’র সমার্থক বলেই ধরা নেওয়া হয়। ‘তিলেকবানের জারি’ বা ‘কুলসুমের মেজবানির জারি’র মতো শিরোনামে জারি শব্দের মানে আসলে তা-ই। বইয়ে প্রকাশিত জারিগানের পাঠে বা মঞ্চে গান শুরুর আগে একেকটি শিরোনাম ঘোষণা করা হয়। পূর্ণাঙ্গ কোনো নাটক বা দীর্ঘ কোনো গল্পের মতো প্রতিটি পালার একটি স্বতন্ত্র পরিণতি থাকে। কাহিনির শুরুতে থাকে গৌরচন্দ্রিকার মতো একটি বন্দনা, আর শেষে সমাপ্তিসূচক উপসংহার। বন্দনা আর উপসংহারের মাঝখানে মূল কাহিনির দৃশ্য বর্ণনা চলতে থাকে।
জারিগানের শিরোনামই বলে দেয় পালায় কোন কাহিনিটি বলা হবে। এর মধ্যে একাধিক ঘটনা পর্বে পর্বে পরিবেশিত হয়। আসলে মূল কাহিনিটি বিশদভাবে বর্ণনা করার জন্য বা বাড়তি বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবে কাহিনির মধ্যে ছোট ছোট উপকাহিনি ঢোকানো হয়। সংস্কৃত মহাকাব্য বা আরব্য রজনীর মতো পারস্য উপকথার মূল কাহিনি-কাঠামো যেমন অনেক উপকাহিনি জোড়া লাগিয়ে গড়ে ওঠে, জারিগানেও বৈশিষ্ট্যও ঠিক তেমনই। জারিগানে একটির সঙ্গে আরেকটি গল্প এমনভাবে জুড়ে থাকে যে এর ভেতরে সম্পর্কহীন একটি ‘গল্প’ বা ‘পর্ব’ বর্ণনার সময় শ্রোতারা মূল কাহিনির প্রাসঙ্গিকতা বিস্মৃত হয়ে পড়েন। জারিগানের বর্ণনায় কাহিনি-পরম্পরার মধ্যে নিজস্ব আবেদনের জোরে উপকাহিনি অনেক সময় মূল কাহিনিকে ছাপিয়ে যায়।
‘তিলেকবান জারি’তে বাদশাহজাদী শেষ পর্যন্ত তার পাণিপ্রার্থীর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার পর বেহারারা তাকে পালকিতে করে আরব দেশে নিয়ে যেতে আসে। এই দৃশ্য বর্ণনার সময় বেহারাদের হাড়কিপ্টেমি নিয়ে বয়াতি সরস গল্প ফাঁদেন। পালার মূল বিষয়ের সঙ্গে এ গল্পের প্রাসঙ্গিকতা নেই। কিন্তু গ্রামের সুদখোর মহাজন ও কৃপণ জমিদারদের কঞ্জুস আচরণের সঙ্গে পরিচিত দর্শক-শ্রোতা কিপ্টেমির এই সরস গল্প দারুণভাবে উপভোগ করে।
কাহিনির ‘জাল’
এখনো অবধি কোনো গবেষক বা সংগ্রাহক জারিগানের পালার সম্পূর্ণ তথ্য লিপিবদ্ধ করেননি। তবু জারিগানের শিল্পী ও শ্রোতাদের মনে সেগুলো অভিন্ন চেহারায় খচিত হয়ে আছে। তাদের মনে কাহিনিগুলো এতই সজীব যে বয়াতি কোনো পালা গাওয়ার সময় তার কাহিনি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ওই ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যান, এমনকি কাহিনির কোনো চরিত্র নিয়ে পরিচিতিমূলক বক্তৃতা দিতে হয় না। কারণ, দর্শকেরা কাহিনির মূল চরিত্রগুলো সম্পর্কে আগে থেকেই জানেন এবং বিশাল সেই আখ্যানে চরিত্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত কাহিনি কীভাবে পরিবেশিত হবে, সে সম্পর্কেও তাঁদের স্পষ্ট ধারণা থাকে। জারিগানের বিশাল জগতে, অর্থাৎ এই ‘সংগীতজালে’ অন্য বহু পালার চেয়ে এমন ধরনের বিশেষ কিছু পালা বরং কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুর বেশ অনেকটা কাছাকাছি।
প্রত্যেক কবিয়ালেরই জারিগানের পালার নিজস্ব ভান্ডার থাকে। নিজস্ব সেই পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তাঁরা নিজেদের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করেন। কোনো বয়াতিকে তাঁর নিজের ভান্ডার থেকে গান শোনাতে বললে তিনি কোন গানটি গাইবেন তা নিয়ে তাঁকে খুব দ্বিধাগ্রস্ত হতে দেখিনি। কারণ, হয় গানটির ওপর তাঁর খুব ভালো দখল আছে, নয়তো গানগুলো তাঁদের কাছে বিশেষভাবে প্রিয়।
কাহিনি ও বয়ান
জারিগানের বয়াতির বিবরণ জনপ্রিয় ইসলামি ইতিহাস ও উপকথার প্রতিনিধিত্ব করে। এর ভেতরকার কাহিনির বিশদ বর্ণনাটি কল্পনাপ্রসূত হলেও তাতে উল্লেখ করা চরিত্র ও স্থানগুলো অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ। জারিগানের দৃশ্যপটে যেসব চরিত্র আবিভূর্ত হয়, স্বর্গীয় বিভা ও মহিমায় দর্শক-শ্রোতাদের মনে সেগুলো বহু আগে থেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত। উপরন্তু এই চরিত্রগুলো আবার সাধারণ মানুষের মতোও। দর্শক-শ্রোতার প্রাত্যহিক জীবনের মতো এই চরিত্রগুলোর গার্হস্থ্য জীবনেও প্রাত্যহিক আনন্দ ও সংকট আছে।
জারিগানের কাহিনি-কাঠামোয় কিছু সাধারণ ধাঁচ লক্ষ করা যায়। কোনো কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্রটি প্রবল ধার্মিক হয়েও হয়তো আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে ফেলে। পুত্রসন্তান লাভের আনন্দে আত্মহারা পিতা হয়তো আল্লাহর কথা ক্ষণিকের জন্য বিস্মৃত হয়ে পড়ে। জঙ্গলে নির্বাসিত অবস্থায় নিদারুণ দুর্দশায় পতিত কোনো নারী হয়তো নামাজ পড়তে ভুলে যায়। গল্পগুলোতে নায়ক বা নায়িকা নানা দুর্দশার মধ্য দিয়ে নিজেদের অনুশোচনা প্রকাশ করে এবং নিজেদের চরিত্রের ভালো দিক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহ তখন তাদের মহানুভবতা প্রদর্শন করেন এবং দুর্দশা থেকে তাদের মুক্তি দেন।
আরেক ধরনের কাহিনিতে আবার কেন্দ্রীয় চরিত্রটি প্রথম থেকেই পাপী। ঘটনাচক্রে সে কোনো সুফি বা দরবেশের সংস্পর্শে আসে। নানা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার পর সে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে। ‘আনাল হক’ পালায় এক কাজি একজন দরবেশের নির্দেশ অমান্য করে কঠিন দুর্দশায় পড়ে। ‘কারবালা পালা’র এজিদের মতো যে চরিত্রগুলো শেষ পর্যন্ত অনুতপ্ত হয় না, তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য বদদোয়া করা হয়।
জারিগান পালার বর্ণনার বিষয়বস্তু তিন ভাগে বিন্যস্ত: ১. কারবালা-সংক্রান্ত ঘটনা; ২. ধর্মগ্রন্থ থেকে পাওয়া প্রধান নবী-রাসুলদের কাহিনি; এবং ৩. প্রথম দুই ধরনের চরিত্র বা ঘটনার দূরবর্তী ছায়া নিয়ে গড়ে ওঠা বিচিত্র কাহিনি।
একেবারে শেষ ধারার গল্পগুলো মূলত ভারত ও বাংলাদেশে স্থানিক আদলে গড়ে উঠেছে। এ জাতীয় পালা এখন গড়ে উঠছে আধুনিক সমাজ-রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর সঙ্গে রোমাঞ্চ, হাস্যরস বা নীতি-সংক্রান্ত রূপক কাহিনির মিশেল দিয়ে।
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
মারি ফ্রানসেস ডানহ্যাম: গবেষক, এথনোমিউজিকোলজি, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র।