গল্প

কান

অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

আমার জানামতে, পৃথিবীতে প্রেমের জন্য কান হারিয়েছেন এমন মানুষ মাত্র দুইজন। একজন মহান শিল্পী ভ্যান গঘ আর অন্যজন হাতেম মাস্টার। কানের সঙ্গে প্রেমের কোনো দূরবর্তী সম্পর্ক আছে কি না, কে জানে! যদি থাকত তাহলে তো বেশির ভাগ মানুষই কান হারিয়ে দুনিয়ায় কানবিহীন লোকের সংখ্যা বাড়িয়ে দিত। জগতে কয়জন আর প্রেমিক নয় বলুন!
শুনেছি ভ্যান গঘের প্রেমিকা নাকি একদিন ঠাট্টা করে তাঁর বড় বড় কান দুটির প্রশংসা করেছিলেন, আর তা শুনে ভ্যান গঘ নিজ হাতে নিজের কান কেটে, রঙিন কাগজে প্যাকেট করে প্রেমিকাকে উপহার পাঠিয়েছিলেন কর্তিত কান। সেই রক্তাক্ত কান উপহার পেয়ে প্রেমিকা এতটাই ভয় পেয়েছিলেন যে তাঁর সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। হয়তো এমন ভয়ংকর উন্মাদ প্রকৃতির মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাকে বিপজ্জনক মনে হয়েছিল তাঁর।
তবে হাতেম মাস্টারের মধ্যে উন্মাদনার কোনো লক্ষণ ছিল না আর তার গল্পটাও তাই ভ্যান গঘের চেয়ে একটু আলাদা। অবশ্য এটাকে আতর বানুর গল্পও বলা যায়। তখন সময়টা ছিল আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের কাল। বংশের মধ্যে চেয়ারম্যান-মেম্বর থাকায় আতর বানুর বাপ-চাচা-ভাইয়েরা তখন মহকুমায় বেশ শক্তিশালী। কাউকে পরোয়া করি না ভাব। তিন ভাইয়ের একমাত্র ছোট বোন আতর ছিল পরিবারের সবার চোখের মণি। যেমন রূপবতী, তেমনই গুণী আর ব্যক্তিত্বময়ী। গ্রামের লোক তাকে ভালোবেসে হয়তো একটু বাড়িয়েই বলত যে আতর যেদিকে হেঁটে যায়, সেদিকই নাকি আতরের সুগন্ধে চারদিক আমোদিত হয়ে ওঠে।
আর হাতেম মাস্টার সামান্য কুঁজো হয়ে হাঁটা এক মাতৃপিতৃহীন তরুণ, আতরদের গ্রাম নন্দনপুরের প্রাইমারি স্কুলে ভিন্ন জেলা থেকে চাকরি করতে আসা এক নিরীহ গোবেচারা শিক্ষক। গ্রামের লোক এটাও বলে যে হাতেম মাস্টার এতটাই লাজুক আর ভদ্র যে গ্রামের পথে যখন সে হনহন করে হেঁটে যায়, কখনোই মাটির দিক থেকে সরে না তার চোখ। নন্দনপুরের কৌতূহলী রসিক বৃদ্ধরা মাঝেমধ্যে হাতেম মাস্টারের পথ আগলে ধরে রসিকতা করে জিজ্ঞেস করত, ‘কিছু খুঁজো নাকি মাস্টার? মাটি থেইক্যা যে চোখ একবারেই তুলো না...’
তো হাতেমের এই নম্র, বিনয়ী, গোবেচারা স্বভাবের কথা জেনেই হয়তো তাকে পঞ্চদশী আতর বানুর গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে আতরের বাপ-চাচারা কোনো দ্বিধা করে না।
প্রতিদিন মাগরিবের নামাজের পর দুই ঘণ্টা আতর বানুকে অঙ্ক আর ইংরেজি পড়ায় হাতেম। এ সময়টাতেও যথারীতি তার কণ্ঠস্বর থাকে নিচু আর চোখের নজর থাকে নিচের দিকে, বইয়ের পাতায়। তবে সেই সময় টেবিলের নিচে আতরের ফরসা পায়ের পাতা কেমন যেন শিরশির করে, তার শুধু মনে হয় মাস্টার সাহেবের দৃষ্টি বুঝি বই ভেদ করে দেখে ফেলছে তার জুতাবিহীন খালি পায়ের পাতা দুটোকে! আঙুল আর পায়ের পাতা সংকুচিত করতে গিয়ে ঐকিক নিয়মের কাটাকুটিতে ভুল হয়ে যায় আতর বানুর।
‘আরেকটু মনোযোগ দেন, অঙ্ক ভুল হয়েছে।’
খাতায় চোখ রেখে নিচু গলায় বলে হাতেম মাস্টার। আতরের খুব লজ্জা লাগে তখন, আর সে তাড়াতাড়ি অঙ্ক খাতাটা নিজের দিকে টেনে আনতে গেলে হাতেমের ঠান্ডা হাতের সঙ্গে তার ঘামে ভেজা গরম হাতের ছোঁয়া লেগে যায়।
এর ফলে কে বেশি শিহরিত হয় তা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। তবে এমন ঘটনা কদাচিৎ ঘটে। কারণ, হাতেম মাস্টার বরাবরই নিজেকে নিয়ে সংকুচিত আর সতর্ক। আতর বানুও তার আভিজাত্য আর বংশ মর্যাদা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কখনো হয়তো ইংরেজি কোনো শব্দের বানান ভুল করে ফেলত আতর বানু। আর হাতেম কোনো কথা না বলে লাল কালিতে সেই বানান কেটে দিত। হয়তো সুদ কষার জটিল অঙ্ক আর চলিত নিয়মের হিসাব বোঝাতে গিয়ে হাতেম হয়রান হয়ে যেত, সেসব বুঝে নেওয়ার জন্য প্রাণপাত করে ফেলত আতর বানুও...যেমন হয় আরকি ছাত্রী-গৃহশিক্ষক আদর্শ সম্পর্ক। হাতেম কখনোই আতর বানুর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলত না। আত্মমর্যাদা-সচেতন আতর বানুও তার মাথা থেকে ওড়না সরাত না কখনো। ছাত্রীর আউট নলেজ বাড়াতে হাতেম মাঝেমধ্যে পড়ার বইয়ের বাইরেও কিছু বইপত্র পড়তে দিত আতরকে আর মেয়েটিও আগ্রহ করে পড়ত সেসব। তবে তাদের মধ্যে প্রেম-জাতীয় কিছু ঘটেছে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায়নি। আতর বানু শুধু এক-দুইবার তার চাচি ও ভাবিদের কাছে কথা প্রসঙ্গে বলেছে, তার স্যারের মতো এত ভালো মানুষ সে জীবনে দেখেনি, এমন চুপচাপ, এমন ভালো চরিত্র...’
এ রকম কথা যে কেউ তার শিক্ষকের সম্বন্ধে বলতেই পারে, তাতে সন্দেহ করার কী আছে? এভাবেই হয়তো চলত, কিন্তু এর মধ্যে একদিন কোনো এক ছুটির সকালে হাতেম মাস্টারের সমবয়সী সহকর্মী বাংলার শিক্ষক খানিকটা সহজ, সরল ও একরোখা ধরনের এমদাদুল হক যখন বারবার তাকে জিজ্ঞাসা করছিল, ‘কেন সে এখনো বিয়ে করছে না? কবে বিয়ে করবে? কেমন মেয়ে বিয়ে করতে চায়?’ ইত্যাদি ইত্যাদি; তখন হয়তো একটু উত্ত্যক্ত হয়ে, মুখ ফসকেই হাতেম হঠাৎ এমদাদের কাছে বলে ফেলল, ‘মীর বাড়ির সুগন্ধী কন্যা আতর বানুর মতো কাউকে পেলে সে ঠিক বিয়ে করে ফেলত!’
কথাটা হয়তো ঠাট্টা করেই বলা, হাতেম মাস্টারের মতো ছা-পোষা লোকের এমন স্বপ্ন দেখা ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন বা বামন হয়ে চাঁদ ধরার আকাঙ্ক্ষার মতোই হাস্যকর। কিন্তু এমদাদ কথাটাকে হাওয়ায় উড়ে যেতে না দিয়ে খপ করে ধরে ফেলে। হাতেম মাস্টারের অবিরাম ‘না’ ‘না’ উপেক্ষা করে গম্ভীরভাবে সে বলে, ‘চিন্তা কইরেন না, আমরা বিবাহের প্রস্তাব পাঠাব। আপনে কি ফেলনা পাত্র নাকি?’
ইতিমধ্যে আতরের জন্য দু-তিনটি বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। বাপ-চাচা-ভাইয়েরা মিলে সেসব প্রস্তাব চুলচেরা বিবেচনা করে দেখছেন, রূপে-গুণে, ধনে-মানে কোন পাত্র তাঁদের আদরের আতর বানুর যোগ্য হবে। কার ঘরে আতর সুখে থাকবে। কোন রাজপুত্র তাঁদের মেয়েকে রাজরানি করে রাখবে। ভালো করে না দেখেশুনে, যাচাই-বাছাই না করে যার-তার হাতে তো তাঁরা তাঁদের কলিজার টুকরা মেয়েকে তুলে দিতে পারেন না!
পরিস্থিতি যখন এ রকম, তখন আপনারাই বলুন, চাল-চুলোহীন, হতচ্ছাড়া এক শিক্ষকের আতরকে পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? বোকা মানুষেরাও বুঝবেন চান্স খুব কম, আর সেটা বুঝতে পেরেই হয়তো হাতেম মাস্টার এমদাদকে অনুনয় করে, ‘খামাখা যাইয়েন না তো ভাই, পরে বেইজ্জতি হইবেন, কী দরকার? তাঁদের সঙ্গে কি আর আমার মিলে? বাদ দেন।’
কিন্তু এমদাদের মনে তখন শ্রেণিচেতনা জেগে ওঠার জোশ। হাতেমের ইচ্ছা পূরণের জন্য সে এখন জান কোরবান করতেও প্রস্তুত। সেই স্পিরিট নিয়েই এমদাদ ছুটল নন্দনপুর প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে, ‘হাতেমের হয়ে এই প্রস্তাব নিয়ে আতর বানুর বাপ-চাচা-ভাইয়ের কাছে আপনে যান।’ প্রধান শিক্ষককে অনুরোধ করে সে। প্রধান শিক্ষক ঢোক গেলেন। এমন প্রস্তাব দিতে গিয়ে নিজের চাকরি হারানোর ঝুঁকি নিতে রাজি না থাকায় এক কথায় এটা নাকচ করে দেন তিনি।
‘না, না, এই রকম অবাস্তব প্রস্তাব আমি দিতে পারব না। তুমি চেনো না ওদের? ওরা হইল ডাকাইতের বংশ। কোপ দিয়া মাথা নামায়া দেবে। হাতেমরে বলো অন্য মেয়ে পছন্দ করতে। এই বয়সে জীবন আর চাকরি কোনোটাই হারানোর দরকার নাই। আমরাও বাঁচি, সে-ও বাঁচুক।’
প্রধান শিক্ষকের এমন কাপুরুষতায় অত্যন্ত আহত হয় এমদাদ। সে বলে, ‘ঠিক আছে। আপনে থাকেন আপনের চাকরি নিয়া, প্রস্তাব নিয়া আমিই যাব ।’
‘দূর! বাদ দেন তো ভাই, কী পাগলামি শুরু করছেন আপনে?...দরকার নাই এইসব।’ এমদাদকে থামাতে চেষ্টা করে হাতেম। কিন্তু এমদাদকে যেন ভূতে পেয়েছে, সে কোনো বাধাই মানে না, বরং এক সন্ধ্যায় সত্যি সত্যিই সে গিয়ে হাজির হয় আতর বানুর বাপ-চাচা-ভাইদের বৈঠকখানায়।
তখন শীতকাল। স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ফলে কিছুদিন ধরে আতর বানুকে পড়াচ্ছে না হাতেম। আতরের বাপ-চাচা-ভাইদেরও মেয়েকে আর পড়ানোর ইচ্ছা নেই, তার বিয়ের তোড়জোড় চলছে। ওই দিন সন্ধ্যায় বৈঠকখানায় মূলত আতর বানুর বিয়ের প্রস্তাব নিয়েই আলোচনা চলছিল। সদরের বড় বাজারে ছয়টা দোকানের মালিক চুন্নু ব্যাপারীর বিএ পাস বড় ছেলে শহীদুলকে বেশ পছন্দ হয়েছে আতর বানুর বড় ভাই আবু তাহেরের। এখন কবে ছেলের বাড়ির লোকদের দাওয়াত দেওয়া যায়, তাদের খাওয়া-দাওয়ার মেন্যু কী হবে সেসব নিয়েই কথা বলছিল তারা।
সেই কথার মাঝখানে এমদাদ মাস্টার গিয়ে হাজির হলে আতর বানুর বাপ-চাচা-ভাইয়েরা নিজেদের আলোচনা এক পাশে সরিয়ে রেখে এমদাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। এমদাদ খুক করে একটু কেশে কথা বলার শক্তি সঞ্চয় করে।
‘আতর বানুর জন্য একটা বিয়ার প্রস্তাব নিয়া আসছিলাম।’ সে বলে।
‘খুব ভালো কথা, প্রস্তাবটা কী? পাত্র কে?’ আতর বানুর চাচা লেহাজউদ্দিন জিজ্ঞেস করে।
‘পাত্র আপনেদের অপছন্দ হবে না। আতরের সঙ্গে খুবই মানাবে। শান্তশিষ্ট-নম্রভদ্র স্বভাবের ছেলে। শিক্ষিত। দেখতে-শুনতেও ভালো। আদব-কায়দাতেও এক নম্বর।’

‘কার কথা বলতেছ?’
‘পাত্র আপনেদের অতি চেনা। তার স্বভাব-চরিত্রও অত্যন্ত ভালো।’
আর ধৈর্য ধরতে পারে না আতর বানুর বাপ-চাচা-ভাইয়েরা। তারা প্রায় চিৎকার করে ওঠে।
‘কে? কার কথা বলো?’
এমদাদ তখন ঝেড়ে কাশে। বলে, ‘আমি আসলে আতর বানুর জন্য আমাদের হাতেম মাস্টারের কথা বলতেছি...’
বৈঠকখানায় হঠাৎ পিনপতন স্তব্ধতা নেমে আসে। যেন এমদাদ কী বলেছে তা কেউ বুঝতে পারছে না। এমদাদ সবাইকে বোঝানোর জন্য আরেকবার অস্ফুট কণ্ঠে বলে, ‘আবদুল হাতেম। আমাদের হাতেম মাস্টার।’
আতর বানুর বড় ভাই আবু তাহেরই প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখায়। এক লাফে উঠে গিয়ে এমদাদের শার্টের কলার চেপে ধরে সে।
‘থাপ্পর দিয়া সবটি দাঁত ফালায়া দিমু। মাথা ঠিক আছে তোর? কত বড় আস্পর্ধা! কোন সাহসে এমন প্রস্তাব দেস তুই?’
আতরের দুই চাচা তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে আবু তাহেরকে থামায়। এমদাদ এমন প্রতিক্রিয়ায় হতভম্ব হয়ে তাকায় এদিক-ওদিক। আতরের বাবা হুক্কার নলে ঘন ঘন টান দেয়। চাচা লেহাজউদ্দিন নিজের দাড়িতে হাত বুলায় আর সালিস-বিচারে যেভাবে রায় দেয় তেমন করে বলে, ‘মেয়ে বড় হইলে প্রস্তাব তো সবাই দিতে পারে, গাছে বরই ধরলে সবাই ঢিল মারে। কিন্তু এমদাদ মাস্টার, তুমি যে প্রস্তাবটা আনছ, তা আগুনে-পানিতে সেদ্ধ হয় না, বুঝছ? কে তোমারে পাঠাইছে? হাতেম? ওরে গিয়া বলবা, বান্দরের গলায় মুক্তার মালা শোভা পায় না।’
আবু তাহের রাগে ফুঁসে ওঠে, ‘দুই পয়সার মাস্টার, আমার বোনরে বিয়ার প্রস্তাব দেয়...’
‘হাতেম তো দেখি মিচকা শয়তান, এমন ভাব ধইরা থাকে যেন ভাজা মাছ উল্টায়া খাইতে জানে না, আর তলে তলে এত কিছু, রাগে আমার শইলডা জ্বলতেছে...ওরে একটা শিক্ষা না দেওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি নাই।’ আতরের বদরাগী, হিংস্র প্রকৃতির মেজো ভাই দাঁত খিঁচিয়ে মন্তব্য করে। ওদের ভাবসাব দেখে এমদাদ আর অপেক্ষা করে না, এক ফাঁকে ভীতু কুকুরের মতো লেজ গুটিয়ে পালিয়ে আসে। কিন্তু ঘটনাটা সে হাতেমের কাছে বেমালুম চেপে যায়। এমদাদের মাথা থেকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার ভূত নেমে গেছে ভেবে স্বস্তি পায় হাতেম।
কিন্তু আতর বানুর তিন ভাই আবু তাহের, আবু জাহের আর আবু খায়েরের মনে স্বস্তি নেই। তাদের মনে হয় হাতেম মাস্টার তাদের বোনকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে চরম অপমান করেছে, এই অপমানের প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত তাদের মন শান্ত হবে না।
‘ওর মাথা কামায়া ঘোল ঢাইল্যা দেওন দরকার।’
‘মুখে চুন-কালি মাইখ্যা সারা বাজার ঘুরানি দরকার।’
‘ওর গলায় জুতার মালা পিন্দাইতে পারলে ঠিক হইত।’
তবে চাচারা ভাতিজাদের এই বলে শান্ত করে যে এতে লঘু পাপে গুরু দণ্ড দেওয়া হয়ে যাবে। তারচে বরং ব্যাপারটা চেপে যাওয়াই ভালো।


এতসব ঘটনার কথা তো আর হাতেম মাস্টার জানে না। একদিন সন্ধ্যাবেলা আতর বানুর বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার মনে পড়ে, আকবর হোসেনের লেখা দুটো উপন্যাস আতর বানুকে পড়তে দিয়েছিল সে। সেগুলো নিশ্চয়ই এত দিনে পড়া শেষ হয়েছে। হাতেম ভাবল, তাহলে বইগুলো ফেরত নিয়ে যাই। কবে আবার মেয়েটা শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে, হয়তো আর দেখাই হবে না।
হাতেম ভেতর বাড়িতে গিয়ে খবর পাঠালে ওড়নায় মাথা ঢেকে বইগুলো নিয়ে আসে আতর বানু। তাদের মধ্যে তেমন কোনো কথা হয় না, শুধু ফিরে যাওবার সময় হাতেম মাস্টার প্রথমবারের মতো পূর্ণ দৃষ্টিতে সরাসরি তাকায় আতর বানুর চোখের দিকে, হয়তো শেষবারের মতো দেখে নেয় তাকে। বলে, ‘আচ্ছা, আসি। পড়াশোনার অভ্যাসটা রাখার চেষ্টা করবেন। মন ভালো থাকবে।’
আতর বানুর ভাইয়েরা রাতে বাড়িতে ফিরে হাতেমের আগমনের কথা জানতে পেরে আবারও রেগে যায়। তারা ওই দুই আনার মাস্টারকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
ভাইদের অনুগত লাঠিয়ালরা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে খুব বেশি সময় নেয় না।
দুই দিন পরেই নন্দনপুর গ্রামের মানুষ জানতে পারে হাতেম মাস্টার আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রাতের আঁধারে যখন তিনি ছাত্র পড়িয়ে বাড়ি ফিরছিলেন, তখন পাটখেতের আড়ালে ওত পেতে থাকা কে বা কারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার বাম কান কেটে নিয়েছে।
মুখে কেউ কিছু না বললেও আতরের বাপ-চাচা-ভাইদের মদদ ছাড়া এই অঞ্চলে কেউ যে এমন কাজ করতে পারে না, সে ব্যাপারে গ্রামবাসী নিশ্চিত ছিল। কিন্তু হঠাৎ এই নিরীহ মাস্টার কেন এমন শাস্তি পেল তা একমাত্র এমদাদ মাস্টার ছাড়া আর কেউ ধরতে পারল না। আতর বানুর কানে যখন খবরটা পৌঁছাল, স্বাভাবিকভাবেই তখন তারও বুঝতে বাকি রইল না এই কাজ কাদের। ফলে রাতের খাবার শেষে তার বাপ-চাচা-ভাইয়েরা যখন বৈঠকখানায় আতর বানুর পানচিনি অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে আলাপ করছিল, সে তখন ওড়নায় মাথা ঢেকে বাপ-চাচা-ভাইদের মজলিশে এসে দাঁড়ায়।
‘এমুন কাজ কেন করলেন ভাই? চাচাজান, লোকটার অঙ্গহানি কেন করলেন আপনেরা?’
ভাইয়েরা হো হো করে হাসে, ‘উচিত শিক্ষা হইছে ওর। তোমারে বিয়ার প্রস্তাব দিছিল। হা হা হা। এখন করুক বিয়া, কান কাটা মাস্টারকে কে বিয়া করবে?’
মাথার ঘোমটাটা হাত দিয়ে টেনে ঠিকঠাক করে আতর বানু। তারপর স্পষ্ট গলায় বলে, ‘আমি উনাকে বিবাহ করতে চাই।’
বৈঠকখানায় বজ্রপাত হলেও বোধ হয় কেউ এতটা অবাক হতো না, আতর বানুর কথায় যতটা হলো। বুক চাপড়ে হাহাহার করে উঠল চাচারা, ‘আম্মাজান, এইটা আপনে কী বললেন?’
গলা কাটা মোরগের মতো চিৎকার করে মেঝেতে গড়াগড়ি খেল ভাইয়েরা, ‘এইটা হইতে পারে না, আতর বানু। এই কাজ কইরো না।’
ভাবি আর চাচিরা কত কিছু বোঝায়, বাপ-চাচারা ত্যাজ্য করার হুমকি দেয়। ভাইয়েরা প্রাণনাশের ভয় দেখায়। কিন্তু সংকল্পে অনড় আতর বানু।
ফলে নন্দনপুর গ্রামবাসী পরদিন সদর হাসপাতালে আহত হাতেম মাস্টারের বিছানার পাশে ওড়নায় মাথা ঢেকে দাঁড়িয়ে থাকা আতর বানুকে দেখতে পায়। গ্রামবাসী আরও বিস্মিত হয়, যখন তারা দেখে আতরের প্রভাবশালী বাপ-চাচা-ভাইয়েরাও নীরবে হাসপাতালের আশপাশে ঘুরঘুর করছে।
যেদিন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পায় হাতেম, তার কয়েক দিন পরেই আতরের বাপ-চাচা-ভাইদের উদ্যোগেই আতর বানু আর হাতেম মাস্টারের বিয়ে হয়ে যায়।
যত দূর জানা যায়, তারা সুখী দাম্পত্য জীবন-যাপন করেছে। হাতেম মাস্টারকে যদিও সারা জীবন মাফলারে কান-মাথা মুড়িয়ে রাখতে হয়েছে, তবু সে নাকি নিকট বন্ধুদের কাছে প্রায়ই হেসে হেসে বলেছে, ‘কান হারাইছিলাম বলেই তো আতর বানুকে পাইলাম। কানের জন্য আমার কোনো দুঃখ নাই। কারণ, আমার জীবন আতরের সুগন্ধে ভরপুর।’