
‘হার–জিত বড় নয়, অংশগ্রহণই বড় কথা’—একটা সময় খেলার প্রসঙ্গে এই আপ্তবাক্য খুব প্রচলিত ছিল। কিন্তু এটিই যেন অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশের ভবিতব্য। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও বাংলাদেশের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কেবল ‘অংশগ্রহণের মঞ্চ’ হয়ে আছে, হয়ে আছে অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্রও। ১৯৮৪ সালে প্রথম অলিম্পিকে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। অথচ আজও আমাদের সবচেয়ে বড় ‘গর্ব’ যেন সরাসরি অলিম্পিকে অংশ নেওয়াতেই!
এর কারণ কী? এ দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা? দারিদ্র্য? অথচ অলিম্পিকের ইতিহাসে পদক পাওয়া দেশের তালিকায় চোখ বোলালে দেখা যাবে, বাংলাদেশের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, যুদ্ধবিধ্বস্ত অনেক দেশই অলিম্পিকের মঞ্চে বাজাতে পেরেছে তাদের মধুর জাতীয় সংগীত, গৌরবের পতাকা। তিন দশক ধরে পদক দূরে থাক, এখন পর্যন্ত কোনো ইভেন্টের চূড়ান্ত লড়াইয়ে অংশ নেওয়ারও সুযোগ মেলেনি বাংলাদেশের কোনো প্রতিযোগীর।
গলফার সিদ্দিকুর রহমান যখন প্রথম বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদ হিসেবে অলিম্পিকে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ পান, তখন এই আলোচনা ও গর্বের মধ্যেই অলিম্পিক গেমসের পদক তালিকায় নাম না ওঠার হাহাকারটাও বড় করুণভাবে শোনা যায় বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে।
২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে অংশ নেওয়া শ্যুটার শারমিন রত্নার মতে, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অলিম্পিক কখনোই ভাবনাচিন্তার বিষয় ছিল না। একটি নির্দিষ্ট অলিম্পিক গেমসকে উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য বানিয়ে পরিকল্পনা হাতে না নেওয়ার কারণেই এই অবস্থা। স্বল্পমেয়াদের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে এসএ গেমসে পদক আসতে পারে, আঞ্চলিক ইভেন্ট গুলোতে পদক আসতে পারে, কিন্তু এশিয়ান গেমস কিংবা অলিম্পিকে কখনোই নয়।
রত্নার মতে, বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত যাঁরাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য পেয়েছেন, তাঁদের পেছনেও দীর্ঘ পরিকল্পনা বা বিনিয়োগ ছিল না দেশের ক্রীড়াঙ্গনের, ‘১৯৯০ সালে অকল্যান্ড কমনওয়েলথ গেমসে শুটিংয়ে সোনা জিতেছিলেন আতিক ভাই ও আবদুস সাত্তার নিনি ভাই—সোনা জেতার আগে এঁদের দুজনকে দেশের মানুষও তেমন করে চিনত না। ২০০২ সালে ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে আসিফ হোসেন খানের সোনা জেতাও হঠাৎ করেই, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই। কিন্তু চার-পাঁচজন তরুণ ক্রীড়াবিদকে বাছাই করে পদক জেতার জন্য পরিকল্পনামাফিক এগিয়ে যাওয়ার কোনো উদ্যোগ কখনোই দেখা যায়নি।’
অলিম্পিকে বাংলাদেশ পদক জেতার ধারে-কাছে যেতে না পারলেও বাংলাদেশের সমপর্যায়ের অনেক দেশই অলিম্পিকে পদক জিতেছে। অলিম্পিকের চিরকালীন পদক তালিকায় আছে দারিদ্র্যক্লিষ্ট ইরিত্রিয়া, জিবুতি, নাইজারের মতো দেশ। আছে বারবাডোজ, মেসিডোনিয়া, টোগো, গায়ানা কিংবা বারমুডার মতো অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের প্রায় সমপর্যায়ের দেশও। ছোট্ট দেশ শাদ কিংবা সুরিনামও অলিম্পিকে সোনা জিতে হইচই ফেলেছিল অতীতে। কিন্তু আমরা প্রথম থেকেই অলিম্পিককে বানিয়ে রেখেছি ‘শিক্ষাসফরে’র গন্তব্য হিসেবে।
দক্ষিণ এশীয় গেমসে (একসময়ের সাফ, হালে এসএ) বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানও অলিম্পিকে একাধিক পদক জিতেছে। ভারত-পাকিস্তানের একাধিক পদক জয়ে হকির একটা বড় অবদান থাকলেও ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা গৌরবের সঙ্গেই পদক তালিকায় নাম লিখিয়েছে। সুন্দর অবকাঠামো, সুষ্ঠু পরিকল্পনা, নিবিড় প্রশিক্ষণ এই কথাগুলো মিথ্যে হয়ে যায় পদক তালিকায় বিশ্বের অন্যতম ‘অনিরাপদ’ রাষ্ট্র আফগানিস্তানকে দেখলে।
অলিম্পিকে পদক জয়ের জন্য একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এমনটা মনে করেন না রত্না, ‘আসল হচ্ছে সুষ্ঠু পরিকল্পনা। প্রতিভা খুঁজে বের করা। অলিম্পিকের পদক তালিকায় অনেক ছোট দেশ, দুর্বল দেশ হয়তো আছে, কিন্তু ওই দেশগুলো যে অলিম্পিক পদকের জন্য বিনিয়োগ করেনি, সেটা কে বলবে? ভারত এখন অলিম্পিকে সাফল্যের জন্য মরিয়া। ক্রীড়াবিদদের অনুশীলন ও অবকাঠামোতে তারা বিশাল বিশাল বিনিয়োগ করছে। আমি শুটিংয়ের কথাই বলি। ২০০২ সালে ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে আসিফ হোসেন খান ভারতের অভিনব বিন্দ্রাকে হারিয়ে সোনা জিতেছিল। সেই বিন্দ্রা ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিকে ভারতকে সোনা উপহার দিয়েছে। এই একটি ঘটনা থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় সবকিছু। বোঝা যায় কোথায় আমাদের দৈন্য।’
নামের অদ্যাক্ষরের কারণেই রিও অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মার্চপাস্টে বাংলাদেশ আবির্ভূত হবে শুরুর দিকেই। লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা নিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়া দলটি যখন অলিম্পিক স্টেডিয়াম প্রদক্ষিণ করবে, তখন টেলিভিশন ধারাভাষ্যকার নিশ্চয়ই বাংলাদেশের পরিচিতি তুলে ধরবেন। তুলে ধরবেন অলিম্পিকে আমাদের অংশগ্রহণের ইতিহাসও। বিশ্বের অন্যতম জনসংখ্যাবহুল রাষ্ট্র হয়েও অলিম্পিকের সাফল্যহীনতার ইতিহাসটা আমাদের শুনতে হবে তাদের মুখ থেকেই।
স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির দুয়ারে দাঁড়িয়ে এই ব্যাপার নিয়ে ভাবনার সময় বোধ হয় এসেই গেছে।