
১৯৫০? ব্রাজিলের মানুষকে জিজ্ঞেস করে দেখুন। সালটা শুনতেই একটা দীর্ঘশ্বাস আপনা থেকেই বেরিয়ে আসবে। মারাকানার সেই হাহাকার যে ব্রাজিল বয়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। কিন্তু শুধু ব্রাজিল নয়, আর্জেন্টিনার কাছেও ১৯৫০ বিশ্বকাপ দুঃখের এক স্মৃতি হয়ে আছে। অবশ্য ভিন্ন এক কারণে।
ব্রাজিলের মাটিতে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। এই তথ্য অনেককে চমকে দিতে পারে। সে কী, সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী দেশ, সেই ব্রাজিলে ১৯৫০ বিশ্বকাপ খেলেনি আর্জেন্টিনা? না খেলেনি। এ কারণেই আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সোনালি সময়টাতেই কোনো বিশ্বকাপ জেতেনি দেশটি। প্রথম শিরোপা জয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত।
আর্জেন্টাইনদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের বড় একটি সাফল্যের হাতছানি থেকে বঞ্চিত হওয়ার গল্পটি জানতে হলে ফিরে যেতে হবে পঞ্চাশের দশকে।
তখন ছিল আর্জেন্টাইন ফুটবলের স্বর্ণযুগ। দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল দলটি। ‘জয়’ এবং ‘আর্জেন্টিনা’ যেন সমার্থক হয়ে উঠেছিল। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৭—টানা তিনবার কোপা আমেরিকার মুকুট জয় করেছিল আর্জেন্টিনা। পরের কোপা আমেরিকা অনুষ্ঠিত হওয়ার দিনক্ষণ ঠিক হয় দুই বছর বাদে, ১৯৪৯ সালে ব্রাজিলে। কিন্তু সবাইকে হতবাক করে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সেবার অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে হয়তো লজ্জার মুখে পড়তে হতো আর্জেন্টিনাকে। আলফ্রেড ডি স্টেফানোসহ আর্জেন্টিনার অনেক তারকা খেলোয়াড় সেই সময় বিরোধের জের ধরে দেশ ছেড়েছিলেন।
অনেক দিন ধরেই খেলোয়াড়দের সঙ্গে আর্থিক বিষয় নিয়ে বনাবনি হচ্ছিল না আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের। কোনো সুরাহা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়েরা করে বসেন বয়কট। অনেকেই যোগ দেন দক্ষিণ আমেরিকার তখনকার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় লিগ কলম্বিয়ান লিগে। লিগের আয়োজকদের সঙ্গে কলম্বিয়ান ফেডারেশনের মতবিরোধের কারণে শেষ পর্যন্ত আয়োজকেরা ফিফা থেকেই বেরিয়ে আসে।
কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য দেখা দেয় অন্য সংকট। একগাদা তারকা খেলোয়াড় কলম্বিয়ায় চলে যাওয়ায় দুর্বল হয়ে পড়ে জাতীয় দলটি। ১৯৪৯ কোপা আমেরিকায় এই দুর্বল দল নিয়ে খেলে লজ্জায় পড়তে চায়নি আর্জেন্টিনা।
কিন্তু প্রতিবেশী আর্জেন্টিনার এই সিদ্ধান্ত সহজভাবে নেয়নি ব্রাজিল। দুই দেশের ফুটবলীয় দ্বৈরথে যোগ হয় নতুন মাত্রা। মাঠের বাইরেও সম্পর্কের অবনতি হয়। ১৯৫০ সালে তিক্ততা চরমে পৌঁছায়। আর এ কারণে কোপার পর ১৯৫০ বিশ্বকাপেও খেলতে রাজি হয়নি আর্জেন্টিনা।
অথচ কী দারুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়েরাই ছিলেন দলে! মধ্য মাঠের জেনারেল রসি ছিলেন, ছিলেন ডি স্টেফানোর মতো সর্বকালের সেরা ফুটবলার। আরও ছিলেন দক্ষিণ আমেরিকার বিংশ শতাব্দীর সেরা গোলরক্ষক হিসেবে বিবেচিত কারিজো। এই দলটাই টানা তিনটি কোপা আমেরিকা জিতেছিল। কে জানে, সব ঠিক থাকলে ১৯৫০ বিশ্বকাপে উরুগুয়ের জায়গায় হয়তো চ্যাম্পিয়ন হতো আর্জেন্টিনাই। এই দুঃখ নতুন করে ডুবোচরের মতো জেগে উঠেছে আবার সেই ব্রাজিলেই বিশ্বকাপ হচ্ছে বলে।
১৯৫০-এর হাহাকার মুছে দিতে চায় ব্রাজিল। আর্জেন্টিনাও নিশ্চয়ই মনে মনে পণ করছে ১৯৫০-এর দুঃখ মুছে ফেলার।