
ডারউইনে বাংলাদেশের জয়টা সবার কাছেই ‘স্পেশাল’। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের বিপক্ষে টেস্ট জেতা তো আর মুখের কথা নয়। তবু অন্যদের চেয়ে মুশফিকুর রহিমের আনন্দটা একটু আলাদাই হওয়ার কথা। ২১ বছর আর ১০০-এর বেশি টেস্ট খেললেও এর আগে কখনো অস্ট্রেলিয়ায় লাল বলে খেলা হয়নি।
সেই মুশফিক অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেই পেয়ে গেছেন জয়ের স্বাদও। এমন জয়ের পর দলের সবার উদ্দেশে দাঁড়িয়ে কথা বলেন মুশফিক। আজ তাঁর বক্তব্যের ওই ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে বিসিবির ফেসবুক পেজ থেকে। সেটিই হুবহু দেওয়া হলো এখানে...
‘এই দলটা, বিশেষ করে লাল বলের দলটার কাছ থেকে আমি যদি কিছু নিয়ে যেতে পারি, তাহলে তা দারুণ স্মৃতি হবে। আমি সত্যিই খুব গর্বিত। গত ৩ থেকে ৫ বছরে আমি এই দলে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটা দেখেছি—তোমরা সবাই নিজেদের উন্নতি করতে চাও, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগতভাবে যখন তোমরা নিজেদের খেলা ২ শতাংশ বাড়িয়ে নাও, তখন পুরো দল হিসেবে জিনিসটা দারুণভাবে কাজ করে এবং এ ধরনের (অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর মতো) ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
এই বিষয়টা আমাকে খুব আনন্দ দেয়। ১০, ১৫ বা ২০ বছর আগে খেলোয়াড়েরা শুধু নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখত, পুরো দলের ওপর নয়। কিন্তু এখন এই ১৫ বা ১৬ জনের দলে আমি ৮ থেকে ৯ জন ম্যাচ জেতানোর মতো খেলোয়াড় দেখতে পাই, একজন অধিনায়কের জন্য এটা সবচেয়ে বড় পাওয়া।
‘এ ধরনের জয় আমরা আগেও পেয়েছি, কিন্তু ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উন্নতিই আসল চাবিকাঠি। আর উন্নতির সীমা হলো আকাশ। তোমরা আনন্দ করতে পারো, তবে এরপরের কাজ হলো কীভাবে আমরা এটার পুনরাবৃত্তি করতে পারি।
আর সেটির একমাত্র উপায় হলো দিন-রাত লেগে থাকা। এখানে কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই। টেস্টে মাঠের ভেতরে-বাইরে সাড়ে তিন থেকে চার দিনের টানা হাড়ভাঙা খাটুনির পর কেমন অনুভূতি হয়, তা তোমরা অনুভব করতে পারছ। টেস্ট ক্রিকেট এভাবেই খেলতে হয়। জয় বা পরাজয় বড় কথা নয়; মাঠের ভেতরে ও বাইরে মনোভাবটা এমনই হওয়া উচিত। তোমাদের শুধু প্রক্রিয়াটি নিয়ে ভাবতে হবে, ফলাফল এমনিতেই চলে আসবে।
মুমিনুলকে নিয়ে আমি কিছু কথা শেয়ার করতে চাই। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে আমাদের সবশেষ বড় জয়ের কথা যদি বলি, আমি যদি ভুল না করে থাকি, আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—প্রতিটা সেশন জেতা। আমরা এটাকে একটা ওয়ানডে ম্যাচের মতো ধরে নিয়েছিলাম আর ওই দিনে অন্তত ৩টি সেশনের মধ্যে দুটি বা তিনটিই আমাদের জিততে হতো। আমরা প্রতিবার মাঠে নেমে এভাবেই খেলাটাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিতে পারি, পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন।
ওরাও মানুষ, শুধু এই কথাটা মনে রাখবে। তোমরা যদি নিজেদের সঠিক প্রক্রিয়ায় অটল থাকো, ওপরওয়ালার ওপর বিশ্বাস রাখো, তবে ফলাফল এমনিতেই আসবে। দিন শেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তোমরা নিজেদের বলতে পারবে যে নিজেদের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছ।
প্রতিদিন সবাই রান করবে না বা উইকেট পাবে না, কিন্তু নিজের ১০০ শতাংশ দিলে তা তোমাকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দেবে। আমি নিশ্চিত, লিটন (ডারউইন টেস্টের প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়েছেন) কত রান করল, তা নিয়ে এখন ওর মাথাব্যথা নেই, আমরা জিতেছি বলেও অনেক বেশি খুশি।
একটা ম্যাচে হয়তো পাঁচ বা আট জন ব্যাটসম্যানই সেঞ্চুরি করবে না, কিন্তু সে যে এফোর্টটা দিচ্ছে, সেটাই আসল। ইনশা আল্লাহ, পরের ম্যাচে তুমি হয়তো রান করবে আর অন্য কেউ ব্যর্থ হবে। কেউ ভালো করলে সেই আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উচিত, আর কেউ খারাপ করলে তার কাছে গিয়ে বলা উচিত—ইনশা আল্লাহ, আগামীকাল তোমার দিন হবে। এভাবেই একটা দলের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। ব্যক্তিগতভাবে কে কতটুকু অর্জন করলে তা বড় কথা নয়; আমার কাছে দল হিসেবে আমরা কী অর্জন করলাম, সেটাই বড় বিষয়।
তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ।’