পুরুষ এশিয়া কাপ ট্রফি
পুরুষ এশিয়া কাপ ট্রফি

ভারতের ট্রফিগুলো নাকভি কোথায় রাখছেন

এশিয়া কাপে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের চেয়ে মহসিন নাকভির পারফরম্যান্স ভালো।

সেটা শিরোপার হিসাবে। ছেলেদের এশিয়া কাপে বাংলাদেশের ট্রফি নেই। মেয়েদের এশিয়া কাপে নেই পাকিস্তানেরও। কিন্তু মহসিন নাকভির আছে। একটি নয়, দুটি ট্রফি এবং তাতে ভারতের অবদান অনেক।

খেলাধুলায় আসলে জেতাই শেষ কথা। সেটা যেমন মাঠের খেলায়, তেমনি রাজনীতির খেলায়। মাঠে যেমন ধরুন গত বছর ছেলেদের এশিয়া কাপ জিতেছিল ভারত। মাঠের বাইরে রাজনীতির খেলায় তখন ভারত-পাকিস্তান এখনকার মতোই মুখোমুখি। আর এশিয়া কাপের আয়োজক এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সভাপতি ছিলেন মহসিন নাকভি। তখনকার বৈরী সম্পর্কের জেরেই নাকভির কাছ থেকে এশিয়া কাপের সেই ট্রফিটি নেননি সূর্যকুমার যাদবরা। ট্রফিটি থেকে যায় নাকভির কাছেই।

তো একটু রসিকতার ছলে তো বলাই যায়—রাজনীতির সে খেলায় ক্রিকেট হারলেও নাকভির সেই ট্রফি পাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল ভারতই। পরিস্থিতি পাল্টায়নি গত পরশু দুবাইয়ে মেয়েদের এশিয়া কাপের ফাইনাল শেষেও। বিজয়ী দল হিসেবে ভারতের মেয়েদের হাতে ট্রফিটি তুলে দিতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন এসিসি সভাপতি নাকভি। কিন্তু ওই যে দুই প্রতিবেশীর রাজনীতির খেলায় এবারও ভারতের ক্রিকেট দল ট্রফিটি নাকভির কাছে রেখেই দেশে ফিরেছে।

রাজনীতির এই খেলার প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। তার আগে বলুন তো, ভারতের এ দুটি ট্রফি নাকভি রেখেছেন কোথায়?

পিসিবি ও এসিসি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি

চাইলে গোয়েন্দা ঠিক করতে পারেন। কিন্তু সূর্যকুমারদের জেতা এশিয়া কাপ ট্রফির হদিস আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। গত বছর সেপ্টেম্বরে দুবাইয়ে ফাইনাল শেষে অক্টোবরে জানা যায়, দুবাইয়ে এসিসি সদর দপ্তর থেকে এশিয়া কাপের ট্রফিটি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আবুধাবির এক অজানা ঠিকানায়, যেটা মহসিন নাকভি ছাড়া আর কেউ জানেন না।

সূর্যকুমাররা মঞ্চে নাকভির কাছ থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তাঁর নির্দেশে সেটি নিয়ে যাওয়া হয় দুবাইয়ে এসিসির সদর দপ্তরে। এসিসি সভাপতি নাকভি শর্ত দেন, ট্রফি নিতে হলে ভারতীয় দলের কাউকে এসিসি দপ্তরে এসে নিতে হবে। ফাইনালের দুই দিন পর এসিসির মুলতবি সভায় ট্রফির প্রসঙ্গ উঠলেও সমাধান মেলেনি।

সেই অক্টোবরেই ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআই জানায়, এসিসির সদর দপ্তর থেকে ট্রফি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আবুধাবির কোনো এক জায়গায়। সেখানে ট্রফিটি নাকভির হেফাজতে রয়েছে। এএনআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিসিসিআইয়ের এক কর্মকর্তা এসিসি দপ্তরে গিয়ে দেখেন, ট্রফি সেখানে নেই। এসিসির কর্মীরা তাঁকে জানান, ট্রফি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আবুধাবিতে, তবে ঠিক কোথায় আছে, সেটা নাকভি ছাড়া কেউ জানেন না।

এরপর সূর্যকুমারদের জেতা সেই ট্রফির বিষয়ে আর কিছু জানা যায়নি।

সেই দৃশ্য, ২০২৫ এশিয়া কাপ ফাইনাল শেষে চ্যাম্পিয়ন ভারতের অদৃশ্য ট্রফি নিয়ে উদ্‌যাপন

ছেলেদের সেই এশিয়া কাপের ফাইনালে মঞ্চে তবু এশিয়া কাপের ট্রফিটি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু পরশু দুবাইয়েই মেয়েদের টুর্নামেন্টে ভারত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর কিন্তু মঞ্চে ট্রফিটি দেখা যায়নি। কারণটা বোঝা গেছে পরে। হারমানপ্রীত কৌরের দল চ্যাম্পিয়ন হয়ে পদক এবং ট্রফি ছাড়াই মাঠ ছাড়ার পর ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে একটি বিবৃতি দেন বিসিসিআই সেক্রেটারি দেবজিৎ সাইকিয়া।

সাইকিয়া সেই বিবৃতিতে বলেন, ‘সব দিক বিবেচনায় আমরা সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারতীয় দল ট্রফি বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবে না—সে কথা আমরা আগেই এসিসিকে জানিয়ে দিয়েছিলাম।’ সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ফাইনালের আগের দিনই বিসিসিআই জানিয়ে দিয়েছিল মহসিন নাকভি যদি পদক ও ট্রফি তুলে দেন, তবে ভারতীয় দল সেই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে না।

এসিসি সভাপতি হিসেবে বিসিসিআইয়ের এই সিদ্ধান্ত যেহেতু নাকভি আগেই জানতেন, সে কারণেই কি ফাইনাল শেষে পুরস্কার বিতরণীর মঞ্চে চ্যাম্পিয়নের ট্রফিটি রাখা হয়নি? এই প্রশ্নের সঙ্গে উঠতে পারেন আরেকটি প্রশ্নও, ট্রফিটি তাহলে কোথায় আছে?

এশিয়া কাপের আয়োজক এসিসি। তাই এতটুকু আন্দাজ করে নেওয়াই যায়, ট্রফিটি তাহলে হয়তো দুবাইয়ে এসিসির সদর দপ্তরেই আছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছুই জানা যায়নি। ভারত নারী দলের কোচ অমল মজুমদার ফাইনাল শেষে জানান, ট্রফি নিয়ে কোনো হালনাগাদ তথ্য তাঁর জানা নেই। জানতে চাওয়া হয়েছিল, দল কবে এ ট্রফি পেতে পারে? অমল মজুমদারের উত্তর, ‘এ পর্যন্ত কোনো খবর নেই। তাই আমি এ নিয়ে উত্তর দিতে পারছি না।’

এশিয়া কাপ ফাইনালের পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের সময় ভারতের ক্রিকেটাররা উপস্থিত হননি

ট্রফির খোঁজে উত্তর আসলে কারও কাছেই নেই। তবে কেন এমন ঘটল, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রায় সবারই জানা।

ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক বৈরী সম্পর্ক নতুন নয়। সেই আগুনে নতুন করে ঘৃতাহুতি হয় গত বছর এপ্রিলে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলার পর। ভারত মনে করে, সেই হামলাকে কেন্দ্র করে গত মে মাসে দুই দেশের মধ্যে যে সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছিল, তাতে মদদ ছিল নাকভির। এসিসি প্রধানের পাশাপাশি নাকভি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান ও দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। এ কারণে তাঁর কাছ থেকে ছেলেদের সেই আসরের ট্রফি নেননি সূর্যকুমাররা।

এবার মেয়েদের আসরেও ঠিক একই ঘটনা দেখা গেল। কারণ, বিসিসিআই চেয়েছিল চ্যাম্পিয়ন দলের ট্রফি এসিসি সহসভাপতির হাত থেকে দেওয়া হোক। কিন্তু নাকভি তাতে রাজি হননি। এসিসি প্রধান হিসেবে নাকভি বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারত তাতে রাজি হয়নি। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নাকভি রানার্সআপ শ্রীলঙ্কার হাতে প্রাইজমানি তুলে দেন। এরপর হঠাৎই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়।

কিন্তু এখানেই কি সব শেষ? সম্ভবত না। শিগগিরই আরেকটি পর্ব দেখা যেতে পারে।

ট্রফি না নেওয়া ভারতীয় ক্রিকেট দলে পরে নিজেদের মতো করে ফটোসেশন করে

জাপানে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে এশিয়ান গেমস। এই আসরের ক্রিকেট ইভেন্ট শুরু হবে দুই দিন আগে। ভারতের ছেলে ও মেয়েদের দল অংশ নেবে ক্রিকেটে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ছেলে ও মেয়েদের দুটি ইভেন্টে ভারত ফেবারিট। ভারত যদি দুটি কিংবা একটি ইভেন্টের ফাইনালে উঠে চ্যাম্পিয়ন হয়, তাহলে কিন্তু আবারও একই দৃশ্যের অবতারণা হতে পারে। কারণ, এশিয়ান গেমসের ক্রিকেট ইভেন্ট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে এসিসি। মহাদেশীয় এই ক্রিকেট সংস্থার প্রধান হিসেবে নাকভিকে যদি পদক বিতরণী অনুষ্ঠানে দেখা যায় এবং সেই চ্যাম্পিয়ন দল যদি হয় ভারত, তাহলে?

তাহলে আর কী? দুটি ট্রফির পর হয়তো পদকেরও খোঁজ করতে হবে! আগামী বছর এপ্রিলে এসিসি সভাপতি হিসেবে মেয়াদ শেষ হবে নাকভির। তার আগপর্যন্ত এটাই বুঝি নিয়তি? ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় সিরিজ তো হয় না। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বহুদলীয় টুর্নামেন্টে দুই প্রতিবেশীকে মুখোমুখি হতে দেখা যায়। অর্থাৎ নাকভি যত দিন আছেন, মহাদেশীয় আঞ্চলিক টুর্নামেন্টে ভারত চ্যাম্পিয়ন হলে আর নাকভি পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে বিজয়ী দলকে ট্রফি দেওয়ার জিদটা ধরে রাখলে এটাই নিয়তি।