
ক্রিকেটে একটা কথা খুব প্রচলিত। রেকর্ড গড়া হয় ভাঙার জন্য। কিন্তু সব রেকর্ড কি ভাঙতে ইচ্ছা করে? কিছু রেকর্ড আছে, যেগুলো নিজের নামের পাশে না থাকলেই বরং স্বস্তি। ক্রিকেটের স্কোরকার্ডে সেগুলো লজ্জার স্মারক হয়ে থাকে। যত দিন যায়, ততই যেন ভারী হয়ে ওঠে সেই লজ্জার বোঝা।
টেস্ট ক্রিকেটে ইনিংস ব্যবধানে হার তেমনই এক রেকর্ড। প্রতিপক্ষ একবার ব্যাট করে যে রান তুলেছে, দুই ইনিংস মিলিয়েও তা করতে পারেনি কোনো দল। পরাজয়ের এর চেয়ে নির্মম চেহারা আর কী হতে পারে!
এই লজ্জায় এবার ডুবেছে অস্ট্রেলিয়া। গেবেখা টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ইনিংস ও ৩১ রানে হেরেছে প্যাট কামিন্সের দল। অস্ট্রেলিয়ার মতো ক্রিকেট পরাশক্তির জন্য এমন হার নিশ্চয়ই বড় ধাক্কা। কিন্তু ইতিহাসের পুরোনো খাতা খুললে দেখা যাচ্ছে, এই লজ্জা তাদের কাছে একেবারে অপরিচিত নয়।
১৪৯ বছরের টেস্ট ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়া এ নিয়ে ৪১ বার ফলোঅনে পড়েছে। ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে ৪৭ বার।
সংখ্যাটা বড় মনে হচ্ছে? তাহলে বাংলাদেশের হিসাবটা শুনুন।
অস্ট্রেলিয়া ১৪৯ বছরে যতবার ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে, বাংলাদেশ তার চেয়েও বেশিবার হেরেছে মাত্র ২৬ বছরে!
অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। ২০০০ সালের ২৬ জুন টেস্ট মর্যাদা পাওয়া বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ১৬২টি টেস্ট খেলেছে। এর মধ্যে ৪৯টিতেই হার ইনিংস ব্যবধানে। অর্থাৎ প্রায় প্রতি তিন টেস্টের একটিতে বাংলাদেশকে দেখতে হয়েছে পরাজয়ের সবচেয়ে বিব্রতকর চেহারা।
আরও অবাক করার মতো ব্যাপার আছে। একুশ শতকে অন্য কোনো দলই ইনিংস ব্যবধানে হারের সংখ্যায় ৩০ স্পর্শ করতে পারেনি। সেখানে বাংলাদেশের ৪৯!
তবে বাংলাদেশের এই লজ্জার রেকর্ড নিয়ে আলোচনার আগে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে একটু চোখ ফেরানো যাক।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট মানেই তো একটা সময় ছিল প্রতিপক্ষকে শাসন করার গল্প। ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যাট, ডেনিস লিলির আগুনঝরা বোলিং, শেন ওয়ার্নের ঘূর্ণিজাদু কিংবা স্টিভ ওয়াহ ও রিকি পন্টিংয়ের অপ্রতিরোধ্য দল। ক্রিকেটের রাজদণ্ড যেন অনেকটা সময় অস্ট্রেলিয়ার হাতেই ছিল।
অথচ সেই অস্ট্রেলিয়াকেও ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে ইনিংস ব্যবধানে হারের তিক্ততা হজম করতে হয়েছে।
১৮৮৩ থেকে ১৮৮৮ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের কাছে সাতবার ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল অস্ট্রেলিয়া। ১৮৯০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত আরও দুবার। পরের ১০ বছরে দুবার। ১৯১০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে পাঁচবার।
সেই সময় পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ব্যবধানে হারানোর একচেটিয়া অধিকার যেন ইংল্যান্ডেরই ছিল।
সেই একাধিপত্য ভাঙে ১৯৭০ সালে। ডারবানের কিংসমিডে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের বাইরে কোনো দলের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হারে অস্ট্রেলিয়া। দলটি দক্ষিণ আফ্রিকা।
কী আশ্চর্য সমাপতন! অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর সেই দক্ষিণ আফ্রিকাই আবার অস্ট্রেলিয়াকে মনে করিয়ে দিল পুরোনো লজ্জার কথা।
১৯৫০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ১০ বার ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল অস্ট্রেলিয়া। আশির দশকের শুরু থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত আরও ১১ বার। আর পরের ২৬ বছরে ১০ বার।
অর্থাৎ একুশ শতকে ২৮৪টি টেস্ট খেলে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস ব্যবধানে হার মাত্র ১০টি।
এবার অন্য দলগুলোর দিকে তাকানো যাক।
২০০০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে হিসাব করলে বাংলাদেশের পর সবচেয়ে বেশি ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। একসময় যাদের পেস আক্রমণ ছিল ব্যাটসম্যানদের কাছে দুঃস্বপ্ন, সেই ক্যারিবীয়রা এই শতকে ২৪২টি টেস্ট খেলে ২৮ বার ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরই ইংল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ে। দুই দলেরই ইনিংস ব্যবধানে হার ২৭টি করে। তবে এই দুই দলের পরিসংখ্যানে আকাশ–পাতাল পার্থক্য। ইংল্যান্ড ৩৩৬টি টেস্ট খেলে ২৭ বার হেরেছে ইনিংস ব্যবধানে। জিম্বাবুয়ে একই সংখ্যক হার দেখেছে মাত্র ৯১ টেস্টে।
শ্রীলঙ্কার ২৩৫ টেস্টে ২৫ বার ইনিংস ব্যবধানে হার। পাকিস্তানের ২১৩ টেস্টে ১৯ বার। ভারতের ২৭১ টেস্টে ১৬ বার। নিউজিল্যান্ড ২১১ টেস্ট খেলে হেরেছে ১২ বার। দক্ষিণ আফ্রিকার ২৪৩ টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হার ১১টি।
আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের টেস্ট ইতিহাস অবশ্য অনেক ছোট। আফগানিস্তান ১৪ টেস্টে চারবার এবং আয়ারল্যান্ড ১৩ টেস্টে তিনবার ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে।
এবার বাংলাদেশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার তুলনাটা আরেকবার করুন।
এই শতকে অস্ট্রেলিয়া ২৮৪টি টেস্ট খেলে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে ১০ বার। বাংলাদেশ ১৬২টি টেস্টেই হেরেছে ৪৯ বার। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ১২২টি টেস্ট কম খেলেও বাংলাদেশের ইনিংস ব্যবধানে হার প্রায় পাঁচ গুণ!
শুধু অস্ট্রেলিয়া কেন, এই শতকে ভারত, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার সম্মিলিত ইনিংস ব্যবধানে হারও বাংলাদেশের চেয়ে কম। তিন দলের মোট হার ৩৯টি। বাংলাদেশের একারই ৪৯।
সংখ্যাগুলো বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের একটা অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এনে দেয়। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর পেরিয়ে গেছে ২৬ বছর। এই সময়ে এসেছে স্মরণীয় কিছু জয়, ব্যক্তিগত অনেক কীর্তি। কিন্তু পাঁচ দিনের ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার পরীক্ষায় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার ছবিটাও স্পষ্ট।
টেস্ট ক্রিকেটে হার অস্বাভাবিক কিছু নয়। ব্র্যাডম্যানের অস্ট্রেলিয়াও হেরেছে। ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোকেও কখনো কখনো মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু হার আর ইনিংস ব্যবধানে হারের মধ্যে যে পার্থক্য, সেটি শুধু স্কোরকার্ডের নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারা আর প্রতিপক্ষের সামনে প্রায় অসহায় আত্মসমর্পণের পার্থক্য।
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সামনে এখন সেই আয়না।