পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত পিসিবি কার্যালয়
পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত পিসিবি কার্যালয়

পাকিস্তান ক্রিকেট: পাঁচ বছরের ‘বাজনা’য় ১১ কোচ বদল

শৈশবে একটি খেলা অনেকেই খেলেছেন—‘বাজনা থামলে বসব কোথায়’। কারও কারও কাছে খেলাটি ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ নামে পরিচিত। প্রতিযোগীর সংখ্যার চেয়ে একটি চেয়ার কম থাকে। বাজনা কিংবা গান চলাকালীন প্রতিযোগীরা চেয়ারের চারপাশে গোল হয়ে ঘোরেন। বাজনা থামলেই বসতে হবে। যিনি চেয়ার পাবেন না, খেলা থেকে তিনি বাদ।

পাকিস্তান ক্রিকেটের অবস্থাও কি এখন এই খেলার মতো? তবে একটু ঘুরিয়ে বলতে হবে—বাজনা (খেলা) থামলে বসার জায়গা থাকছে না। বসার জায়গা রীতিমতো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একটি নয়, একাধিক!

সাম্প্রতিক ঘটনা তো সবারই জানা। ইংল্যান্ডের মাটিতে তিন টেস্টের সিরিজে এরই মধ্যে ২-০ ব্যবধানে হেরে বসেছে পাকিস্তান। এজবাস্টনের শেষ টেস্টের আগে সাত খেলোয়াড়কে দল থেকে বাদ দিয়েছে পাকিস্তান টিম ম্যানেজমেন্ট। প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ ও বোলিং কোচ উমর গুলকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সিরিজ চলার মধ্যেই বাজনাও ধরে নিতে পারেন—দলে কয়েকজনের জায়গা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর হুট করে আড়মোড়া ভেঙে এসব কিছুই করা হয়েছে স্রেফ একটি নিয়মরক্ষার ম্যাচের আগে। অবিশ্বাস্য, তা–ই না!

পাকিস্তান ক্রিকেটের ধারা জানা থাকলে অবশ্য বলতে হয়, না, মোটেও অবিশ্বাস্য কিছু নয়। অনেক দিন ধরে তাদের জন্য এটাই স্বাভাবিক। নিশ্চয়তা দিয়ে অনিশ্চয়তা লালনে পাকিস্তান ক্রিকেট এতটাই ধারাবাহিক! হুটহাট দল কিংবা ম্যানেজমেন্ট থেকে এক বা একাধিক মানুষের ‘চেয়ার’ সরিয়ে নেওয়া তাদের বহু বছরের অভ্যাস। তবে অতটা পেছনে না তাকালেও চলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর উদাহরণই দেওয়া যায়। সেটা ব্যবস্থাপনা বা কোচিং পর্ষদ নিয়ে।

কোনো সিরিজ বা টুর্নামেন্টে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পরপরই রদবদল ঘটে কোচিংয়ে। আগের কোচিং স্টাফ নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার আগেই শুরু হয় নতুন কোচের অধ্যায়। গত পাঁচ বছরের বেশির ভাগ সময় এই ধারা চলেছে পাকিস্তান ক্রিকেটে। বদল হয়েছেন ১১ জন কোচ। এ সময়ে খুব কমসংখ্যক কোচই তাঁদের মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে মিসবাহ-উল-হক প্রধান কোচের দায়িত্ব ছাড়ার পর একের পর এক স্থায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন এবং বিভিন্ন সংস্করণে আলাদা কোচ নিয়োগ দিয়েছে পাকিস্তান।

সেই সময় মিসবাহ ও বোলিং কোচ ওয়াকার তাঁদের চুক্তির মেয়াদ এক বছর বাকি থাকতেই সরে দাঁড়ান। কারণ হিসেবে অন্তর্গত কোন্দলের গুঞ্জন উঠেছিল। সাকলায়েন মুশতাক ও আবদুল রাজ্জাককে অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব দেয় পিসিবি। পরবর্তী সময়ে সাকলায়েন স্থায়ী প্রধান কোচ হন এবং ২০২২-২৩ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত সব সংস্করণেই পাকিস্তানের দায়িত্ব সামলান।

সাকলায়েনের মেয়াদ শেষে ২০২৩ সালের মার্চে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি সিরিজের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান কোচের দায়িত্ব পান আবদুল রেহমান। পাশাপাশি পরবর্তী স্থায়ী কোচ নিয়োগে সহায়তার জন্য পরামর্শক হিসেবে মিকি আর্থারকে যুক্ত করে পিসিবি। কী জটিল প্রক্রিয়া!

সে যা হোক, নতুন প্রধান কোচ হিসেবে নিউজিল্যান্ডের গ্র্যান্ট ব্র্যাডবার্নকে বেছে নেন আর্থার। ব্র্যাডবার্নকে নিয়োগ দেওয়া হয় তিন বছরের জন্য। কিন্তু ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান সেমিফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হওয়ার পর তাঁর পদমর্যাদা এবং দায়িত্বের পরিধি কমিয়ে দেয় পিসিবি। ব্রাডবার্ন দায়িত্ব ছেড়ে ইংলিশ কাউন্টি দল গ্ল্যামারগনে যোগ দেন।

সে বছরই নভেম্বরে টিম ডিরেক্টর হিসেবে মোহাম্মদ হাফিজকে নিয়োগ দেয় পিসিবি। কিন্তু পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে চলে যেতে হয়। এর কারণ হিসেবে এক্সে হাফিজ জানান, ‘পিসিবির দেওয়া চার বছরের নির্ধারিত মেয়াদের ইতি টানা হলো মাত্র দুই মাসের মাথায় বোর্ডে নতুন চেয়ারম্যানশিপ আসার কারণে।’ তখন পিসিবির নতুন চেয়ারম্যান হন মহসিন নাকভি।

২০২৪ সালের এপ্রিলে আজহার মেহমুদকে নিউজিল্যান্ড সিরিজের জন্য কোচের দায়িত্ব দিয়ে স্থায়ী কোচ খুঁজতে শুরু করে পিসিবি। এরপর জেসন গিলেস্পিকে লাল বল ও গ্যারি কারস্টেনকে সাদা বলের সংস্করণে কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে বছর টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তান গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ার পর অক্টোবরে পদত্যাগ করেন কারস্টেন। পিসিবির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়েও টানাপড়েন চলছিল। তাঁর জায়গায় গিলেস্পি ছয় মাস সাদা বলের দায়িত্ব পালন করেন এবং শেষ পর্যন্ত পিসিবির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে তিনিও বিদায় নেন।

২০২৪ সালেই নভেম্বরে গিলেস্পির কাছ থেকে সাদা বলে অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব নেন নির্বাচক কমিটির সদস্য আকিব জাভেদ। এক মাস পর গিলেস্পি বিদায় নিলে লাল বলে কোচিংয়ের দায়িত্বও পান সাবেক এ পেসার।

গত বছর মে মাসে আকিবের কাছ থেকে সাদা বলে কোচের দায়িত্ব বুঝে নেন মাইক হেসন। পরের মাসে লাল বলে অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্বে ফেরেন আজহার মাহমুদ। কিন্তু পিসিবি এই সিদ্ধান্তেও স্থির থাকতে পারেনি।

সর্বশেষ সরফরাজ আহমেদকে সরিয়ে দিয়েছে পিসিবি

বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের আগে চলতি বছর এপ্রিলে টেস্ট দলের কোচের দায়িত্ব পান সরফরাজ। টিকতে পেরেছেন মাত্র পাঁচ মাস। তাঁর জায়গায় হেসনকে টেস্ট দলের দায়িত্বও দেওয়া হয়।

আসলে কোচিং স্টাফে এই যে ঘন ঘন এত পরিবর্তন, কিন্তু প্রত্যাশামতো ফল না পাওয়ায় পাকিস্তান ক্রিকেট এখন অনেকের কাছেই হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছে। সরফরাজ ও গুলকে সরিয়ে দেওয়ার একদিন পর ফিল্ডিং কোচ চেয়ে লিংকডইনে বিজ্ঞপ্তি দেয় পিসিবি। সেখানে হাস্যরসাত্মক খোঁচা হজম করতে হচ্ছে তাদের। এক নেটিজেন বিজ্ঞপ্তিতে মন্তব্য করেন, ‘মনে হচ্ছে পিসিবির কাছে জমা পড়া জীবনবৃত্তান্তের তালিকা শেষ হয়ে গেছে। তাই নিয়োগপ্রক্রিয়াটিকে মেধাভিত্তিক বা স্বচ্ছ দেখানোর জন্যই বাধ্য হয়ে এমন প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।’ অন্য এক নেটিজেনের মন্তব্য, ‘পাকিস্তান ক্রিকেট আসলেই নিত্যনতুন নাটকের এক অফুরন্ত উৎস, তাই না?’

উত্তরে ব্যাপারটা অস্বীকার করা খুব কঠিন।