বাংলাদেশের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়া ভারতের ২০৩৬ সালের অলিম্পিক আয়োজক হওয়ার প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলতে পারে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানিয়েছে, খেলাধুলায় রাজনীতির অনুপ্রবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) কড়া মনোভাবই ভারতের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) থেকে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনে রূপ নেয়। ভারতে নিরাপত্তাশঙ্কায় টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার কথা জানিয়ে ৪ জানুয়ারি আইসিসিকে ভেন্যু বদলের অনুরোধ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ২১ জানুয়ারি বোর্ডসভার পর আইসিসি জানায়, বাংলাদেশকে পূর্বসূচি অনুযায়ী ভারতেই খেলতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় তাদের বাদ দিয়ে বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে আইসিসি। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কা।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে ভারতেই খেলার কথা বলার সিদ্ধান্তটি আইসিসির। তবে এ বিষয়ে বিসিসিআইয়েরও হাত রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তর না করতে বিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে আইসিসিতে তদবির করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে লেখা হয়, ‘আইসিসি কাগজে-কলমে স্বাধীন হলেও ভারতের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইতিহাস তাদের পুরোনো। ২০২৪ বিশ্বকাপে আর্থিক ও সম্প্রচার স্বত্বের খাতিরে ভারতকে গায়ানায় সেমিফাইনাল খেলার আগাম নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে বেশ সমালোচনাও হয়।’
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে আরও লেখা হয়, বিসিসিআই আইসিসিতে অনেক প্রভাবশালী এবং ভারত সরকারের সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ আগে বিসিসিআইয়ের সচিব ছিলেন; তাঁর বাবা অমিত শাহ নরেন্দ্র মোদি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এমনকি আইসিসির বর্তমান প্রধান নির্বাহী সংযোগ গুপ্তা আগে জিও-স্টারের স্পোর্টস প্রধান ছিলেন, যে প্রতিষ্ঠানটি ভারতে আইসিসির সব ইভেন্টের একচেটিয়া সম্প্রচারের স্বত্বাধিকারী।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজে সময়ে এই রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে ভারত। গত মাসে দিল্লির ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমসের আয়োজক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর এখন ভারতের পাখির চোখ ২০৩৬ সালের আহমেদাবাদ অলিম্পিক। যেখানে তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কাতার।
আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রতি সহনশীলতা আইসিসির চেয়ে কম। গার্ডিয়ানকে আইওসির একটি সূত্র জানিয়েছে, অন্য দেশগুলো বয়কট করতে পারে, এমন কোনো ঝুঁকি থাকলে ভারতকে গেমস আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়াটা আইওসির জন্য প্রায় ‘অকল্পনীয়’। অলিম্পিক চার্টার অনুযায়ী, ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চলতে হয় এবং অলিম্পিক চলাকালীন যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতপ্রকাশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আইওসির এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রমাণ গত অক্টোবরেই পাওয়া গেছে। জাকার্তায় বিশ্ব জিমন্যাস্টিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ইসরায়েলি দলকে ভিসা দিতে অস্বীকার করায় ইন্দোনেশিয়াকে অলিম্পিক আয়োজনের দৌড় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়াও ২০৩৬ অলিম্পিকের আয়োজক হতে চেয়েছিল, কিন্তু শুরুতেই তারা হোঁচট খেল।
১৯০০ সালের পর ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ফিরছে ক্রিকেট। ২০৩২ ব্রিসবেন আসরেও এটি থাকছে। অলিম্পিকে ক্রিকেটকে ফেরানো হয়েছে মূলত ভারতের বিশাল বাজার ধরার জন্যই। তবে সেটা যেকোনো মূল্যে নয়।
এবার টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হবে। ভারত গত বছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিজেদের ম্যাচগুলো পাকিস্তানে না খেলে দুবাইয়ে খেলেছে। কারণ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ম্যাচ খেলতে বিসিসিআই পাকিস্তানে দল পাঠাতে রাজি না হওয়ার পর আইসিসি, পিসিবি ও বিসিসিআইয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। সেখানে ঠিক করা হয়, টুর্নামেন্টে ভারতের ম্যাচগুলো হবে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। একই সঙ্গে বলা হয়, ২০২৪ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে আইসিসি ইভেন্টে ভারত–পাকিস্তানের সব ম্যাচই হবে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। বর্তমানে দুই প্রতিবেশী দেশ আর দ্বিপাক্ষিক সিরিজেও খেলে না।
গার্ডিয়ানকে আইওসির ওই সূত্র আরও বলেছে, অলিম্পিক আয়োজনের যোগ্য আয়োজক হিসেবে বিবেচিত হতে চাইলে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির শক্ত প্রমাণ দেখাতে হবে ভারতকে।