
জ্বর হলে মানুষ সাধারণত কী করে? লেপ মুড়ে শুয়ে থাকে, গরম স্যুপ খায়, আর রিমোটটা হাতে নিয়ে চ্যানেল পাল্টাতে থাকে। ইমরান খানও হয়তো তা-ই করছিলেন। তবে তাঁর জ্বরের দিনের চ্যানেল-বদলে পাকিস্তান ক্রিকেটের পরের দুই দশক পাল্টে গিয়েছিল।
টিভিতে তখন সুপার উইলস কাপের একটা ম্যাচ। যাতে খেলছে ভারত ও পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটের দুই চ্যাম্পিয়ন দিল্লি ও ইউনাইটেড ব্যাংক। ফার্স্ট ক্লাসে মাত্র ৫-৬টা ম্যাচ খেলা এক রোগা কিশোর বেশ জোরে বল করছে। ওয়াকার ইউনিস নিজেই বলছেন, সেই সুযোগটা তিনি পেয়েছিলেন হঠাৎ করে। বাড়িতে বসে স্পেলটা দেখলেন অসুস্থ ইমরান।
পরদিন ইমরান নিজেই হাজির মাঠে। জ্বর সম্ভবত তখনো পুরো যায়নি, কিন্তু কৌতূহল গেছে বহুদূর। কিছুক্ষণ বোলিং দেখলেন। তারপর সেই গাম্ভীর্যমাখা গলায় বললেন, ‘তুমি পাকিস্তানের হয়ে খেলার জন্য শারজা যাচ্ছ।’
ব্যস, এটুকুই। কোনো ট্রায়াল নেই, কোনো নির্বাচক কমিটি নেই। একজন অধিনায়কের জ্বরো চোখ আর একটা বাক্য। ওয়াকারের বয়স তখন ১৭-১৮। অবিশ্বাস্য ব্যাপারটা তিনি এখনো ভোলেননি।
কথাগুলো ওয়াকার বলেছেন জিনিউজ ও আজতকের সাবেক সাংবাদিক শুভঙ্কর মিশ্রের জনপ্রিয় এক পডকাস্টে। যেখানে দুজনের কথা হয়েছে ইমরানকে নিয়ে, ওয়াসিম আকরামের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে, বুমরাকে নিয়ে, জাভেদ মিয়াঁদাদের সেই ছক্কা নিয়ে। শেষে এসেছে একটা র্যাপিড ফায়ার, যেখানে ওয়াকার ঝটপট এমন কিছু উত্তর দিয়েছেন, যা নিয়ে ক্রিকেট-আড্ডায় আরও দুই ঘণ্টা তর্ক জমানো যায়।
নব্বই দশকে পাকিস্তানের দুই মানিকজোড়। ওয়াসিম আকরাম ও ওয়াকার ইউনিস ছিলেন প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের ত্রাস। ওয়াকার বলছেন, জুটি বেঁধে বোলিং করলেও তাঁদের নিজেদের মধ্যে একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলত, ‘আমাদের দুজনেরই দল থেকে বাদ পড়ার কোনো ভয় ছিল না, আসল প্রতিযোগিতা ছিল একে অন্যের সঙ্গে। তিনি ৪ উইকেট নিলে আমি চেষ্টা করতাম ৫ উইকেট নিতে। এই সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদের দুজনকেই সেরাটা দিতে বাধ্য করত আর পাকিস্তান ক্রিকেটও এগিয়ে যেত তাতে।’
তবে ওয়াকার একটা জায়গায় হিসাব পরিষ্কার রেখেছেন। শেষ ওভারে ৬ রান বাঁচাতে হলে অধিনায়ক ওয়াকার কাকে বেছে নেবেন? প্রশ্ন শুনে বলেছেন, ‘অধিনায়ক হিসেবে আমি চোখ বন্ধ করে ওয়াসিম আকরামের ওপরই ভরসা রাখতাম।’
প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতাই, কিন্তু ভরসার জায়গায় কোনো ফাঁকি নেই।
শুভঙ্কর জানতে চেয়েছিলেন, জসপ্রীত বুমরাকে কি ‘ডানহাতি ওয়াসিম আকরাম’ বলা চলে? এই প্রশ্নে অনেক কিংবদন্তি পিছলে যান। ওয়াকার পিছলাননি, আবার পুরো ফাঁদেও পা দেননি। প্রথমে বললেন, দুই ভিন্ন যুগের বোলারদের সরাসরি তুলনা সম্ভব নয়।
তারপর এটাও বললেন, ‘টি-টুয়েন্টি ও ওয়ানডের মতো সাদা বলের ক্রিকেটে বুমরার মতো ইমপ্যাক্ট বোলার বিশ্ব ক্রিকেটে আর কেউ নেই। ভারতীয় অধিনায়ক কঠিন পরিস্থিতিতে যখনই তাঁর হাতে বল তুলে দেন, বুমরা প্রতিবারই ব্রেক থ্রু এনে দিয়ে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন।’
মানে তুলনা না করেও ওয়াকার যা বলার বলে দিয়েছেন।
১৯৮৬ সালের শারজা। শেষ বলে চার রান দরকার। বোলার চেতন শর্মা। ব্যাটসম্যান জাভেদ মিয়াঁদাদ। ওয়াকার তখন ১৪ বছরের কিশোর, থাকেন শারজাতেই। অর্থাৎ ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত ছক্কাটা তিনি দেখেছেন একদম বাড়ির উঠানের মতো দূরত্ব থেকে। ওয়াকারের ভাষ্য, ওই একটা ছক্কা পাকিস্তান ক্রিকেটের মানসিকতা রাতারাতি বদলে দিয়েছিল। বললেন, ‘শেষ বলে চার দরকার, আর ছক্কা মেরে ম্যাচ জেতা, এমন ঘটনা বিশ্ব ক্রিকেট আগে দেখেনি। শটটা পাকিস্তানে নতুন জোয়ার আর ক্রিকেটে হিরোইজমের জন্ম দিয়েছিল।’
যে শারজায় একদিন কিশোর দর্শক হয়ে ছক্কাটা দেখেছিলেন, সেই শারজার টিকিটই কয়েক বছর পর ইমরান খান ধরিয়ে দিলেন তাঁর হাতে। ইতিহাস মাঝেমধ্যে বেশ গুছিয়ে চিত্রনাট্য লেখে।
১৯৮৯ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক শচীন টেন্ডুলকারের। বয়স মাত্র ১৬। ওয়াকার ইউনিসেরও সেই টেস্টেই অভিষেক। প্রথম দেখায় টেন্ডুলকারকে শিশুর মতো মনে হয়েছিল ওয়াকারের। কিন্তু পরে শিয়ালকোটের সবুজ উইকেটে সেই ‘শিশু’ই একসময় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বয়স দিয়ে প্রতিভার বিচার হয় না। ওয়াকার স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, শিয়ালকোটের সবুজ উইকেটে বাউন্সারে নাকে লেগে রক্ত বের হওয়ার পরও সে যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৪০-৪৫ রানের ইনিংস (আসলে ৫৭) খেলেছিল, তখনই বুঝেছিলাম এই ছেলে ক্রিকেট বিশ্বের বিশেষ একজন হতে যাচ্ছে।
নিজের সময়ের সেরা ব্যাটসম্যান কে, এই প্রশ্নের উত্তরে ওয়াকার দুজনের নাম নিলেন, ব্রায়ান লারা আর শচীন টেন্ডুলকার। এ দুজনকে তিনি সেরা ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলেছেন। তবে তালিকা এখানেই থামেনি। ওয়াকার যোগ করেছেন রিকি পন্টিং, রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলী, বীরেন্দ্র শেবাগ, ভিভিএস লক্ষ্মণ, ভিভ রিচার্ডস আর ওয়াহ ব্রাদার্সের নাম।
সব স্মৃতি অবশ্য মিষ্টি নয়। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে বেঙ্গালুরুতে ভারতের বিপক্ষে ওয়াকার দারুণ বোলিং করছিলেন। ৮ ওভারে ২৭ রানে ২ উইকেট। তারপর এলেন অজয় জাদেজা। শেষ দুই ওভারে ওয়াকারকে মেরে তুলে নিলেন ৪০ রান। ওয়াকার পরে জাদেজাকে মজা করে বলেছিলেন, ‘তোমাকে যদি আমি ৮০০ বারও আউট করি, তা–ও এই ক্ষত সারবে না।’
শেষে এল সেই অংশ, যেখানে ভাবার সময় নেই। ইমরান খান নাকি কপিল দেব? ওয়াকার বললেন, ইমরান খান। নিজের অধিনায়ক, এ উত্তর নিয়ে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়।
শচীন টেন্ডুলকার নাকি ইনজামাম-উল-হক? ওয়াকারের উত্তর, শচীন টেন্ডুলকার।
বিরাট কোহলি নাকি বাবর আজম? বিরাট কোহলি।
জসপ্রীত বুমরা নাকি শাহিন আফ্রিদি? জসপ্রীত বুমরা।
শেষ প্রশ্ন, বীরেন্দর শেবাগ নাকি সাইদ আনোয়ার? ওয়াকার বললেন, সাইদ আনোয়ার। এই জায়গায় তিনি আবার পাকিস্তানের পক্ষে গেলেন।
ফলাফল, পাঁচ প্রশ্নে ভারতের পক্ষে তিন, পাকিস্তানের পক্ষে দুই। কূটনীতিক হিসেবেও ওয়াকার খারাপ করতেন না সম্ভবত!