ইউক্রেনের প্রথম বিভাগ ফুটবলে আর্জেন্টাইন ফুটবলার ছিলেন চারজন। রাশিয়ার আক্রমণের পর এর মধ্যে তিনজন কোনোরকমে ইউক্রেন থেকে বের হতে পেরেছেন। আরেকজন যুদ্ধ শুরুর আগেই ইউক্রেনের বাইরে ছিলেন কিন্তু সেই জেরোনিমো পবলেতের দুশ্চিন্তাই এখন সবচেয়ে বেশি। তিনি ইউক্রেনের বাইরে কিন্তু তাঁর স্ত্রী-সন্তান যে ইউক্রেনে আটকা পড়ে আছেন!
মরিয়া পবলেত আর কী করতে পারবেন! স্ত্রী-সন্তানকে বিভীষিকা থেকে বের করার উপায়ের খোঁজে একের পর এক দরজায় মাথা কুটে মরছেন। সিদ্ধান্তও নিয়ে রেখেছেন, শেষ পর্যন্ত দরকার হলে রাশিয়ার সেনাদের অস্ত্রের মুখে পড়ার ঝুঁকি নিয়েই নিজে ঢুকে পড়বেন ইউক্রেনে।
সপ্তাহ কয়েক আগেই ইউক্রেনের ক্লাব মেতালিস্ত খারকিভে যোগ দিয়েছিলেন পবলেত। এখনো ক্লাবের হয়ে কোনো ম্যাচও খেলা হয়নি। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে রাশিয়ার হামলায় যখন যুদ্ধের শুরু, পবলেত ক্লাবের সঙ্গে তুরস্কে প্রাক্-মৌসুম প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। তাঁর স্ত্রী আর চার ও পাঁচ বছর বয়সের দুই সন্তান তখন খারকিভেই।
কিয়েভের পর ইউক্রেনের এই খারকিভেই রুশ বাহিনী ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। শরণার্থীদের এক হোটেলেই শঙ্কায়, প্রার্থনায় দিন কাটছে পবলেতের পরিবারের।
‘আমি দলের সঙ্গে তুরস্কে আছি, ২৪ তারিখই খারকিভে ফেরার কথা ছিল আমাদের। সেদিন সকালেই ইউক্রেনে হামলা হলো, আমাদের ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেল। আমি তুরস্কে পড়ে রইলাম, আমার পরিবার খারকিভে। প্রতি মিনিটেই ওদের সঙ্গে কথা হচ্ছে, ফোন রাখতেই মন সায় দেয় না। কিছুক্ষণ ফোন না ধরলেই অস্থির হয়ে পড়ি’—গুড মর্নিং আমেরিকা অনুষ্ঠানে নিজের মনের অবস্থাটা ব্যাখ্যা করেছেন পবলেত।
দূরে থাকায় তাঁর নিজের এমন শঙ্কা আর যাঁরা পরিস্থিতিটার সম্মুখীন? পরিবারের অবস্থাও উঠে এল পবলেতের বর্ণনায়, ‘আমরা যে হোটেলে ছিলাম, ওরা এখন সেটির বেসমেন্টে আছে। কয়েক দিনের মধ্যেই আমাদের নতুন বাসায় ওঠার কথা ছিল।’
আট দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো পরিবারের জন্য হোটেলের বেসমেন্ট থেকে বের হওয়ার কোনো ব্যবস্থা করতে পারেননি পবলেত। তুরস্কে বসে এভাবে ব্যবস্থা করাও তো কঠিন! তার ওপর ইউক্রেনে এখন কোথায় কী পাওয়া যাবে, তার কিছুরই ঠিক নেই!
অস্থির অবস্থাটা পরিষ্কার হয় পবলেতের কথায়, ‘অস্থির হয়ে পড়ছি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনাই করছি শুধু, যাতে শহরটা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় বের করতে পারি, আমার পরিবারকে যাতে ইউক্রেনের পশ্চিম দিকে নিয়ে যেতে পারি পোল্যান্ড বা রোমানিয়ার দিকে। যত শিগগির সম্ভব ওদের ওই দেশ থেকে যেন বের করতে পারি!’
কিন্তু কাজটা যে মোটেও সহজ নয়! মেতালিস্ত খারকিভ ক্লাবটা থেকে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের সীমান্তের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটারের কম। রোমানিয়া-পোল্যান্ডের দিকে যেতে হলে পুরো ইউক্রেনই পাড়ি দিতে হবে পবলেতের পরিবারকে। কিন্তু একে তো সেখানে যোগাযোগব্যবস্থার ঠিক নেই, তার ওপর পথে পথে রুশ সেনাদের বুলেটের সামনে পড়ার শঙ্কা তো প্রতিমুহূর্তেই থাকছে।
অসহায় পবলেত বললেন, ‘পশ্চিমে যেতে হলে আমাদের পুরো দেশই পাড়ি দিতে হবে। তার মানে গাড়িতে করেই প্রায় ২০ ঘণ্টার রাস্তা, সেটাও নির্ভর করবে রাস্তাগুলোর অবস্থা কী, সেটির ওপর। রাস্তা ভেঙে গেছে কি না, রাস্তায় মিলিটারি আছে কি না...। সবকিছুই মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। এখনো কোনো পথ খুঁজে পাইনি।’
জানি সেখানে ঢোকা প্রায় অসম্ভব হবে। কিন্তু আমার সন্তানদের জন্য যদি এটা করতেই হয় আমাকে, আমি এটাই করবস্ত্রী-সন্তানদের উদ্ধারে আর উপায় না পেলে নিজেই খারখিভে যাওয়ার পরিকল্পনা পবলেতের
ইউক্রেনের আর্জেন্টাইন দূতাবাসে যোগাযোগ করেও তেমন সাহায্য পাননি বলে জানালেন ২৯ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন, ‘ওরা আমাকে শুধু ওখান থেকে কখন ট্রেন ছাড়তে পারে, সেই সূচিই জানাচ্ছে। আমরা ট্রেনটাতে ঠিকমতো উঠতে পারব কি না, ঠিকমতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব কি না, এ নিশ্চয়তাও দিতে পারছে না। ওরা এখন পর্যন্ত আমাদের সাহায্য করার মতো কোনো কিছুই দিতে পারেনি।’
দুই দিন আগে ইউক্রেনের আরেক ক্লাব শাখতার দোনেৎস্কের ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের একটা ট্রেনে করে ইউক্রেনের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তেমন কিছুরই খোঁজে আছেন পবলেত।
তবে এর আগপর্যন্ত তাঁর পরিবার কীভাবে আছে, সেদিকেই আপাতত নজর পবলেতের, ‘বৃহস্পতিবার, ২৪ তারিখ থেকেই ওরা বেসমেন্টে আছে, সেখান থেকে একটুও নড়েনি। ওপরে কক্ষে বা কোথাও যায় না ওরা। মাঝেমধ্যে গোলাগুলি কমে আসে, শেল-মর্টারের শব্দ তেমন একটা পাওয়া যায় না। কিন্তু গত কয়েক দিন পরিস্থিতি খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা এখন কোনো একটা সমাধানের খোঁজে আছি।’
পরিবারের সঙ্গে স্প্যানিশ অনুবাদক থাকায় একটু সুবিধাই হয়েছে পবলেতের। পরিবার কীভাবে দিন কাটাচ্ছে, সেটির বর্ণনা শুনে অবশ্য অতটা খারাপ মনে হবে না, যদি না আপনি যুদ্ধে যেকোনো সময়ে প্রাণ হারানোর শঙ্কাটা মাথায় রাখেন, ‘ওরা খাবার পাচ্ছে নিয়মিত। হোটেলে ওদের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহারও করা হচ্ছে। সব ধরনের সুবিধাই আছে। সেদিক থেকে ভাবলে ঠিকঠাকই আছে ওরা। ইন্টারনেটও আছে। এই মুহূর্তে আমরা ২৪ ঘণ্টাই যোগাযোগ রাখতে পারছি। ওদের খবর পাই না, এমন ১০টি মিনিটও যায় না।’
কিন্তু যেকোনো মুহূর্তেই সব ওলট–পালট হয়ে যাওয়ার শঙ্কাই তো পবলেতকে শান্ত থাকতে দেয় না। তুরস্কে তাঁর সতীর্থদেরও একই অবস্থা, ‘আমরা হোটেলেই আছি। অনুশীলন হচ্ছে না। কারণ, সবাই যুদ্ধের ভাবনায়ই অস্থির। ৮০ শতাংশ খেলোয়াড়েরই পরিবার ইউক্রেনে। কেউ কেউ হয়তো অন্য শহরে পরিবারকে সরিয়ে নিতে পেরেছে। আপনার পরিবার ওখানে আছে, এই দুশ্চিন্তাই তো শেষ করে দেয়।’
ওই দুশ্চিন্তা থেকেই তুরস্কে বসে থাকতে আর পারছেন না পবলেত। রোমানিয়া সীমান্তের দিকে রওনা দিয়েছেন আর্জেন্টাইন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। সেখানে গিয়েও কোনো উপায় বের করতে না পারলে? চূড়ান্ত কোনো ঝুঁকির মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন পবলেত—একটা গাড়ি নিয়ে খারকিভে রওনা দেওয়ার পরিকল্পনা তাঁর।
‘জানি সেখানে ঢোকা প্রায় অসম্ভব হবে। কিন্তু আমার সন্তানদের জন্য যদি এটা করতেই হয় আমাকে, আমি এটাই করব’—পবলেতের কথায় ফুটবলার, আর্জেন্টাইন—সব পরিচয় ছাপিয়ে এক মরিয়া বাবা আর এক স্বামীর সাহস।
যে সাহসের কাছে রুশ সেনাদের সামনে পড়া আর জীবন হারানোর শঙ্কাও পাত্তা পায় না।