
ক্লেয়াফন্টেইনের সামনের দেয়ালে কিলিয়ান এমবাপ্পের তিনটি ছবি, ফ্রান্সের জার্সি গায়ে। তিন ছবির মাঝে লেখা, “পুখ লো’আইএনএফ, মেখ্সি সে দোসানে আনুব্লিয়াবল। ” ফরাসি ভাষা থেকে অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, ‘অবিস্মরণীয় দুটি বছরের জন্য আইএনএফকে ধন্যবাদ।’ একটি ছবির এক পাশে ইংরেজিতে এমবাপ্পের নাম লেখা। অন্য পাশে তাঁর স্বাক্ষর।
আইএনএফ-ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফুটবল ইনস্টিটিউটের সংক্ষিপ্ত রূপ। যেটিকে ফুটবল-বিশ্ব আরও দুটি নামে চেনে-ক্লেয়াফন্টেইন ফুটবল সেন্টার আর ফেরনাঁ সাস্ত্রে ন্যাশনাল টেকনিক্যাল সেন্টার। দুটি বছর এই প্রতিষ্ঠানে কাটিয়েছেন ২০১৮ বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় এমবাপ্পে। এমবাপ্পের ওই কৃতজ্ঞতা প্রকাশেই বোঝা যায় এই দুই বছর তাঁর ফুটবল-জীবনে কী দিয়েছে আইএনএফ।
আইএনএফ কি শুধু এমবাপ্পের সাফল্যেই অবদান রেখেছে? প্লাতিনি-টিগানাদের অবসরের পর হঠাৎই ম্লান হয়ে যাওয়া ফ্রান্স যে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াল, দেশটির ফুটবলের খোলনলচে বদলে গেল; তা ওই আইএনএফের কল্যাণেই। প্লাতিনি-পরবর্তী যুগে ফ্রান্সের দুটি বিশ্বকাপ আর একটি ইউরো জয়েও আছে আইএনএফের অবদান।
থিয়েরি অঁরি, নিকোলাস আনেলকা, লুইস সাহা, উইলিয়াম গালাস থেকে শুরু করে অলিভিয়ের জিরু, এমবাপ্পেদের মতো খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে আইএনএফ। শুধু কি খেলোয়াড় দেওয়াই? যেসব খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে, তাদের ফুটবল-দর্শনটাও বদলে দিয়েছে। জয়ের তীব্র মানসিকতার বীজ বুনে দিয়েছে তাদের মনে। এরই ফসল এখন ঘরে তুলছে ফ্রান্স। কে জানে, সামনের দিনগুলোয় হয়তো আরও উঁচুতে উঠবে ফ্রান্সের ফুটবল।
ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশনের (এফএফএফ) সাবেক সভাপতি ফেরনাঁ সাস্ত্রের মাথা থেকে প্রথম এসেছিল এমন একটি একাডেমি গড়ার ভাবনা। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এফএফএফের সভাপতি ছিলেন তিনি। তবে একাডেমির গড়ে তোলার কাজ শুরু হয় তাঁর বিদায়ের পরের বছর। তিন বছরে অবকাঠামোর কাজ শেষ করে ১৯৮৮ সালে শুরু হয় ছাত্র ভর্তি। ভবিষ্যতের ফ্রান্স দল গড়ার লক্ষ্যে একাডেমিতে শুধু ১৩ থেকে ১৫ বছরের ফুটবলারদেরই নেওয়া হয়।
কয়লা থেকে হীরা সংগ্রহের কাজটা করা হয় খুব যত্নের সঙ্গে। ভবিষ্যতের তারকা তৈরির ক্ষেত্রে এখানে অনুসরণ করা হয় কিংবদন্তি রোমানিয়ান কোচ স্তেফান কোভাকসের পদ্ধতি। অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে এখানকার কোচরা বেশি মনোযোগ দেন একজন খেলোয়াড়ের অলরাউন্ড টেকনিক, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার উন্নতির দিকে। আইএনএফে ছাত্ররা অনুশীলন করে রোববার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত। শনিবার যে যার ক্লাবের হয়ে ম্যাচ খেলতে চলে যায়।
আইএনএফে বয়সভিত্তিক সব দলকেই খেলানো হয় ৪-৩-৩ ছকে। এই ছকটা সবচেয়ে নমনীয় আর এতে বেশি জায়গা পাওয়া যায় বলেই বিশ্বাস এফএফএফের। একাডেমিতে ভর্তি হওয়া ফুটবলারদের প্রথম বছরটা কাটে বল পায়ে কতটা ভালো করা যায় সেই অনুশীলন করে। এই সময়টাতে ব্যক্তিগত উন্নতির দিকেই বেশি খেয়াল রাখা হয়। দ্বিতীয় বছরে তাদের দেওয়া হয় খেলা গড়ে তোলা আর সচেতনতার দীক্ষা। ব্যক্তিগত উন্নতির পরীক্ষায় পাস করলে প্রমাণ সাইজের ফুটবল মাঠে খেলার সুযোগ পায় তারা। তবে এটা অবশ্যই ১৬ পেরোনোর আগে।
শুধু ফুটবলার হিসেবে বেড়ে উঠলেই হবে না। পাস করতে হবে মানসিক উন্নতির পরীক্ষায়ও। সম্প্রতি আবার একাডেমিক বিষয়গুলোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। এখানে প্রতিটি খেলোয়াড়ের মনে জয়ের তীব্র ইচ্ছা যেমন বুনে দেওয়া হয়, তেমনি দীক্ষা দেওয়া হয় উদ্ধত না হওয়ার। যার মানে একটাই দাঁড়ায়-নিজের খেলায় উদ্ধত হও, আচরণে নয়!
সব মিলিয়ে ফ্রান্সে তৈরি হচ্ছে অন্য রকম একটা ফুটবল প্রজন্ম। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হয়তো এমবাপ্পেই। মাঠে তাঁর খেলাকে উদ্ধতই বলতে পারেন। কাউকে পাত্তা দিতে জানেন না! আর আচরণের দিক থেকে যেন ঠিক ততটাই বিনয়ী পিএসজির এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। শুধু এমবাপ্পে কেন জিরু, ব্লেইস মাতুইদি, এনগোলো কান্তে-এঁরাও তো তা-ই। রাশিয়া বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলের এই চার সদস্যই যে এসেছেন আইএনএফ থেকে।