
>তিন দশক পর আবারও লিগ শিরোপার স্বাদ পেল লিভারপুল। গত তিরিশ বছর ধরে হাজারো চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আবারও ইংলিশ ফুটবলের রাজা 'অল রেড'রা। কেমন ছিল দীর্ঘ তিরিশ বছরের এই যাত্রা? সেটিই জানানোর চেষ্টা করা হয়েছে তিন পর্বের এই ধারাবাহিকে। আজ পড়ুন প্রথম পর্ব
এত আনন্দের মধ্যেও রনি রোজেনদালের মনটা একটু খচখচ করছে।
মার্চের প্রথম দিনে বেলজিয়ান ক্লাব স্ট্যান্ডার্ড লিয়েগে থেকে ধারে লিভারপুলে নাম লিখিয়েছিলেন এই ইসরায়েলি স্ট্রাইকার। কোচ কেনি ডালগ্লিশের হাতে যে স্ট্রাইকার ছিল না, তা নয়। কেনি ডালগ্লিশ নিজেই তখন খেলোয়াড়-ম্যানেজারের ভূমিকায়। আক্রমণভাগে তাঁর সঙ্গী ছিলেন ইয়ান রাশ, জন অলড্রিজ, পিটার বেয়ার্ডসলি। তাও স্কটিশ এই কিংবদন্তির মনে হলো, শিরোপা লড়াইয়ে অ্যাস্টন ভিলাকে হারানোর জন্য আক্রমণভাগে বাড়তি শক্তির প্রয়োজন।
যেই ভাবা, সেই কাজ। রোজেনদাল নিজেও কস্মিনকালে ভাবেননি লিভারপুলের কথা। লুটন টাউন বা হিবারনিয়ানের মতো ক্লাবে ট্রায়াল দেওয়া এই তারকা তাই হুট করে নিজেকে আবিষ্কার করলেন পরাশক্তি লিভারপুলের ড্রেসিংরুমে।
হ্যাঁ, লিভারপুল তখন পরাশক্তিই ছিল। যখনকার কথা বলছি, তখন ১৯৯০ সাল। ইংল্যান্ডের শীর্ষ বিভাগে নিজেদের আঠারতম লিগ শিরোপার সুবাস পাচ্ছে লিভারপুল। লিগে তাঁদের চেয়ে সফল দল আর কেউ নেই। গত আঠার মৌসুমে এগারোটা শিরোপা জিতে নিয়েছে।
দলে এসে নিজের গুরুত্ব বোঝাতে সময় নিলেন না রোজেনদাল। লিগে আট ম্যাচে সাত গোল করলেন। চার্লটন অ্যাথলেটিকের বিরুদ্ধে একটা হ্যাটট্রিকও ছিল এর মধ্যে। কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সের বিরুদ্ধে জেতার পর লিভারপুলের শিরোপা যখন নিশ্চিত হয়ে গেল, দেখা গেল, লিগজয়ীর মেডেল পাওয়ার জন্য যে ন্যূনতম যোগ্যতা থাকা লাগে, সেই দশ ম্যাচ খেলা হয়নি রোজেনদালের। ফলে লিগ শিরোপা নিয়ে উল্লাস করলেও, যেখানে সতীর্থ রাশ-বার্নস-অলড্রিজরা ব্যক্তিগত স্মারক পাচ্ছিলেন, তা জোটেনি রোজেনদালের কপালে।
আনন্দের মধ্যেও রোজেনদালের খচখচানিটা এ কারণেই। 'থাক, সামনেরবার আবার জিতব, তখন না হয় একটা মেডেল পাব,' নিজেকে হয়ত সেদিন এই বলে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এই ইসরায়েলি স্ট্রাইকার। তখন যদি ঘুণাক্ষরেও জানতেন, যে আগামী সাফল্য আসতে আসতে তিরিশ বছর লাগবে!
আগের মৌসুমেই একদম শেষ দিনে আর্সেনালের কাছে শিরোপা খুইয়েছিল লিভারপুল। সে ধাক্কা সামলে ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে শিরোপা পুনরুদ্ধার করতে পারলেও দলের খেলোয়াড়-ম্যানেজার কেনি ডালগ্লিশ চাপটা নিতে পারছিলেন না আর।
কীসের চাপ? ১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিল নটিংহ্যাম ফরেস্টের বিপক্ষে এফএ কাপের সেমিফাইনালে খেলতে নেমেছিল লিভারপুল। হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে ৯৬ জন লিভারপুল সমর্থক মারা যান। শেফিল্ডের হিলসবরো স্টেডিয়ামের এ ঘটনা 'হিলসবরো ট্রাজেডি' নামে শোকের এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে লিভারপুলের ইতিহাসে। সে শোক তখনো ঠিকভাবে কাটিয়ে উঠতে পারেননি ডালগ্লিশ সহ লিভারপুলের অভিজ্ঞ অনেক তারকা। সঙ্গে লিভারপুলের মতো একটা দলের কোচ ও খেলোয়াড় হওয়ার প্রতিনিয়ত ভালো করার চাপ একটা ছিলই। প্রত্যাশার এই চাপ নিতে পারছিলেন না ডালগ্লিশ। হুট করে অবসর নিয়ে নিলেন। জানালেন, 'হয় আমার চাকরি থাকবে, নয় মানসিক সুস্থতা!'
লিভারপুল তাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে মানসিক রোগী হিসেবে দেখতে চায়নি।
দলের অধিকাংশ তারকার বয়স তিরিশের ওপারে। গোটা দলের খোলনলচে বদলাতে হবে যেকোনো সময়ে, অন্যান্য দলের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য। এমন অবস্থায় ডালগ্লিশ সরে দাঁড়ানোয় একটু ঝামেলাতেই পড়ল লিভারপুল। এ ছাড়াও, ইংল্যান্ডের ফুটবল তখন আস্তে আস্তে নতুন যুগে প্রবেশ করেত যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, আর কয়েক বছরের মধ্যেই ইংল্যান্ডের লিগ ফুটবলের চেহারা বদলে যাবে। হাজারো পৃষ্ঠপোষকের নজর পড়েছে লিগটায়। প্রথম বিভাগের নাম বদলে প্রিমিয়ার লিগ হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। সব মিলিয়ে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। এমন অবস্থায় লিভারপুলের কর্তাব্যক্তিদের মাথায় বাড়তি চিন্তা। কে হবেন নতুন কোচ?
ডালগ্লিশ যেমন খেলোয়াড়-ম্যানেজার ছিলেন, ওভাবে দলের আরেকজন খেলোয়াড়কে ম্যানেজার করতে চাইল লিভারপুল। অধিনায়ক অ্যালান হানসেন। কিন্তু শেষমেশ সে পরিকল্পনাও আলোর মুখ দেখল না। কোচ যাওয়ার পাশাপাশি অবসর নিয়ে নিলেন হানসেনও। দলে আসলেন গ্রায়েম সুনেস। সত্তর ও আশির দশকে অর্ধযুগ লিভারপুলে কাটানো এই মারকুটে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার খেলোয়াড় হিসেবে ছিলেন চূড়ান্ত সফল। লিভারপুলের অধিনায়ক ছিলেন। লিগ জিতেছেন পাঁচবার। তিনবার করে এফএ কাপ ও লিগ কাপ জেতা এই খেলোয়াড় তৎকালীন ইউরোপীয়ান কাপও জিতেছেন তিনবার (এখনকার চ্যাম্পিয়নস লিগ)। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে নিজ দেশের ক্লাব রেঞ্জার্সের কোচ হয়েও জাত চিনিয়েছেন। তিনবার লিগ জয়ের পাশাপাশি কাপ জিতেছেন পাঁচবার।
এমন কোচকেই তো চাই!
রেঞ্জার্সের দায়িত্ব ছেড়ে সুনেস যেদিন লিভারপুলের কোচ হলেন, রেঞ্জার্সের সভাপতি ডেভিড এডওয়ার্ড মারের কণ্ঠে শোনা গেল শঙ্কার কথা, 'ও জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করতে চলেছে!'
মারে কী ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন?
দলে এসেই রাতারাতি সব কিছু পরিবর্তন করে ফেলতে চাইলেন সুনেস। খেলোয়াড়ি জীবনে একটু 'ঘাড়ত্যাড়া', একটু 'মারদাঙ্গা' ছিলেন, কোচ হিসেবেও সে 'সুনাম' বজায় রাখতে চাইলেন। খেলোয়াড়ি জীবনে দুবছর ইতালির লিগে খেলে এসেছিলেন, সাম্পদোরিয়ার হয়ে। সেখানে দেখে এসেছেন দলের খেলোয়াড়দের খাদ্যাভ্যাস, সঠিক জীবনযাপনের ওপর কী পরিমাণ জোর দেয় ইতালির ক্লাবগুলো। লিভারপুলেও তেমনটা করতে চাইলেন। খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেন প্রথম থেকেই। আরও বেশি পেশাদারিত্বের বেড়াজালে বাঁধতে চাইলেন দলকে।
কিছু কাজ করাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছিলেন লিভারপুল খেলোয়াড়েরা। নিয়মিত অস্বাস্থ্যকর ভাজাপোড়া খেতেন। ম্যাচ খেলতে নামার আগে বিয়ার, চিপস, মাংসের স্টেক খাওয়া অবধারিত ছিল। সুনেস আসার পর সেসব খাদ্যাভ্যাস বাতিল হয়ে গেল।
দলে তখনও খেলোয়াড় হিসেবে ছিলেন ইয়ান রাশ, ব্রুস গ্রবেলার, স্টিভ নিকোল, রনি হুইলানের মতো তারকারা। যারা কয়েক বছর আগেও সুনেসের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলেছেন লিভারপুলের হয়ে। সাবেক সতীর্থের এমন দাদাগিরি মানবেন কেন তাঁরা? শুরু হল ব্যক্তিত্বের সংঘাত। যে খেলোয়াড় কয়েকদিন আগেও তাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে শ্যাম্পেন খেতেন, রাশ-নিকোলরা যার ডাকনাম আদর করে দিয়েছিলেন 'শ্যাম্পেইন চার্লি'–তাঁর এহেন পরিবর্তন কীভাবে মেনে নেওয়া যায়? 'আমরা তো বিয়ার-চিপস খেয়েই ডাবল জিতেছি!'–রাশ-নিকোলদের মনোভাব ছিল অনেকটা এমন।
এখানে বলে রাখা ভালো, রাশরা হয়তো জানতেন না, কয়েক বছর পর একই কাজ করে আর্সেনালকে সফলতার মুখ দেখাবেন আনকোরা তরুণ ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গার। পার্থক্য হলো, ওয়েঙ্গার যখন দলে এসব পরিবর্তন এনেছিলেন, পাশে পেয়েছিলেন অধিনায়ক টনি অ্যাডামসকে। সুনেস সেই সমর্থন পাননি নিজের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের কাছ থেকে।
আগে সকালবেলা লিভারপুলের অনুশীলন মাঠ মেলউডে অনুশীলন করতে যাওয়ার আগে অ্যানফিল্ডে যেতেন খেলোয়াড়েরা। সেখানে গিয়ে অনুশীলনের জন্য প্রস্তুত হয়ে আবার একসঙ্গে মেলউডে যেতেন। ফেরার সময়েও তাই। অনুশীলন শেষ করে নোংরা জামাকাপড় পরিবর্তন না করে বাসে চেপে আগে অ্যানফিল্ডে যেতেন, সেখানে সবাই একসঙ্গে কাপড় পরিবর্তন করে যে যার বাসায় চলে যেতেন। সুনেসের কাছে এই অভ্যাসটা কার্যকরী মনে হল না। অনুশীলন করার আগে অ্যানফিল্ডে গিয়ে আড্ডাবাজি করে সময় কাটানোর কী দরকার? নিয়ম জারি করলেন, বাসা থেকে সরাসরি অনুশীলনে আসবে খেলোয়াড়েরা, সেখান থেকে সরাসরি আবার বাসায় ফিরবে। খেলোয়াড়দের মনে হল, নতুন এই নিয়মে নিজেদের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক গঠন করার গুরুত্বপূর্ণ সময়টা পাওয়া যাবে না। ফলে আবারও খলনায়ক হলেন সুনেস।
বয়সী খেলোয়াড়দের বদলে নতুন খেলোয়াড়দের আনতে গিয়েও ঝামেলা পাকালেন সুনেস। নতুন খেলোয়াড়দের অনেক বেশি বেতন দিয়ে আনা হল। মাইকেল থমাস, ডিন সন্ডার্স, মার্ক রাইট ও মার্ক ওয়াল্টার্সের মতো নতুন খেলোয়াড়েরা ইয়ান রাশদের থেকে বেশি বেতন পাওয়া শুরু করলেন। ব্যাপারটা লিভারপুলের পোড় খাওয়া যোদ্ধাদের কাছে ভালো ঠেকল না। নতুন খেলোয়াড় কিনতে গিয়েও প্রচুর আজেবাজে খরচ করলেন সুনেস। এমন এমন সব খেলোয়াড়দের কিনলেন, যারা একদমই মানসম্মত নন।
পর্দার আড়ালের এসব অসন্তুষ্টি প্রতিফলিত হল মাঠের পারফরম্যান্সেও। সুনেস যে চার বছর লিভারপুলে ছিলেন, লিগ জেতা তো দূর, লিভারপুল মৌসুম শেষ করলো যথাক্রমে দ্বিতীয়, ষষ্ঠ, ষষ্ঠ ও অষ্টম স্থানে থেকে। আস্তে আস্তে পরিবর্তন না এনে নিজের একনায়কসুলভ মানসিকতায় হুট করে সবকিছু বদলে ফেলতে চাওয়ার খেসারত দিলেন সুনেস। ছাঁটাই হলেন কোচের পদ থেকে।
রয় এভান্স বুঝেছিলেন, এই স্কোয়াডের সঙ্গে সুনেসের মতো একনায়কোচিত মনোভাব দেখালে টেকা যাবে না। লিভারপুলের নতুন কোচ তাই খেলোয়াড়দের বন্ধু হতে চাইলেন। তবে সুনেস যেমন আধুনিক কোচ ছিলেন, আধুনিক নিয়মকানুন অনুসরণ করার জন্য চাপ দিতেন খেলোয়াড়দের, এভান্স তেমন ছিলেন না। লিভারপুলের ঘরের ছেলে হওয়ার কারণে লিভারপুলের আগের দলগুলো কীভাবে বিশ্বজয়ী হয়েছে, সেটা জানতেন। সেভাবেই নিজের দলকে গড়তে চাইলেন।
লিভারপুলের খেলায় আবার সেই হারানো ছন্দ ফিরে এল। অভিজ্ঞ রাশ-বার্নসদের সঙ্গে আনকোরা জেমি রেডন্যাপ, রবি ফাওলার, স্টিভ ম্যাকম্যানামানদের সমন্বয়ে গড়ে তুললেন এক কার্যকরী দল। সুনেস-আমলের ব্যর্থ খেলোয়াড়দের আস্তে আস্তে দল থেকে বিদেয় করলেন, নিজের পছন্দের খেলোয়াড় কিনে কিনে দল সাজাতে থাকলেন। লিগ টেবিলে দলে অবস্থান আট-সাত থেকে উন্নত হয়ে তিন-চারে এল।
তবে দুটো দৃষ্টিগ্রাহ্য ব্যর্থতার কারণে এভান্সও লিভারপুলকে প্রত্যাশিত সাফল্য এনে দিতে পারলেন না। এক, আক্রমণভাগ ও মিডফিল্ড মোটামুটি ভালো খেললেও, রক্ষণভাগ অতটা ভালো ছিল না। ডিফেন্ডাররা ভালো হলেও, লিগ জেতার সামর্থ্য ছিল না তাঁদের। দুই, কোচের শাসন না থাকার কারণে এভান্সকে একদম পেয়ে বসেছিলেন লিভারপুল তারকারা। নিল রুডক-ডমিনিক মাতেওর মতো খেলোয়াড়েরা সারাদিন পানশালায় পড়ে থাকতেন। সারারাত সুরাপান করে পরদিন সকাল দশটায় ঘুমোতে যেতেন, এমনটাও শোনা গেছিল। খাদ্যাভ্যাসের কোনো বালাই ছিল না। খেলোয়াড়দের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও কোচের মাথাব্যথা ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন, পেশাদার খেলোয়াড় যেহেতু সবাই, তাঁরাই নিজেদের খেয়াল রাখতে পারবে ভালো। এমনটাই তো হয়ে এসেছে এতকাল!
তা দেখে হতাশ হয়ে পড়েন দলে নতুন আসা স্ট্রাইকার স্ট্যান কলিমোর। পঁচাশি লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে লিভারপুলে আসা কলিমোর তখন দলের সবচেয়ে দামী তারকা। কলিমোরের মনে হল, এত টাকা দিয়ে দলে আনার পরেও তাঁকে নিয়ে কোচের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই। কলিমোর ভেবেই কূল পেলেন না, যার পেছনে এত টাকা খরচ করা হল, তাঁর জন্য কোচের পরিকল্পনা না থাকে কী করে!
খেলা বাদ দিয়ে অন্য সব কিছুতে মনোযোগ ছিল তাঁদের। গোলরক্ষক ডেভিড জেমসের কথাই ধরুন, অনুশীলন বাদ দিয়ে ইতালিতে চলে গিয়েছিলেন বিখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ড আরমানির জন্য শুটিং করতে। জেমসের ভুলের কারণে হেরে যাওয়া একটা ম্যাচের পর জানা গেল, ম্যাচের আগে সারারাত কম্পিউটার গেমস খেলেছেন এই গোলরক্ষক। জেমসের ভুল করার প্রবণতা এতটাই বেশি ছিল, তাঁকে 'ক্যালামিটি (বিপর্যয়) জেমস' বলে ডাকা শুরু করলেন সমর্থকেরা।
একদিন দেখা গেল, অনুশীলনে কোচ এভান্সের ঘাড় চেপে ধরে মশকরা করছেন ফাওলার। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ম্যানেজার স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের সঙ্গে তাঁর কোনো খেলোয়াড় এমন ইয়ার-দোস্তের মতো আচরণ করছেন, এমনটা শুনেছেন কোথাও?
শুধু জেমসই নন, ফুটবলারদের আলো-ঝলমলে জীবনযাপন দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল তরুণ ফাওলার-রেডন্যাপদের। 'পেজ থ্রি' এর মডেলদের সঙ্গে মডেলিং করা শুরু করলেন। ১৯৯৬ এফএ কাপের ফাইনালের আগে লিভারপুলের গোটা দল আরমানির ঘিয়া রঙের স্যুট পরে হলিউড তারকাদের মতো পোজ দিলেন। তা নিয়ে সমালোচনাও হল এন্তার। সেই ম্যাচে আবার জেমসের ভুলেই গোল করলেন এরিক ক্যান্টোনা। শিরোপা জিতে নিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ফলে স্যুটের ঘটনা নিয়ে হাসাহাসি আরও বাড়ল। এসব ঘটনার জন্য লিভারপুলের তারকারা পরিচিতি পেলেন 'স্পাইস বয়েজ' হিসেবে।
তবে এটাও সত্যি কথা, দামের কারণে অনেক পছন্দের খেলোয়াড়কেই দলে আনতে পারেননি এভান্স। এদের মধ্যে রয়েছেন পিএসভি আইন্দহোভেনের উঠতি ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার রোনালদো, ফিওরেন্টিনার তারকা আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও নটিংহামের স্ট্রাইকার টেডি শেরিংহ্যাম। এই শেরিংহ্যামই পরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে 'ট্রেবল' জেতেন।
ক্লাবের কর্তাব্যক্তিরা বুঝলেন, এতো ঢিলেঢালা কোচ দিয়ে চলছে না। প্রিমিয়ার লিগেও ততদিনে বিদেশী কোচ ও খেলোয়াড়দের প্রভাব পড়া শুরু হয়েছিল। আর্সেনালের কোচ হিসেবে এসেছিলেন ওয়েঙ্গার। চেলসি কোচ করে এনেছিল ডাচ তারকা রুড খুলিতকে।
আর্সেনালে ওয়েঙ্গারের প্রভাব দেখে দেখাদেখি লিভারপুলেরও সাধ হল ফরাসি কোচ রাখার। দলে এলেন জেরার্ড হুলিয়ের।
জেরার্ড হুলিয়েরকে নিয়োগ দিতে গিয়েও আরেকটা হাস্যকর ভুল করল লিভারপুল। খেলোয়াড়, কোচ ও পরে ম্যানেজার হিসেবে দলে তিরিশ বছর কাটানো সদাহাস্য রয় এভান্সকে মুখের ওপরে ছাঁটাই করার সাহস হয়নি সভাপতি ডেভিড মুরসের। ফলে জেরার্ড হুলিয়েরকে আনা হল যৌথ ম্যানেজার হওয়ার শর্তে।
ফলে যা হওয়ার তাই হল। খেলোয়াড়েরা বুঝে উঠতে পারলেন না, কার কথা শুনবেন। কৌশলগত দিক দিয়েও দুজনের পার্থক্য ছিল অনেক। পরে আস্তে আস্তে এভান্স নিজেই বুঝতে পারলেন, তাঁর সরে দাঁড়ানো উচিৎ। 'ভূত হয়ে দলের ওপর চেপে থাকতে চাই না,' অশ্রুসজল এভান্স বিদায় নিলেন এই বলে।
প্রথম দশকের শেষ এক বছর লিভারপুল কাটালো হুলিয়েরের ওপর ভর করে। দলে উন্নতির ছাপ দেখা গেলেও, লিগ জয়ের মতো শক্তি ছিল না দলটার। ওদিকে 'ট্রেবল' জিতে নতুন শতকে পা রাখল 'চিরশত্রু' ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।
লিগহীন প্রথম দশকে লিভারপুলের ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ হল যেন তাতে!
(চলবে)