
>সাফ ফুটবল খেলতে এসে বাংলাদেশের ফুটবলার হেমন্ত ভিনসেন্ট বিশ্বাসের খোঁজ করছেন নেপালের তারকা স্ট্রাইকার বিমল গাত্রি মাগার
‘হেমন্ত কোথায়?’
শেখ জামাল ধানমন্ডি মাঠে প্রথম দর্শনেই দূর থেকে প্রতিবেদকের উদ্দেশে প্রশ্নটি ছুড়ে দিলেন নেপালের বিমল গাত্রি মারগা। নেপালের তারকা এই স্ট্রাইকার সাফ ফুটবলে খেলতে এখন ঢাকায়। হোটেল লবি, অনুশীলন বা খেলার মাঠে পূর্বপরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলেই খুঁজছেন তাঁর ‘হারানো’ বাংলাদেশি বন্ধু হেমন্তকে। প্রতিবেদকের সঙ্গে পূর্বপরিচয় থাকায় প্রশ্নটা বদলাল না।
বাংলাদেশের অন্ধকার ফুটবলের গলিতে হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে এক তরুণের আগমন। যেমন তাঁর প্রতিভা, তেমন তাঁর শারীরিক যোগ্যতা। যেকোনো ফুটবল কোচেরই প্রথম দর্শনে তাঁর ফুটবলীয় সৌন্দর্যে প্রেমে পড়ে যাওয়ার কথা। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের তৎকালীন ডাচ কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ ও তাঁর সহকারী রেনে কোস্টার তো তাঁর প্রতিভায় হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাঁকে যে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন ক্রুইফ-রেনে জুটি, সেটা একজন ফুটবলারের জন্য স্ট্যান্ড (জিপিএ-ফাইভ পূর্ববর্তী যুগের সর্বোচ্চ খেতাব) করার নম্বরপত্রের মতো মূল্যবান। খুব বেশি দিন আগের নয়, এই তো ২০১৩ সালের কথা।
হেমন্তর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে নেদারল্যান্ডসের ক্লাব এফসি টোয়েন্টির যুবদলের ট্রায়ালে সুযোগ করে দিয়েছিলেন রেনে। বাংলাদেশের সহকারী এই কোচের মাধ্যমে সে ট্রায়ালে ছিলেন বিমলও। সেখানে একই বাসায় থাকার সুবাদে বন্ধুত্ব হয় দক্ষিণ এশিয়ার দুই উঠতি প্রতিভাবান ফুটবলারের। সেখান থেকে বিমলের শুধু এগিয়েই যাওয়া। তাঁর বাংলাদেশি বন্ধু হেমন্তও এগিয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখিয়েছিলেন কয়েক বছর। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় পেছাতে পেছাতে একেবারেই হারিয়ে গেছেন। না হলে কি আর মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করে বন্ধু হেমন্তকে খুঁজে নিতে হয় বিমলকে।
কিন্তু হেমন্তর খোঁজ কে দিতে পারবেন? তাঁকে যে নিখোঁজ সংবাদের বিজ্ঞপ্তি দিয়েও খুঁজে পাওয়া কঠিন। ২০১৪ সালে ভারতের বিপক্ষে তারুণ্যের জয় উপহার দিয়ে অভিষিক্ত হওয়া তরুণকে পূর্বের পারফরম্যান্সের বিচারে এবার সাফের প্রাথমিক দলের তালিকায় জায়গা দেওয়া হলেও চোটের জন্য আগেই দল ছেড়েছেন হেমন্ত। বর্তমান জাতীয় দলে তো নেই-ই, শেষ কবে খেলেছিলেন সেটা জানার জন্য ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটির জোগাড়।
বাংলাদেশের জার্সিতে ভুটানের বিপক্ষে ৩-১ গোলের হেরে যাওয়া ম্যাচে শেষ খেলা হেমন্তকে এবার সাফের দলে না দেখতে পেয়ে হতাশা প্রকাশ করলেন বিমল, ‘এশিয়ান গেমসেও হেমন্তকে দেখলাম না। অবাক ব্যাপার সাফেও নেই। ওর পারফরম্যান্স কি এতটাই খারাপ এখন?’
অথচ চার বছর আগে ভারতের বিপক্ষে ১০ নম্বর জার্সিতে অভিষিক্ত হেমন্তর পারফরম্যান্স এখনো চোখে লেগে থাকার কথা। ২-২ গোলে ড্র হওয়া আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে কোনো গোল করেননি। কিন্তু দুটি গোলের উৎসই সেদিনের নম্বর টেন। প্রথম গোলে ডি বক্সে ডামি দিয়ে গোলমুখ খুলে দিয়েছিলেন মিঠুন চৌধুরীকে। দ্বিতীয়টি তাঁর বুলেট গতির দুর্দান্ত ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে পোস্ট ঢুকিয়ে দেন ভারতীয় ডিফেন্ডার অর্ণব মণ্ডল।
২০১৬ সালের বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপেও গ্রুপ পর্বের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গোল করে শিরোনামে এসেছিলেন। কিন্তু এরপর থেকে হেমন্ত শিরোনামে আসা মানেই হয় চোট না হয় নেতিবাচক কোনো খবর।
ঢাকা এসে বন্ধু বিমল তাঁকে খুঁজছেন, খবরটা জানানোর জন্যই হেমন্তকে ফোন দেওয়া। উঠে আসল তাঁর বর্তমান দূরবস্থাও, ‘দিনাজপুরে বাড়িতে বসে বাংলাদেশ-ভুটানের খেলা দেখলাম। বাংলাদেশ জেতায় বাড়িতে সবাই খুব আনন্দ করেছি। কিন্তু মা-বাবা বলছে তুই থাকলে আমরা কত গর্ব করতে পারতাম। তাঁদের মুখে কথাটা শুনে আমার খুবই খারাপ লেগেছে।’
ওদিকে তাঁর বন্ধু বিমল এফসি টোয়েন্টির পর নাম লিখিয়েছিলেন ইউরোপিয়ান কাপে খেলা বেলজিয়ামের আন্ডারলেখট যুবদলেও। গত মৌসুমে খেলেছেন ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী ক্লাব মোহনবাগানে। জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্য হয়ে গেছেন এরই মাঝে। বাড়িতে বসে হেমন্ত যেখানে টিভিতে বাংলাদেশের খেলা দেখে হাপিত্যেশ করছেন, বিমল তখন উড়ছেন। হেমন্ত কি টের পাচ্ছেন সেটা? প্রতিভা বিকাশের দায়টা অন্তত নিজের কাছেই মেটানোর তাগিদ কি ফিরে পাচ্ছেন?
পেলেই ভালো, শুধু হেমন্ত নন, বাংলাদেশের ফুটবলেরও তবে উপকার হয়!