
>আজ নীলফামারীতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। ম্যাচে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যেও চলবে অদৃশ্য এক লড়াই। কারণ, এই ম্যাচ থেকেই সাফের জন্য ১০ জন ফুটবলার বেছে নেবেন বাংলাদেশ কোচ জেমি ডে। বাকি ১০ জন চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে সদ্য সমাপ্ত এশিয়ান গেমস থেকেই।
‘জেমি, কালকের (আজ) ম্যাচের পরিকল্পনা কী?’
ম্যাচপূর্ব যেকোনো সংবাদ সম্মেলনে খুবই সাধারণ একটা প্রশ্ন এটি। উত্তরগুলোও সাধারণই হয়। গৎবাঁধা, তোতাপাখির বুলির মতো। বাংলাদেশ কোচ জেমি ডেও তেমন কিছুই বলবেন, সেটাও ‘ধরে নেওয়া’ ছিল। তার ওপর পরদিন, অর্থাৎ আজ নীলফামারীর শেখ কামাল স্টেডিয়ামে বিকেল চারটায় শুরু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটা যখন সাফের প্রস্তুতি। আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের স্বীকৃতি অবশ্য সেটির গুরুত্ব একটু বাড়িয়ে দিয়েছে।
সাফ টুর্নামেন্ট শুরু হতে বাকি আর পাঁচ দিন। কাল রংপুরে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ দল, অনুশীলনও করেছে রংপুর স্টেডিয়ামেই। দলের মনোযোগ পরদিন নীলফামারীর ম্যাচে, কিন্তু চোখ তো ঢাকাতেই। সাফে। এমন একটা প্রস্তুতি ম্যাচের পরিকল্পনা মানে তো খেলোয়াড়দের শেষ একবার দেখে নেওয়া, সাফের জন্য আরেকটু ঝালিয়ে নেওয়া...।
কিন্তু জেমি ডের উত্তরে আত্মবিশ্বাসের ছাপ। এক শব্দে উত্তর শুরু—‘জয়’। পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য—সব এটিই। কিছুক্ষণ থেমে তারপর অবশ্য আসল উদ্দেশ্যটা জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের ইংলিশ কোচ। কী সেটি? সিনিয়রদের জন্য এই ম্যাচ সাফের দলে জায়গা নেওয়ার শেষ সুযোগ। তা অবশ্য না বললেও চলত। সাফের আগে তো আর ম্যাচই নেই। জাকার্তা এশিয়ান গেমসে ১০ দিনে চারটি ম্যাচের প্রতিটিতেই প্রায় ৯০ মিনিট খেলা তরুণেরা যে এই ম্যাচে থাকছেন না, সেটি আগেই জানা ছিল। এই ম্যাচটি অন্যদের সুযোগ। জেমি ডে তাই বলেই দিলেন, সাফের দলে ১০ জন ঠিক হয়েই গেছে। এখন বাকি ১০টি জায়গা খালি আছে। কালকের (আজ) ম্যাচ সে ১০টি জায়গা নিজের করে নেওয়ার সুযোগ।
সেটি যে শুধু কথার কথা নয়, তা বোঝা গেল দুই ঘণ্টার অনুশীলন সেশন শেষে জড়ো হওয়া দলের প্রতি কোচের বক্তৃতায়। পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের তেজের ঘাটতি যেন পূরণ হলো জেমি ডের কণ্ঠে। একটু দূর থেকেই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল, ‘...যদি তোমরা একাদশে সুযোগ পাও, তাহলে আমাকে দেখাও যে তোমরা সাফের দলেও জায়গা পাওয়ার যোগ্য। কেউ বদলি হিসেবে নামলে আমাকে দেখাও যে একাদশে জায়গা তোমার প্রাপ্য।’
হঠাৎ সিনিয়রদের এমন ‘বাঁচামরা’র সুযোগের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের তরুণ দলটার পারফরম্যান্স। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ উঠেছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। হারিয়েছে র্যাঙ্কিংয়ে প্রায় ১০০ ধাপ এগিয়ে থাকা কাতারের মতো দলকে, যেটি অনেকের চোখেই বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য। ড্র করেছে থাইল্যান্ডের সঙ্গেও। ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে এই সাফল্য, ফুলিয়ে দিয়েছে সাফ নিয়ে আশার বেলুনও। ২০০৩ সালে শিরোপা জেতার পর তো সাফ বাংলাদেশের জন্য হয়ে আছে দুঃস্বপ্নের নাম। এবার আশা, যদি কিছু হয়!
সেই সাফের দলে জায়গা পাওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা, সেটি জানিয়ে গেলেন সংবাদ সম্মেলনে জেমি ডের পাশে বসে থাকা স্ট্রাইকার শাখাওয়াত রনিও, ‘তরুণেরা চাইছে, আমাদের জায়গা ছিনিয়ে একাদশে নিয়মিত হতে। আমাদের চ্যালেঞ্জ জায়গাটা ধরে রাখা। সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা থাকলে আমাদের দলটা আরও ভালো করবে নিশ্চিত। আমাদের এই ম্যাচে “বেস্ট পারফরম্যান্স শো” করতে হবে।’
বাংলার মধ্যে এই তিনটি শব্দ খুব ভালো বুঝলেন বলেই কি না, পাশে বসে থাকা জেমি ডের প্রতিক্রিয়াটা হলো দেখার মতো। যেভাবে রনির দিকে তাকালেন, মুখচ্ছবিতে গর্বটা পড়ে নেওয়া যাচ্ছিল। বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মন্ত্র দলে ছড়িয়ে দেওয়ার গর্ব।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ টের পাওয়া গেছে সংবাদ সম্মেলন শেষে বিকেল সাড়ে চারটায় শুরু অনুশীলনেও। সবাই খুব সিরিয়াস! এশিয়াডে বাংলাদেশের খেলা দেখার পর ‘থ্রি-এস’ আলোচনায় ছিল। ফুটবলে খুবই জরুরি তিন বিষয়—স্ট্রেংথ (শক্তি), স্ট্যামিনা (দম) ও স্পিড (গতি) ভালোই দেখিয়েছে বাংলাদেশ। কাল অনুশীলনে খেলোয়াড়দের আরেক ‘এস’-এর সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন জেমি ডে। স্পেস। জায়গা খুঁজে নেওয়া, প্রতিপক্ষকে জায়গা না দেওয়া। কীভাবে প্রতিপক্ষের অর্ধেই বলের দখল নিতে ‘প্রেসিং’ করতে হবে, সেটি করতে গিয়ে মাঠের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গার হিসাব কীভাবে করতে হবে, দেখিয়ে দিচ্ছিলেন তা। বারবার খেলা থামিয়ে তাঁর দিকনির্দেশনা বলে দিচ্ছিল, এই ‘এস’টার খোঁজ পেতে একটু সময়ই লাগবে।
সে জন্যই কি না, সাফের শিরোপা স্বপ্নের বেলুনটাকে এখনই নিজ থেকে আরও ফুলাচ্ছেন না বাংলাদেশের কোচ। এই বেলায় তাঁর ‘রক্ষণাত্মক’ হওয়ার পালা, ‘সাফে আমাদের নিকট অতীত ইতিহাস ভালো নয় জানি। টেকনিক্যাল দিক থেকে কিন্তু আমরা এখানে সবচেয়ে ভালো দল নই। যে দলগুলো সাফে খেলবে, র্যাঙ্কিংয়ের হিসাবে আমরা সেখানে দ্বিতীয় (আসলে তৃতীয়) সর্বনিম্ন। আগে গ্রুপ পর্ব পার হই, তারপর দেখা যাক, কতটুকু যাওয়া যায়।’
লক্ষ্যকে এমন ছোট ছোট ভাগ করে নেওয়াই ভালো।