
ব্রাজিলিয়ানদের প্রতি সারা বিশ্বের মানুষেরই বাড়তি একটা আগ্রহ থাকে। সেটি মূলত ফুটবলের জন্যই। মানুষটি ফুটবলার বা কোচ যে-ই হোন, প্রথম কথা: ওহ্, ব্রাজিলিয়ান! তেমনই একজন ব্রাজিলিয়ানের দেখা মিলেছে ঢাকায় চলমান সাফ সুজুকি কাপে। সেটিও পাকিস্তান দলের ডাগআউটে। দীর্ঘকায়, সুদর্শন। ট্রাউজারের ওপর টিম ম্যানেজমেন্টের অন্যদের মতো চাঁদ-তারাখচিত টি-শার্ট। গত এপ্রিলে দুই বছরের জন্য পাকিস্তান জাতীয় দলের কোচ হয়েছেন। পাঁচ মাসের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে একজন খাঁটি পাকিস্তানি হয়ে গেছেন জোসে আন্তেনিও নোগেইরা।
একে তো ব্রাজিলিয়ান, তার ওপর এসেছেন গত তিন বছর আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিষিদ্ধ থাকা পাকিস্তানে। প্রত্যাবর্তনের এই সময়ে পাকিস্তান ফুটবলের ভিত্তি নির্মাণের দায়িত্ব এখন এই ব্রাজিলিয়ান মস্তিষ্কের। ব্যস্ততা অনেক। তবু পরশু ভুটানের বিপক্ষে পাকিস্তানের দ্বিতীয় ম্যাচের তিন ঘণ্টা আগে এই প্রতিনিধিকে সময় দিলেন গুলশান ২-এ হোটেল ওয়েস্টিনের ডাইনিংয়ে।
ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন। কিন্তু গল্পে মাতলে ঘড়ি কি টেনে ধরতে পারে! ব্রাজিলিয়ানরা এই অঞ্চলে কাজ করতে অভ্যস্ত নন। ৫২ বছর বয়সী নোগেইরা এসেছেন, তাও আবার ফুটবল অবকাঠামোয় অনেক পিছিয়ে থাকা দেশে। কিন্তু কেন? নোগেইরার উত্তরটা অনুমিতই, ‘পেশাদার কোচরা যেকোনো জায়গায় কাজ করে। পাকিস্তানেও সেভাবেই আসা আমার। যদিও তিন বছর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে না থাকায় উদ্যম, মনোযোগ, লক্ষ্য-সবই হারিয়েছে পাকিস্তান। ক্লাব ফুটবলার তৈরি করলে তবেই জাতীয় দল সুবিধা পায়, যা আপনারা পান। পাকিস্তান পায় না। এখানেই আমাদের বড় সমস্যা।’
পাকিস্তানের ঘরোয়া ফুটবল এখন মৃতপ্রায়। একমাত্র টুর্নামেন্ট ২৪ দলের চ্যালেঞ্জ কাপ। লিগ নেই। সেটা অবশ্য শুরু হবে অক্টোবরে। অথচ ভঙ্গুর কাঠামোর মধ্যেও সাফের সেমিতে পাকিস্তান। তবু কোচের মুখে একটা অতৃপ্তি, ‘ডেনমার্কের বিভিন্ন লিগে খেলা কয়েকজন ফুটবলার আছে পাকিস্তান দলে। তবে ডেনমার্ক প্রথম বিভাগে খেলা আমাদের সেরা ফুটবলারটিই (মিডফিল্ডার আদনান আহমেদ) এক মাস দুই দিনেও বাংলাদেশের ভিসা না পেয়ে আসতে পারেনি। এটা হতাশাজনক।’
নোগেইরার জন্ম সাওপাওলোয়। গোলরক্ষক ছিলেন, খেলেছেন কিরিন্থিয়ানসের মতো দলে। খেলেছেন মেক্সিকোতে। খেলা ছেড়ে এখন তিতেসহ ব্রাজিলের ৪৬ জন প্রো-লাইসেন্সধারী কোচের একজন। চারটি জাতীয় দলে কাজ করেছেন। ২০০৩ সালে আফ্রিকার সিয়েরা লিওনে কাজ করার সময় বিশ্বের তরুণতম জাতীয় কোচ ছিলেন এই নোগেইরা। সিয়েরা লিওনে কাটানো এক বছরকে নিজেই বলেন, ‘অনেক ফানি।’ সেটা কেমন? ‘সিয়েরা লিওনে দেড় মাস কাটিয়ে প্রথম অন্য দেশে যাচ্ছিলাম (সেনেগাল)। বিমান প্রস্তুত। কিন্তু উঠতে গিয়ে দেখি ওটা হাঁটা শুরু করেছে! ভেতরে গিয়ে দেখলাম ২২টি মাত্র সিট। খুবই পুরোনো। এটা ছিল রাশিয়ান বিমান।’
তারপর? ‘বিমানের সিট দেখে আমি অবাক। কাঠ পেতে দেওয়া আরকি! এটা কি আসলেই বিমান! নিজেকেই প্রশ্ন করি। আমার ৭০ বছরের বাবার চেয়ে বেশি পুরোনো। রুশ পাইলট বলল, চলুন যাত্রা করি। আমি প্রার্থনা শুরু করলাম।’ বলতে বলতে হাসিতে ফেটে পড়েন নোগেইরা। বিমান উড়াল দেওয়ার সময় নাকি ইঞ্জিনে টু টু শব্দ শুরু করছিল। পুরোনো ট্যাক্সির ইঞ্জিনের মতো! তখন টাওয়ার থেকে নাকি বলা হয়েছিল, ৪৩৭ বিমানের পাইলট ইঞ্জিনের টু টু শব্দ করছে কেন? মনে হয় তেলের বিল দেননি আপনারা। নোগেইরার হাসি থামেই না। ৫০ মিনিটের যাত্রার পুরোটাই নাকি তাঁর প্রার্থনায় কেটেছে।
একবার গ্যাবনে যান। সিয়েরা লিওন-গ্যাবন ম্যাচ। আফ্রিকান নেশনস কাপের খেলা। কিন্তু হঠাৎ মাঝবিরতিতে মাঠে চরম মারামারি। দর্শক হানায় খেলোয়াড়-কোচ সবাই দেদার মার খাচ্ছেন। নোগেইরা বলছিলেন, ‘ভিড়ের মধ্যে পুলিশের ভয়ানক ধাক্কাধাক্কির শিকার আমিও। “প্লিজ, স্টপ”...আমার ইংরেজি ওরা বোঝে না। তখনই মাথায় এল, আমি তো ব্রাজিলিয়ান। ফ্রেঞ্চ জানি। পুলিশকে বললাম, সিবু প্লে...সিবু প্লে...জেসইয়া ব্রাজিলিয়া...। শুনে ওরা বলে, কোচ “ইউ আর ব্রাজিলিয়ান...কাম অন কাম অন।” নিরাপত্তা মেলে। সেদিন ব্রাজিলিয়ান বলেই আসলে বেঁচে যাই।’
পাকিস্তানেও আছে নিরাপত্তা সমস্যা। তবে লাহোর, ইসলামাবাদে সমস্যা দেখেন না নোগেইরা, ‘ওখানে দিব্যি আছি।’ ২০ মিনিটের এই আড্ডায় মনে পড়ে বাংলাদেশের সাবেক ব্রাজিলিয়ান কোচ এডসন সিলভা ডিডোর কথা। তাঁর সঙ্গে পরিচয় নেই নোগেইরার। প্রসঙ্গক্রমে আসে ব্রাজিলের ফুটবল। বাবার মতো জাতীয় দলের কোচ হওয়া ছেলে নোগেইরাকে আশাবাদী দেখায়, ‘আমাদের তরুণেরা উঠে আসছে নতুন স্টাইলের ফুটবল নিয়ে। শুধু জাতীয় দল নয়, আমরা এখন প্রশিক্ষণকেন্দ্র-স্টেডিয়াম করছি ভবিষ্যতের জন্য।’ ফুটবলের তৃতীয় বিশ্বের প্রতিনিধি ছাড়া ভবিষ্যতের কথা সবাই ভাবে। এমনকি ফুটবলের দেশ ব্রাজিলও।