
বিশ্বকাপ মানে তো শুধু মাঠের লড়াই নয়; এর আশপাশে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের কোলাজ। যে গল্পের কোনোটিতে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, আছে রোমাঞ্চ কিংবা অজানা চমক। বিশ্বকাপের তেমন কিছু গল্প নিয়ে এ আয়োজন—
ম্যাচটা ছিল গুরুত্বহীন।
ফ্রান্স, হাঙ্গেরি দুই দলেরই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়েছে আগেই। ম্যাচটি ছিল তাই স্রেফ আনুষ্ঠানিকতার। কিন্তু ১৯৭৮ বিশ্বকাপের সেই ‘গুরুত্বহীন’ ম্যাচটিই পরে হয়ে যায় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত জার্সি-কাণ্ডের জন্মদাতা। ফ্রান্সের খেলোয়াড়েরা পরলেন আর্জেন্টাইন জার্সি।
সমস্যার শুরু বলা যায় দুটো চিঠি থেকে। ১৯৭৮ সালে পৃথিবীর বেশির ভাগ দর্শক তখনো সাদাকালো টেলিভিশনে খেলা দেখতেন। তাই টেলিভিশনে ম্যাচ সম্প্রচারের সময় দুটি দলের জার্সির রং যতটা সম্ভব আলাদা রাখার বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হতো। সেই বিবেচনায় ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফিফা ফ্রান্স ও হাঙ্গেরির ফুটবল ফেডারেশনকে চিঠি দিয়ে জানায় যে হাঙ্গেরি তাদের লাল হোম জার্সিতে এবং ফ্রান্স তাদের সাদা অ্যাওয়ে জার্সিতে খেলবে।
তবে দুই মাস পরই সিদ্ধান্ত বদলায় ফিফা। এবার জানানো হয়, ফ্রান্স তাদের নীল হোম জার্সিতে এবং হাঙ্গেরি তাদের সাদা অ্যাওয়ে জার্সিতে খেলবে। এই নতুন নির্দেশনাটিই বিভ্রান্তি তৈরি করে। ফরাসি কর্মকর্তা অঁরি প্যাত্রেল চিঠিটা চোখ বুলিয়ে এক পাশে সরিয়ে রাখেন। পরে সেটাই গিয়ে পড়ে ঝুড়িতে।
১০ জুন দুই দল যখন ম্যাচের ভেন্যু মার দেল প্লাতায় পৌঁছায়, দেখা গেল সবার সঙ্গে সাদা অ্যাওয়ে পোশাক। মানে হাঙ্গেরি পরের চিঠি অনুসরণ করলেও ফ্রান্স প্রথম চিঠি ধরেই মাঠে হাজির হয়।
দুই দলই যে সাদা জার্সি নিয়ে মাঠে এসেছে, সেটা ধরা পড়ে ওয়ার্মআপের সময়। ফরাসি খেলোয়াড়েরা নীল ট্র্যাকস্যুট টপের নিচে সাদা জার্সি পরে মাঠে নামলেন। হাঙ্গেরির খেলোয়াড়েরা পুরো লাল ট্র্যাকস্যুটে তার আগে থেকেই মাঠে। তাঁদের মোজাও ঢাকা। ফরাসি ডিফেন্ডার অঁরি মিশেলের চোখে পড়ল হাঙ্গেরির পেতের তরোচিকের ট্র্যাকস্যুটের ফাঁক দিয়ে সাদা কিছু একটা।
মিশেল জিজ্ঞেস করলেন, ‘সাদা জার্সি?’
তরোচিক নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, সাদা জার্সি।’
মুহূর্তেই মিশেল বুঝলেন, বড়সড় বিপদ হয়ে গেছে। দলের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞেস করা হলো নীল জার্সিগুলো কোথায়? উত্তর এল, সেগুলো ৪০০ কিলোমিটার দূরে বুয়েনস এইরেসে।
এখন পুরো আয়োজনটাই পড়ে গেল বিপাকে। দুই দলের জার্সি এক রকম, বিকল্পও নেই। এখন কী করা? তড়িঘড়ি করে কয়েকজনকে পাঠানো হলো স্থানীয় ফুটবল ক্লাব আতলেতিকো কিম্বার্লিতে। উদ্দেশ্য, ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের পরার জন্য একটা ডার্ক রঙের জার্সির সেট যদি পাওয়া যায়। কিম্বার্লিং জার্সির রং সবুজ এবং সাদা স্ট্রাইপ। বিশ্বকাপের জন্য জার্সি দিতে রাজি হলেন ক্লাবটির কর্মকর্তারা।
কিন্তু সমস্যা তাতে পুরোপুরি মিটল না। কিম্বার্লির জার্সিগুলোতে কোনো নম্বর নেই। নম্বর লাগাতে হবে, ম্যাচ শুরু হতে বাকি মাত্র ৪০ মিনিট।
সেবার ফ্রান্সের স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের নম্বর দেওয়া হয়েছিল পজিশন অনুযায়ী। ডিফেন্ডারদের জন্য ২ থেকে ৮ নম্বর, মিডফিল্ডারদের জন্য ৯ থেকে ১৫, আর ফরোয়ার্ডদের জন্য ১৬ থেকে ২০ নম্বর।
কিম্বার্লির কাছে আউটফিল্ড জার্সি ছিল ১৪টি। তারা ইস্ত্রি করে নম্বর বসাতে রাজি হলেন। কিন্তু একটা শর্ত আছে—নম্বরের ক্রমে কোনো ফাঁক রাখা যাবে না। হলোও সেটাই। এরপর জার্সিগুলোর নম্বর দাঁড়াল ২-১১ এবং ১৩-১৬ (১২ নম্বর সংরক্ষিত থাকত বিকল্প গোলকিপারের জন্য)।
ফ্রান্সের খেলোয়াড়েরা জার্সি পরার পর আবিষ্কার হলো আরেক বিপত্তি। জার্সি নম্বর আসল স্কোয়াড নম্বরের সঙ্গে মেলে না। যেমন ডমিনিক রোশতো পরলেন ৭ নম্বর জার্সি, যদিও তাঁর স্কোয়াড নম্বর ১৮। অলিভিয়ে রুয়ায়ে পরলেন ১১, তাঁর আসল নম্বর ছিল ২০। ১২ নম্বরের ক্লোদ পাপি পরলেন ১০ নম্বর জার্সি।
এই তিনজনের আলাদা করে বলার কারণও আছে। এঁদের সঙ্গে বেঞ্চে থাকা দিদিয়ে সিক্স ও বার্নার্ড লামোম্বসহ মোট পাঁচজন খেলোয়াড়ের জার্সি নম্বর ছিল একটি, আর তাঁদের পরনের নীল ফরাসি শর্টসে ছিল আসল স্কোয়াড নম্বর। মানে, পিঠে এক নম্বর, শর্টসে আরেক নম্বর।
জার্সি নিয়ে কারিকুরিতে সেদিন ম্যাচ শুরু হয় ৪০ মিনিট দেরিতে। কিম্বার্লির কিছু খেলোয়াড় সেদিন গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছিলেন। নিজেদের ক্লাবের জার্সি বিশ্বকাপের মাঠে দেখে যে তাঁরা বেশ খুশিই ছিলেন, সে তো জানাই।
এ ঘটনার মাধ্যমেই আতলেতিকো কিম্বার্লি বিশ্ব ফুটবলে অন্য রকম এক পরিচিতি পেয়ে যায়। যে দল কখনো প্রথম বিভাগে খেলতে পারেনি, সেদিন তারাই হয়ে উঠল বিশ্বকাপের এক মজার অধ্যায়ের অংশ।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে অসংখ্য ম্যাচ হারিয়ে গেছে সময়ের ভিড়ে; কিন্তু ১৯৭৮ সালের সেই প্রায়-অর্থহীন ম্যাচটি টিকে আছে একটা ভুলে যাওয়া চিঠি, স্থানীয় এক ক্লাবের সহায়তা আর জার্সি–বিভ্রাটের জন্য।