অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস বলছে, আগামী ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনকে কাঁদিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে ফ্রান্স।
অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস বলছে, আগামী ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনকে কাঁদিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে ফ্রান্স।

অর্থনীতিবিদদের আভাস

স্পেনকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতবে ফ্রান্স

অর্থনীতিবিদদের টেবিলজুড়ে সব সময়ই থাকে যুদ্ধবিগ্রহের আঁচ, মূল্যস্ফীতির খতিয়ান কিংবা সামষ্টিক অর্থনীতির একঘেয়ে মারপ্যাঁচ। এই রুক্ষ হিসাব-নিকাশের খাতা থেকে একটু মুক্তি পেতে কে না চায়! চার বছর পরপর তাই তাঁরাও মেতে ওঠেন এক অদ্ভুত স্বস্তির খেলায়।

আগামী বিশ্বকাপ সামনে রেখে বার্তা সংস্থা রয়টার্স তেমনি এক জরিপ চালিয়েছিল। যেখানে অংশ নিয়েছিলেন বিশ্বের নামীদামি ১৬০ জন অর্থনীতিবিদ। তবে জটিল সব তত্ত্ব দেওয়া এই পণ্ডিতেরা এবার অকপটে স্বীকার করেছেন এক মধুর সত্য—মূল্যস্ফীতির কঠিন হিসাব কষা যত না কঠিন, তার চেয়েও ঢের কঠিন বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ীর নাম বলা!

সে যাক, অর্থনীতিবিদদের সেই জটিল সব গাণিতিক মডেল আর মনের সহজাত অনুভূতি এবার এক সুরে গান গাইছে ফরাসিদের পক্ষে। তাঁদের পূর্বাভাস বলছে, আগামী ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের মহাকাব্যিক ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে ফ্রান্স।

ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম

অর্থনীতিবিদদের এই ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্যি হয়, তবে দিদিয়ের দেশম ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব পেয়ে যাবেন। ইতালির ভিত্তোরিও পোজ্জোর পর দ্বিতীয় কোচ হিসেবে গড়বেন দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি। একই সঙ্গে খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার পর আবারও কোচ হিসেবে ট্রফি ছোঁয়ার অনন্য এক রেকর্ডও হয়ে যাবে। জরিপে ৩৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ফরাসিরা যেখানে শীর্ষে, ৩১ শতাংশ ভোট নিয়ে স্প্যানিশরা ঠিক তাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে। শীর্ষ পাঁচের বাকি তিনটি নামও বেশ চেনা—বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের চূড়ায় থাকা আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল ও ইংল্যান্ড।

ব্রাজিলের সমর্থকেরা এই জরিপ দেখে নির্ঘাত চোখ ফিরিয়ে নেবেন। কার্লো আনচেলত্তির মতো হাইপ্রোফাইল চাণক্য ডাগআউটে থাকার পরও পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না বিশ্লেষকেরা। ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে সেই যে বুক ভেঙেছিল সেলেসাওদের, সেই ক্ষতের দাগ এখনো দগদগে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থনীতিবিদের চোখে এবার ব্রাজিলের কপালে জুটছে ‘সবচেয়ে বড় হতাশাজনক পরাশক্তি’র তকমা। ব্রাজিলের পেছনেই আছে ইংল্যান্ড ও জার্মানি।

অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস বলছে, বিশ্বকাপে রানার্স আপ হবে স্পেন।

লন্ডনভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘আরবিসি’র জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ক্যাথাল কেনেডি ফরাসিদের এই রাজত্ব ফিরে পাওয়ার পেছনে দেখিয়েছেন নিরেট যুক্তি। তাঁর মতে, ২০২২ ফাইনালের সেই লুসাইল ট্র্যাজেডির ক্ষত ভুলে ফ্রান্স এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। দলটিতে আছেন ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে থাকা একঝাঁক অভিজ্ঞ ফুটবলার। পিএসজি থেকে উঠে আসা কিছু তরুণ ফুটবলার দলটিকে আরও শক্তিশালী করেছেন। আর সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড? কেনেডি মনে করিয়ে দিলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা, তারা একদম ফুরফুরে মেজাজে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে পাচ্ছে।’

কিলিয়ান এমবাপ্পেই এবার ‘গোল্ডেন বল’ আর ‘গোল্ডেন বুট’ জয়ের দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে। বিশ্লেষকদের চোখে তাঁর ঠিক পেছনেই হ্যারি কেইন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে এই মৌসুমে ক্যারিয়ার–সর্বোচ্চ ৬১ গোল করে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জেতা কেইন এবার ইংলিশদের স্বপ্নসারথি। এই দুই মহাতারকার সামনেই নতুন ইতিহাস গড়ার হাতছানি। বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোল ১২টি, কেইনের ৮টি। জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ড ভাঙার দৌড়ে লিওনেল মেসির (১৩ গোল) সঙ্গে আছেন তাঁরাও।

কিলিয়ান এমবাপ্পে

অর্থনীতিবিদদের এই অনুমানের পেছনে কি শুধুই খাতা-কলমের হিসাব, নাকি মনের ভেতরের লুকানো কোনো টানও আছে? জরিপে অংশ নেওয়া ৮ শতাংশ অর্থনীতিবিদ অকপটে স্বীকার করেছেন, দেশের প্রতি অন্ধ ভালোবাসাই তাঁদের দিয়ে দল পছন্দ করিয়েছে। যেমন দুজনের চোখে চ্যাম্পিয়ন জাপান, একজন মেক্সিকো আর একজনের ভোট পড়েছে মরক্কোর বাক্সে। এসবের যেকোনো একটা সত্যি হলে এবারের বিশ্বকাপ সব রূপকথাকে ছাড়িয়ে যাবে! তবে ৭৩ শতাংশ অর্থনীতিবিদই জানিয়েছেন, কোনো যুক্তি নয়, তাঁরা মনের সহজাত অনুভূতি থেকেই এই অনুমান করেছেন।

বাকি প্রায় ২০ শতাংশ অর্থনীতিবিদ অবশ্য খাঁটি পেশাদার। তাঁরা কঠিন সব ডেটা ও বিশেষ গাণিতিক মডেলের ওপর নির্ভর করেছেন।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই বিশ্বকাপটি হতে যাচ্ছে ৪৮টি দলের, ম্যাচ হবে মোট ১০৪টি। আয়োজক হিসেবে থাকছে তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। এত বড় মহাযজ্ঞে আন্ডারডগ বা কালো ঘোড়া হিসেবে ২১ শতাংশ ভোট নিয়ে সবার আগে আছে আর্লিং হলান্ডের নরওয়ে। ১৫ শতাংশ ভোট নিয়ে তাদের পেছনে জাপান।

স্পেনের জার্সিতে লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই বিশ্বকাপটি হতে যাচ্ছে ৪৮টি দলের, ম্যাচ হবে মোট ১০৪টি। আয়োজক হিসেবে থাকছে তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। এত বড় মহাযজ্ঞে আন্ডারডগ বা কালো ঘোড়া হিসেবে ২১ শতাংশ ভোট নিয়ে সবার আগে আছে আর্লিং হলান্ডের নরওয়ে। ১৫ শতাংশ ভোট নিয়ে তাদের পেছনে জাপান।

আর উদীয়মান তারকার ক্যাটাগরিতে যে মোট ৪৬ জন ফুটবলারের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে স্পেনের ১৮ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামালের বাক্সে। গোলপোস্টের নিচে অতন্দ্র প্রহরী বা ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ জয়ের লড়াইয়ে ফেবারিটের তালিকায় আছেন ফ্রান্সের মাইক মাইনিয়, আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও স্পেনের উনাই সিমন।

অর্থনীতির গ্রাফের ওঠানামা হয়তো পৃথিবীর ভাগ্য বদলায়, তবে দিন শেষে মনে রাখতে হবে, ফুটবলের সবুজ মাঠে কোনো অর্থনৈতিক মডেল কাজ করে না। সেখানে শেষ কথা বলে জাদুকরের পায়ের জাদু। সব সমীকরণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেখানে হয়তো ফুটবল তার নিজের পাণ্ডুলিপি নিজেই লিখবে।

তবে আপাতত অর্থনীতিবিদদের ভবিষ্যদ্বাণী মেনে নিয়ে ফরাসিরা বলতেই পারেন, ‘লা ভি এন রোজ’—জীবন আসলেই চমৎকার!