ফেনেরবাচে কোচ ইসমাইল কারতাল
ফেনেরবাচে কোচ ইসমাইল কারতাল

চ্যাম্পিয়নস লিগ

খেলা শেষেই কোচের পদত্যাগ, ক্লাব সভাপতি বললেন, যত দিন আছি তিনিই কোচ

আর্চি ব্রাউনের মুখের চাহনিই সব বলে দিচ্ছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, এমন কিছু শোনার জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।

ইস্তাম্বুলে ম্যাচ শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। ঘরের মাঠে এএস রোমার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে ফেনেরবাচে। তুর্কি ক্লাবটির সমতাসূচক গোলটি ইংলিশ ডিফেন্ডার ব্রাউনের। রোমা গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে দারুণ চিপে করা গোল। মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে ব্রাউন হয়তো ভেবেছিলেন, প্রথম প্রশ্নটাই হবে তাঁর গোলটি কিংবা ম্যাচসেরা হওয়া নিয়ে।

কিন্তু সেসবে না গিয়ে তাৎক্ষণিক এক খবরের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয় ব্রাউনের কাছে। খবরটি হলো ফেনেরবাচে কোচের পদ ছেড়েছেন ইসমাইল কারতাল। ভাষান্তরিত প্রশ্নটি শুনে পুরোপুরি হতবাক হয়ে যান ব্রাউন। দলের কোচ পদত্যাগ করেছেন কিন্তু তিনি কিছুই জানেন না!

চোখেমুখে বিস্ময় ফুটিয়ে ব্রাউন পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘বলেন কী, তিনি পদত্যাগ করেছেন? আমি তো এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’

ব্রাউন কিছুই জানতেন না। এমন কিছু যে ঘটতে যাচ্ছে, সে আভাসও ছিল না তাঁর কাছে। অথচ কিছুক্ষণ আগেই ফেনেরবাচের ইতিহাসে প্রথম তুর্কি কোচ হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগে পয়েন্ট অর্জন করেছেন কারতাল। দলের খেলা সমর্থকদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট না করলেও দ্বিতীয়ার্ধে বেশ ভালোই খেলে ফেনেরবাচে।

সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে কারতাল নিজেই বলেছেন, ‘এটি ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের যোগ্য এক ফুটবল প্রদর্শনী। আমি আমার খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানাতে চাই।’ কিন্তু তখন পর্যন্তও কেউ ভাবতে পারেননি, যে ক্লাবে কারতাল এক সময় খেলেছেন, সহকারী কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন, সেই ক্লাবের প্রধান কোচের দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেবেন।

ফেনেরবাচে সভাপতি আজিজ ইলদিরিম

কারতাল প্রথমে ক্লাব সভাপতির প্রশংসা করে বলেন, ‘এখানে তিন মাস হলো আছি। মৌসুমের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত খেলোয়াড়দের নিয়ে করা ট্রেনিং সেশন, ক্যাম্প ও আমাদের ক্লাবের সভাপতির প্রচেষ্টা অত্যন্ত সহায়ক ছিল। দিনগুলো দারুণ কেটেছে।’ এরপরই আসে কোচের দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা, ‘নিজের পদ থেকে আমি সরে দাঁড়াচ্ছি। ক্লাবের জন্য নতুন পথ উন্মুক্ত করতেই এ সিদ্ধান্ত। আমরা পুরো কোচিং স্টাফ মিলে যৌথভাবে সিদ্ধান্তটি নিয়েছি। ফেনেরবাচে, আমার খেলোয়াড় ও ভবিষ্যৎ কোচদের সুবিধার্থে আমি পদত্যাগ করেছি—আর কখনো না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে।’

চলতি বছর জুনে চতুর্থ মেয়াদে ফেনেরবাচের কোচের দায়িত্বে ফেরেন ৬৫ বছর বয়সী কারতাল । তাঁর হাত ধরেই ১৮ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগে ফেরে ক্লাবটি। তুর্কি সুপার লিগে দুই জয় ও দুই হারে দল টেবিলের ৯ নম্বরে থাকা অবস্থায় এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের মাত্র একটি ম্যাচ পরই কোচের দায়িত্ব ছাড়লেন তিনি।

তবে ৬৫ বছর বয়সী কারতালের পদত্যাগ মেনে নেননি ফেনেরবাচে সভাপতি আজিজ ইলদিরিম।

ক্লাবটির ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে ইলদিরিম বলেন, ‘ইসমাইল কারতাল এখনো দায়িত্বে আছেন। ক্লাব কর্তৃপক্ষের উচিত আমাদের কোচকে সমর্থন করা। আমি যত দিন আছি, তত দিন ইসমাইল কারতালই ফেনেরবাচের প্রধান কোচ।’

ইসমাইল কারতালের নিজে থেকে বলার প্রয়োজন নেই যে তিনি থাকবেন। আমি তাঁর বড়, আমি বলেছি তিনি থাকবেন—ব্যস, এটাই শেষ কথা। আমরা একটি পরিবার।
ফেনেরবাচে সভাপতি আজিজ ইলদিরিম

ইলদিরিম নিশ্চিত করেন যে সংবাদ সম্মেলনের পর তিনি কারতালের সঙ্গে কথা বলেছেন। তীব্র মানসিক ‘চাপ’ ও খেলা চলাকালে গ্যালারি থেকে ছোড়া বোতলের আঘাতে আহত হওয়ার ঘটনা তাঁকে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেনেরবাচে জানিয়েছে, বোতল ছোড়ার ঘটনায় জড়িত দর্শককে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাঁকে স্টেডিয়ামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সমর্থক ও সংবাদমাধ্যমের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন ইলদিরিম। ক্রমাগত সমালোচনার মাধ্যমে যে মানসিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে তা উল্লেখ করে দুই পক্ষকেই ‘ফেনেরবাচে পরিমণ্ডলের ভাবমূর্তি রক্ষা’ করা এবং কারতালের প্রতি আরও সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানান তিনি।

গোলের পর ফেনেরবাচে লেফট ব্যাক আর্চি ব্রাউনের উদ্‌যাপন

কারতালের বিষয়ে আরও শক্ত অবস্থান নিয়ে ইলদিরিম বলেন, ‘ক্লাব পরিমণ্ডলের উচিত ইসমাইল কারতালকে সমর্থন করা। এভাবে আঘাত করে তো সমর্থন জানানো যায় না। ইসমাইল কারতালের নিজে থেকে বলার প্রয়োজন নেই যে তিনি থাকবেন। আমি তাঁর বড়, আমি বলেছি তিনি থাকবেন—ব্যস, এটাই শেষ কথা। আমরা একটি পরিবার।’

এর আগে সহকারী কোচ হিসেবে চার বছর কাটানোর পর ২০১৪ সালে ফেনেরবাচের প্রধান কোচ হিসেবে নিজের প্রথম মেয়াদে তুর্কি সুপার কাপ জেতেন কারতাল। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ক্লাবটির কোচের দায়িত্ব পালন করেন সাবেক এ রাইটব্যাক। খেলোয়াড় হিসেবে ক্লাবটির হয়ে দুটি লিগ শিরোপাসহ মোট ছয়টি ট্রফি জিতেছিলেন কারতাল।