আবারও বার্সেলোনা, নাকি মরিনিওর হাত ধরে রিয়ালের সিংহাসনে ফেরা

বিশ্বকাপ ট্রফির রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও চেনা উত্তাপে ফিরছে ইউরোপের ক্লাব ফুটবল। ২০২৬-২৭ মৌসুম শুরুর আগে কী পরিবর্তন এসেছে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে? ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্সের শীর্ষ লিগে কারা এবার শিরোপার দাবিদার? কোথাও একক রাজত্ব ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ, কোথাও আবার সিংহাসন পুনর্দখলের লড়াই। আগস্টের মাঝামাঝি থেকে আগামী বছরের মে মাস পর্যন্ত হতে যাওয়া নতুন এই মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগ নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক আয়োজন। আজ থাকছে স্পেনের লা লিগার অন্দরমহলের কথা।

ক্যাম্প ন্যু, নাকি বার্নাব্যু? স্পেনের ফুটবলে আবার সেই চেনা উত্তাপ। আগামীকালই শুরু হচ্ছে লা লিগার নতুন মৌসুম। আর শুরুর আগে বরাবরের মতো চেনা প্রশ্নটাই ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। শিরোপা কি থাকবে বার্সেলোনার ঘরে, নাকি জোসে মরিনিওর প্রত্যাবর্তনে নতুন করে জেগে উঠবে রিয়াল মাদ্রিদ?

১৩ বছর পর রিয়ালের ডাগআউটে ফিরেছেন মরিনিও। সর্বশেষ দুই মৌসুমে বড় কোনো ট্রফি ছুঁতে পারেনি রিয়াল। তাই হারানো রাজত্ব ফেরাতে আবার পর্তুগিজ কোচের কৌশল আর কঠোরতার শরণাপন্ন ক্লাব। অনেকে বলছেন, তারকায় ভরা রিয়ালের ড্রেসিংরুমে শৃঙ্খলা ফেরাতেই মরিনিওকে বার্নাব্যুতে ফিরিয়েছেন রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ।

তবে সন্দেহও আছে। মরিনিওর রক্ষণনির্ভর বার্সেলোনার মতো আক্রমণাত্মক দল ও লা লিগার এখনকার গতির সঙ্গে কতটা মানানসই, সেই প্রশ্নও আছে। আগের মৌসুমে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র মিলে লিগে করেছেন ৪১ গোল। মাঝমাঠ থেকে জুড বেলিংহাম যোগ করেছেন ৬ গোল। এত আগুনে আক্রমণভাগকে কীভাবে নিজের ছকে বাঁধবেন মরিনিও, সেটাই এখন কৌতূহলের কেন্দ্র। তিনি বেনফিকার কোচ থাকার সময় ভিনিসিয়ুসকে ঘিরে তৈরি হওয়া বর্ণবাদ বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। সেই ছায়া তাঁদের সম্পর্কের ওপর পড়ে কি না, সেটাও দেখার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।

দলবদলের বাজারে রিয়াল এবার বেশ সক্রিয়। লাইপজিগ থেকে ১২ কোটি ৫০ লাখ ইউরোতে আনা হয়েছে ইয়ান দিওমান্দেকে। মৌসুমের সবচেয়ে দামি দলবদল এটি। চেলসি থেকে ৫ কোটি ৫০ লাখ ইউরোতে এসেছেন মার্ক কুকুরেয়া। দলে যোগ দিয়েছেন বের্নার্দো সিলভা, ডেনজেল ডামফ্রিস ও ইব্রাহিমা কোনাতে। ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন হয়েছে ২০৩২ সাল পর্যন্ত। সব মিলিয়ে মরিনিওর হাতে অনেক অস্ত্র।

রিয়াল মাদ্রিদ লাইপজিগ থেকে দিওমান্দেকে কিনেছে

অন্যদিকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনা বেশ নির্ভার। সর্বশেষ মৌসুমে রিয়ালকে ২-০ গোলে হারিয়ে তিন ম্যাচ হাতে রেখেই লিগ জিতেছিল তারা। সর্বশেষ চার মৌসুমে যেটি তাদের তৃতীয় লিগ শিরোপা, কোচ হান্সি ফ্লিকের অধীন টানা দ্বিতীয়। এবার ফ্লিকের লক্ষ্য পেপ গার্দিওলার (২০০৮-২০১১) পর দ্বিতীয় বার্সা কোচ হিসেবে টানা তিনটি লিগ জেতা। সেই লক্ষ্যেই দলকে এগিয়ে নিচ্ছেন ফ্লিক। তাঁর চুক্তিও বাড়ানো হয়েছে আরও দুই বছর। গত মৌসুমে প্রতি ম্যাচে গড়ে ২.৫ গোল করা এবং ৬৮. ৮ শতাংশ বল দখলে রাখা বার্সা এবারও হট ফেবারিট।

বার্সেলোনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ১৮ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামাল। আগের মৌসুমে চোটের সঙ্গে লড়াই করেও ১৬ গোল ও ১১টি অ্যাসিস্ট নিয়ে টানা দ্বিতীয়বার লা লিগার বর্ষসেরা খেলোয়াড় হয়েছেন।

ফ্লিকের দল অনেক ওপরে উঠে খেলে। প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে। কিন্তু পেছনে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। সেই শূন্যতা ঢাকতেই নিউক্যাসল থেকে ৭ কোটি ইউরোতে আনা হয়েছে অ্যান্টনি গর্ডনকে। দলে এসেছেন করিম আদেইয়েমিও। কিন্তু রবার্ট লেভানডভস্কি শিকাগো ফায়ারে চলে যাওয়ায় সামনে একজন নিখাদ নাম্বার নাইনের অভাব থেকেই গেছে। ফেরান তোরেস সেই জায়গা কতটা ভরাট করতে পারেন, সেটাই দেখার অপেক্ষা।

অনুশীলনে চনমনে, মাঠের খেলায়ও তাদের এমনই দেখার প্রত্যাশা বার্সা সমর্থকদের

এই দুই পরাশক্তির বাইরে থেকেও চোখ রাখতে হবে আতলেতিকো মাদ্রিদের দিকে। দিয়েগো সিমিওনের কাঁধে চাপ বাড়ছে। গত মৌসুমে চতুর্থ হয়েছে দলটি। চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনাল, কোপা দেল রের ফাইনাল—সবই ছুঁয়ে ফেরা, কিন্তু ট্রফি শূন্য। আঁতোয়ান গ্রিজমান চলে গেছেন। তবে হুলিয়ান আলভারেজকে রেখে দিয়েছে দল। মাঝমাঠে শক্তি বাড়াতে ৪ কোটি ইউরোতে মর্তেন হিউলমান্দ ও একই দামে লি কাং ইনকে আনা হয়েছে।

ঠিক শিরোপার দাবিদার না হলেও ভিয়ারিয়াল শিরোপার লড়াইয়ে ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের আগের কোচ মার্সেলিনো গার্সিয়া তোরাল বিদায় নিয়েছেন, দায়িত্ব নিয়েছেন ইনিগো পেরেজ। অন্যদিকে ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনির অধীন রিয়াল বেতিস নীরবে নিজেদের শক্তি বাড়াচ্ছে। গত মৌসুমে পাঁচে থেকে ২০ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে নিয়েছে তারা। ২০২২ সালে কোপা দেল রে জেতার পর গত বছর কনফারেন্স লিগের ফাইনালেও খেলেছিল বেতিস।

তবে শেষ পর্যন্ত লড়াইটা সেই চিরকালীন বার্সা-রিয়ালেরই। মৌসুমের দুটি এল ক্লাসিকো যেখানে বড় ভূমিকা রাখবে শিরোপা লড়াইয়ে। এ ছাড়া মাঝের বা নিচের দিকের দলগুলোর সঙ্গে দু–একটা ম্যাচ হয়তো পাল্টে দেবে লিগের হিসাব।
সেই হিসাব শেষে ফ্লিকের বার্সার ধারাবাহিকতা নাকি মরিনিওর প্রত্যাবর্তনের নাটকীয়তা—কোনটি জিতবে?

উত্তর মিলবে আগামী বছরের মে মাসে।