
আপনার জন্ম যদি আশি বা নব্বইয়ের দশকে হয়, টাইম মেশিনে করে আপনাকে ৩২ বছর আগে নিয়ে গেলে কেমন লাগবে?
ধরুন, আপনি কেবল স্কুলের চৌকাঠে পা রেখেছেন। বাংলাদেশ সময় তখন গ্রীষ্মকালের কোনো এক গভীর রাত। ন্যাশনাল কোম্পানির ১৫ ইঞ্চি একটি টেলিভিশনের পর্দাকেই আপনি করেছেন জীবনের ধ্রুবতারা। সেই পর্দায় আপনি দেখতে পেলেন, নীল জার্সি পরা একজন খেলোয়াড়ের পেনাল্টি মাঠের বাইরে চলে গেল। বিস্ময়ে বিমূঢ় লোকটার সামনে হলুদ জার্সি পরা একদল খেলোয়াড় উল্লাস করছেন। সেই ছবিটাই আপনার মনের পটে এমনভাবে আঁকা হয়ে গেল, আপনার কাছে অনেক দিন ফুটবল মানে হয়ে রইল ওই হলুদ জার্সির উল্লাস। আর বেদনার রং যে নীল, সেটাও আপনি চিনলেন তখন।
আপনি ‘নাইন্টিজ কিড’ হলে ১৯৯৪ বিশ্বকাপটা আপনার কাছে স্মৃতিমেদুরতায় ভেসে যাওয়ার একটা মোক্ষম উপলক্ষ। রবার্তো বাজ্জোর পেনাল্টি মিসের ওই ছবি ফুটবল ইতিহাসেই পেয়ে গেছে অমরত্ব। হয়তো এতটাই বেশি, ১৯৯৪ বললে ডুঙ্গার ব্রাজিলের ট্রফি উদ্যাপনের আগে ওই ছবিটাই বেশি চোখে ভাসে। তবে ১৯৯৪ বিশ্বকাপটা নানান দিক দিয়ে এতটাই অভিনব, ফুটবল ইতিহাসের গতিপথের অনেকটাই বদলে গেছে সেই বিশ্বকাপে।
শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাগতিক হওয়ার বিষয়টাই ধরা যাক। যে দেশে ফুটবলকে বলা হয় সকার; পেলে, বেকেনবাওয়ার খেলে যাওয়ার পরও যে দেশে পেশাদার ফুটবল লিগ ছিল না, সেই দেশে হবে বিশ্বকাপ! ফিফার এমন সিদ্ধান্তের বড় কারণ যদি ফুটবলের বিশ্বায়ন হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠেছিল বেসবল-আমেরিকান ফুটবলের দেশে ‘সকার’ কদর পাবে তো? সেটা যে ভালোমতোই পেয়েছে, তা বোঝা গেল বিশ্বকাপ শেষে। সেই বিশ্বকাপে গড়ে ৬৯ হাজার দর্শক হয়েছিল প্রতি ম্যাচে, পুরো বিশ্বকাপে প্রায় ৩.৬ মিলিয়ন—যে রেকর্ড টিকে আছে এখনো। কে জানে, এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই যুক্তরাষ্ট্রেই হয়তো সেটা ভেঙে যাবে!
এস্কোবারের ওই ঘটনার সঙ্গে তুলনীয় কিছুই নয়, তবে এই বিশ্বকাপে ট্র্যাজেডির নায়ক বললে বিশেষ করে বাংলাদেশি মানুষের কাছে আরেকজনের নামই আগে আসবে। ১৯৮৬ ও ১৯৯০ বিশ্বকাপের সুবাদে ডিয়েগো ম্যারাডোনা তখন পুরো বিশ্বেই মহাতারকা, ৯৪-এর শুরুতে গ্রিসের বিপক্ষে দুর্দান্ত গোল আর আগ্রাসী উদ্যাপনে ম্যারাডোনা-ম্যানিয়া তখন তুঙ্গে। কিন্তু স্বর্গ থেকে পতনের মতো গ্রুপ পর্ব শেষ না হতেই ড্রাগ কেলেঙ্কারিতে ম্যারাডোনা নিষিদ্ধ! সংবাদমাধ্যমের সামনে ম্যারাডোনার বিমর্ষ অধোবদন হয়ে থাকার সেই ছবি আর্জেন্টিনাকে এতটাই ধাক্কা দেয়, আগের দুবারের ফাইনালিস্টরা সেবার রোমানিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয় শেষ ১৬ থেকেই।
ব্রাজিলের জন্য অবশ্য এমন সুযোগ বারবার আসে না। ১৯৭০-এর কিংবদন্তি দলের পর একেকটা বিশ্বকাপ ছিল তাদের কাছে একেকটা রোদনভরা গ্রীষ্ম। ১৯৯৪ সালেও আশার পালে হাওয়া খুব জোরালো ছিল না। বাছাইপর্বে হোঁচট খেয়ে কোনোমতে বিশ্বকাপে উঠে আসা, দুই তারকা বেবেতো আর রোমারিওর ‘ইগো দ্বন্দ্ব’—সবকিছু ছাপিয়ে ব্রাজিল পেয়ে যায় চতুর্থ শিরোপা। তাতে বড় কৃতিত্ব অবশ্যই সুন্দর ফুটবলের রোমান্টিকতা ঝেড়ে কার্যকরী ফুটবল খেলানো কোচ কার্লোস আলবার্তো পাহেইরার, আর অবশ্যই দ্বন্দ্ব ভুলে বেবেতো আর রোমারিওর দুর্দান্ত রসায়নের। সবচেয়ে বেশি গোলের পুরস্কার না পেলেও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ঠিকই হয়েছিলেন রোমারিও—যাকে নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস শিরোনাম করেছিল, ‘আকারে ছোট, কিন্তু প্রতিভায় বড়’।
ও হ্যাঁ, ১৯৯৪ বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে থাকবে আন্ডারডগদের জন্যও। মার্টিন ডাহলিন আর থমাস ব্রোলিনের সুইডেন অনেককে কাঁপিয়ে চলে যায় সেমিফাইনালে। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে হাজির রোমানিয়া কোয়ার্টারে থমকে গেলেও রিস্টো স্টয়চকভের বুলগেরিয়া ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে হারিয়ে চলে যায় সেমিফাইনালে।
আরেকটা কারণেও ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ছিল অভিনব। অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা আগের বিশ্বকাপের মতো ২৪টি থাকলেও ফিফা সেবার একটা বড় বদল আনে—জয়ের জন্য পাবে ৩ পয়েন্ট, ড্রয়ের জন্য ১। ১৯৯০ বিশ্বকাপে গোল কম হওয়া নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। চার বছর পর ওই পরিবর্তিত নিয়ম কাজে দিয়েছে ভালোই। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ম্যাচপ্রতি গোল হয়েছিল ২.৭১, যেটা চার বছর আগে ছিল মাত্র ২.২১।
সেবার শিকাগোর সোলজার ফিল্ড মাঠে ৬৩ হাজার দর্শকে ঠাসা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটাই বলে দিচ্ছিল ‘ইয়াঙ্কিরা’ ফুটবলটাকে বুঝে হোক না বুঝে হোক, ভালোভাবেই বরণ করে নিয়েছে। তবে সেই অনুষ্ঠানেই গোলপোস্টের মাত্র পাঁচ গজ দূরে দাঁড়িয়ে প্রতীকী পেনাল্টি থেকে যখন গোল করতে পারলেন না আমেরিকান গায়িকা ডায়ানা রস, তখন অনেকেই হয়তো ধরে নিয়েছিলেন, না ‘সকারটা’ আমেরিকানদের জন্য নয়, তাদের জন্য ‘আমেরিকান ফুটবলই’ ঠিক আছ!
মাঠে অবশ্য সেই সংশয়বাদীদের ভুল প্রমাণ করতে সময় নেয়নি স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। ৬৪ বছরে প্রথমবারের মতো স্বাগতিকেরা গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে জায়গা করে নেয় নকআউটে, সেখানে চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের কাছে ১-০ গোলের হারে থামতে হয় তাদের। এই যাত্রাপথে মার্কিনিরা হারায় সেবারের ডার্ক হর্স কলম্বিয়াকে, আত্মঘাতী গোল করেন কলম্বিয়ান ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এস্কোবার। একটা গোলের জন্য একটু বেশিই মূল্য দিতে হয়েছিল এস্কোবারকে, দেশে ফেরার ১০ দিন পর আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারাতে হয় তাঁকে।
ফাইনালে যেতে না পারলেও ছয় গোল করে গোল্ডেন বুট পেয়েছিলেন স্টয়চকভ, তবে যৌথভাবে তা ভাগ করে নিতে হয়েছিল রাশিয়ার ওলেগ সালেংকোর সঙ্গে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সালেংকোর ছয় গোলের পাঁচটি একই ম্যাচে—ক্যামেরুনের বিপক্ষে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে রাশিয়া নামে সেবারই প্রথম খেলতে আসে দলটি। প্রথমবার খেলতে এসে চমকে দেয় নাইজেরিয়া আর সৌদি আরবও। গ্রুপ পর্বে ৭০ গজের এক দৌড়ে বেলজিয়াম রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করে সৌদির সাইদ আল-ওয়াইরান করেছিলেন এক অবিশ্বাস্য গোল। বিটিভির রাতের খবরে ঠাঁই পেয়ে যাওয়া সেই গোলের দৃশ্যও অনেকের মনে থাকার কথা।
৩২ বছর আগে হয়ে গেলেও ১৯৯৪ বিশ্বকাপকে মনে হয় যেন এই সেদিনের ঘটনা। অন্তত এই লেখার লেখকের মতো আরও অনেক নাইন্টিজ কিডের কাছে তো বটেই।