মারুফুল হক
মারুফুল হক

সুইসদের ‘হাইআপ মিরর শেপ’ ভাঙতেই ঘাম ঝরেছে আর্জেন্টিনার

আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে ৩-১ ব্যবধানে জিতেছে ঠিকই, কিন্তু জয়টি এসেছে কষ্টসাধ্য পথ পাড়ি দিয়ে। সুইজারল্যান্ডের মতো দল, যারা ১০ জনে পরিণত হয়েছিল, তাদের বিপক্ষে জয় নিশ্চিত করতে আর্জেন্টিনাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

একজন ফুটবল বিশ্লেষক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, এই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার ট্যাকটিক্যাল দুর্বলতাগুলোকে একেবারে সামনে নিয়ে এসেছে।

সুইজারল্যান্ড এই ম্যাচে একটি বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করেছিল, যাকে বলে ‘হাইআপ মিরর শেপ’। যা ভাঙতে ঘাম ঝরেছে আর্জেন্টিনার। সহজভাবে বললে, সুইসরা আর্জেন্টিনার প্রতিটি খেলোয়াড়কে ম্যান-টু-ম্যান শ্যাডো মার্কিং করেছে।

আর্জেন্টিনার দুই সেন্টার ব্যাকের জন্য তাদের দুজন ফরোয়ার্ড, ফুল ব্যাকের জন্য উইঙ্গার এবং মিডফিল্ডে তিনজন মিডফিল্ডারের বিপরীতে তিনজন। এর ফলে আর্জেন্টিনা নিচ থেকে খেলা তৈরি করতে পারছিল না। গোলরক্ষক মার্তিনেজ বা ডিফেন্ডাররা বারবার লম্বা বল মারতে বাধ্য হচ্ছিলেন।

আর্জেন্টিনার আগের ম্যাচগুলোতে আমরা দেখেছি এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো দি পল এবং ম্যাক অ্যালিস্টার নিজেদের মধ্যে জায়গা পরিবর্তন করে সুন্দরভাবে বল বের করে আনতেন। কিন্তু এই ম্যাচে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের অন্তর্ভুক্তি সেই চেনা ছন্দ নষ্ট করেছে। পারেদেসের মধ্যে সেই সৃজনশীলতা ছিল না, যা দিয়ে এই চাপ কাটিয়ে বল বের করা যায়। ফলে আর্জেন্টিনা বারবার ডিরেক্ট ফুটবল খেলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। যেটা আগের পাঁচটি ম্যাচে দেখা যায়নি।

লিওনেল মেসির শট ঠেকাচ্ছেন সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল

আর্জেন্টিনার খেলার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তাদের আক্রমণে কোনো বৈচিত্র্য নেই। তারা শুধু ‘মিডল পেনিট্রেশন’ বা মাঝখান দিয়ে খেলার চেষ্টা করে। দলে কোনো কার্যকর উইং প্লে নেই। যখন প্রতিপক্ষ মাঝখানটা ব্লক করে দেয়, তখন মেসি বা আলভারেজরা আর জায়গা খুঁজে পান না। সুইজারল্যান্ড যখন ১০ জনে পরিণত হয়ে ‘লো ব্লকে’ রক্ষণ করছিল, তখন সেই ব্লক ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল নিতে দেখা যায়নি আর্জেন্টিনাকে, যা অন্য দলগুলো সাধারণত করে থাকে।

সহজভাবে বললে, উইং প্লে, বিহাইন্ড দ্য ব্লক রান, সুইস প্লে, কুইক ব্রেক থ্রু উইং প্লে বা দূরপাল্লার শট...এগুলোর কোনোটিই আর্জেন্টিনা প্রয়োগ করতে পারেনি সুইসদের বিপক্ষে। লিওনেল স্কালোনির দল শুধু ‘অ্যারাউন্ড দ্য ব্লক’ খেলেছে মিডল পেনিট্রেশন করার জন্য, যা সুইসদের পক্ষে প্রতিরোধ করা সহজ ছিল।

মজার ব্যাপার, ৭২ মিনিটে ব্রিল এমবোলো লাল কার্ড পাওয়ার আগপর্যন্ত সুইজারল্যান্ডই মাঠের খেলায় আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তখন পর্যন্ত তাদের বল পজেশন ছিল ৫৫ শতাংশ, যেখানে আর্জেন্টিনার ছিল মাত্র ৪৫ শতাংশ। সুইজারল্যান্ড সাধারণত রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে, কিন্তু এদিন তারা দাপটের সঙ্গে খেলেছে। তাদের ফিনিশিং ভালো হলে ম্যাচের ফল অন্য রকম হতে পারত। এমবোলোর লাল কার্ডটিই ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট, যা সুইজারল্যান্ডের খেলার ভারসাম্য নষ্ট করে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে বের করার সুযোগ করে দেয়।

আমি বলব, আর্জেন্টিনা এই ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত বের করতে পেরেছে আলভারেজের বুদ্ধিদীপ্ত একটা শটে। ভাগ্যের সহায়তাও তারা পেয়েছে, যদিও শেষ পর্যন্ত তাদের আত্মবিশ্বাসী দেখা গেছে। তবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনার খেলায় যে বৈচিত্র্য থাকা উচিত ছিল, তার অভাব স্পষ্ট। তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের খেলা এখন খুব সহজেই পড়া যায়, যা প্রতিপক্ষের জন্য রক্ষণভাগ সামলানো সহজই করে দিচ্ছে । পাশাপাশি বলব, আরও বেশি বেশি এবং দ্রুত প্রতি–আক্রমণ করতে হবে আর্জেন্টিনাকে।

নিউইয়র্কে বড় পর্দায় আর্জেন্টিনা–সুইজারল্যান্ড ম্যাচ দেখেন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা

নকআউট পর্বের তিনটি ম্যাচেই আর্জেন্টিনা কোনোমতে পার পেয়েছে। তবে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ভাগ্যের ওপর ভর করে টিকে থাকা কঠিন হবে। আর্জেন্টিনা দ্রুত উইং প্লে এবং আক্রমণে বৈচিত্র্য না আনতে পারলে ইংল্যান্ডের সামনে আটকে যেতে পারে।

ইংল্যান্ড সেই সংকেত দিয়ে রেখেছে। নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের তাদের লক্ষ্য ছিল স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ডকে কড়া মার্কিং করবে। তাঁকে বলই ছুঁতে দেবে না। এই কাজে ইংল্যান্ড সফল। টমাস টুখেলের দলে আক্রমণে বৈচিত্র্য আছে, মাঠের তিন দিক থেকেই আক্রমণ করতে পারে। যেটা নরওয়ের বিপক্ষেও দেখা গেছে ভালোভাবে।

গ্রুপ পর্বে প্রথম দুই ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন অনেকটা নিচে নেমে দলের বিল্ডআপে সহায়তা করেছেন। আধুনিক ফুটবলে নাম্বার নাইনকে বিল্ডআপে ব্যবহার করা খুব একটা দেখা যায় না। এখানেই ব্যতিক্রম কেইন এবং ইংল্যান্ড দল।

জুড বেলিংহামের কথা না বললেই নয়। আমি আগেই এই কলামে বলেছিলাম, এই বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ও মাঝমাঠের বিটুইন দ্য লাইন থেকে সবচেয়ে বেশি বল নিচ্ছেন বেলিংহাম। কেইনের সঙ্গে জায়গা বদল করে খেলে নিয়মিত গোলও পাচ্ছেন, যা ইংল্যান্ডকে এখন ফাইনালের আশাও জাগাচ্ছে। ইংল্যান্ড ভালোই উইং প্লে করেছে নরওয়ের বিপক্ষে, কিন্তু দুই উইঙ্গারের মিসের কারণে ফল পেতে দেরি হয়েছে, এই যা। ইংল্যান্ডের এই জয় তাদের টিম ওয়ার্কেরই ফসল।

লেখক: ফুটবল কোচ ও বিশ্লেষক