পর্তুগিজ শাসনের নির্দর্শন হয়ে গোয়ায় টিকে আছে বিভিন্ন স্থাপত্য
পর্তুগিজ শাসনের নির্দর্শন হয়ে গোয়ায় টিকে আছে বিভিন্ন স্থাপত্য

ভারতের বুকে এক টুকরো পর্তুগাল

২৮ মে, রাত প্রায় ১২টা। মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের আলো নিভে গেছে বেশ আগেই, রাস্তাঘাটও প্রায় ফাঁকা। কিছুটা হেঁটে পাশের কদম্ব বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখা গেল জনমানবহীন পরিবেশ। শুধু দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। হোটেলে ফেরার কোনো উপায় না দেখে তাঁদের কাছে সাহায্য চাইলাম। একজন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বললেন, ‘আমার বাইকের পেছনে বসুন।’

অপরিচিত শহর, গভীর রাত। স্বাভাবিকভাবেই মনে কিছুটা সংশয় ছিল। তবু তাঁর বাইকে উঠে বসলাম। পথ চলতে চলতে আলাপ জমল। জানা গেল, তাঁর নাম ফেরলে মার্টিন রাজ। খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী, ছোটখাটো ব্যবসা করেন। কথা বলতে বলতে তিনি সরাসরি আমাকে হোটেলে না নিয়ে হোটেলের কাছেই নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। রাত তখন প্রায় একটা। প্রথমে কিছুটা অস্বস্তি হলেও রাজের গল্প শুনতে শুনতে সেই অনুভূতি বদলে গেল বিস্ময়ে।

জানা ছিল, গোয়া একসময় পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল। দীর্ঘ সাড়ে চার শ বছরের পর্তুগিজ শাসনের ছাপ আজও এখানকার স্থাপত্য, রাস্তা, গির্জা, খাবার, এমনকি মানুষের পদবিতেও রয়ে গেছে—ডিসুজা, ফার্নান্দেজ কিংবা রদ্রিগেজ নামগুলো তারই সাক্ষ্য।

রাজকে প্রশ্ন করলাম, ‘বিশ্বকাপ ফুটবল এলে গোয়ার মানুষ কি পর্তুগালকে সমর্থন করে? ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কি এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলার?’ হেসে বললেন, ‘এখানে রোনালদোর অসংখ্য ভক্ত আছে।’ এরপর দিলেন এক চমকপ্রদ তথ্য, ‘আমি গোয়ায় থাকলেও আমার পাসপোর্ট পর্তুগালের। পর্তুগালের পাসপোর্টধারী এমন অনেক ভারতীয় এখানে আছেন।’

গোয়ার পানজিমের অন্যতম প্রাচীন গির্জা ‘আওয়ার লেডি অফ দ্য ইম্যাকুলেট কনসেপশন চার্চ’

গোয়ার অলিগলি এখনো অনুচ্চারে পর্তুগিজ শাসনের ইতিহাসই বলে। বিশেষ করে ওল্ড গোয়া বা ভেলহা গোয়া যেন পর্তুগিজ ইতিহাসের এক উন্মুক্ত জাদুঘর। ১৫৯৪ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে ১৬০৫ সালে শেষ হওয়া বিখ্যাত গির্জা বাসিলিকা অব বম জেসুস।

রেনেসাঁ ও বারোক স্থাপত্যশৈলীর এই নিদর্শন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গির্জা। এখানেই সংরক্ষিত আছে ধর্মপ্রচারক সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারের মরদেহ। প্রতি ১০ বছর পর তা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৮৬ সালে ইউনেসকো ওল্ড গোয়ার ঐতিহাসিক গির্জা ও মঠগুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
পাশেই থাকা এশিয়ার বৃহত্তম গির্জাগুলোর একটি সে ক্যাথেড্রালের বিখ্যাত ‘গোল্ডেন বেল’ বহু পর্যটকের আকর্ষণের কেন্দ্র। আর চার্চ অব সেন্ট কাজেতান নির্মিত হয়েছে রোমের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার আদলে।

গোয়ার বিখ্যাত গির্জা বাসিলিকা অব বম জেসুস

বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় গোয়ার অনেক ঘরে পর্তুগালের পতাকা ওড়ে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো থাকেন আবেগের কেন্দ্রে। গোয়ার সবচেয়ে পুরোনো ক্লাব ভাস্কো স্পোর্টসের ফুটবল সম্পাদক মারিও ডি সুজার ভাষায়, ‘বিশ্বকাপের ৭৫ ভাগ গোয়ান পর্তুগালকে সমর্থন করে এবং রোনালদো এখানে গড।’

গোয়ার তরুণ ফুটবলপ্রেমী অ্যালেন ফার্নান্দেজ পরিশ্রম আর শৃঙ্খলার উদাহরণ হিসেবে রোনালদোকে তাঁদের কাছের একজনই ভাবেন। একই মত স্থানীয় ফুটবল–ভক্ত মারিয়া ফার্নান্দেজেরও, ‘ছোট থেকেই তো পর্তুগাল আর রোনালদোকে দেখে বড় হয়েছি।’

গোয়ার সড়কে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ভাস্কর্য

অনেকের পছন্দের তালিকায় আছেন লিওনেল মেসি, এমবাপ্পে, নেইমারও। অবশ্য বিশ্বকাপ দরজায় কড়া নাড়লেও গোয়ার রাস্তায় এখন পর্যন্ত কোনো দলের পোস্টার, ব্যানার কিছুই চোখে পড়েনি।

গোয়ার পরিচয় শুধু ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। পানাজির ফন্টেনহাস এলাকায় হাঁটলে মনে হয়, ইউরোপের কোনো ছোট্ট শহরের রঙিন গলিতে এসে পড়েছেন। লাল, হলুদ ও নীল রঙের পুরোনো পর্তুগিজ বাড়ি, কাঠের নকশা করা বারান্দা, টাইলসের নামফলক আর ছোট ছোট গির্জা। পর্যটকেরা এখানে এলে পর্তুগিজ ঘরানার ভিন্ডালু বা ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি বেবিঙ্কার স্বাদ নিতেও ভুল করেন না।

৩০ মে ডন বস্কো কলেজ মাঠে বাংলাদেশের অনুশীলন কভার করতে গিয়ে পরিচয় হয় মুম্বাইয়ের মিড-ডে পত্রিকার জন্য কাজ করা স্থানীয় ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রাহুল চান্দাওয়ারকরের সঙ্গে। তিনি জানান, ১৯৬১ সালের ১৯ ডিসেম্বরের আগে গোয়ায় জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিদের বংশধরেরা নির্দিষ্ট শর্তে পর্তুগিজ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। উন্নত জীবনযাপন ও ইউরোপে সহজ যাতায়াতের সুযোগ পাওয়ার আশায় অনেকেই এই পথ বেছে নিয়েছেন।

গোয়ার সৈকতে আছড়ে পড়ছে ঢেউ

তবে কেউ পর্তুগালের নাগরিকত্ব নিলে ভারতের নাগরিকত্ব ছাড়তে হয়। পরিবর্তে তাঁরা ওসিআই কার্ড পান, যার মাধ্যমে ভারতে বসবাস ও সম্পত্তি ক্রয়ের অধিকার থাকে, যদিও ভোটাধিকার থাকে না।

সময়ের সঙ্গে গোয়ার সামাজিক চিত্রও বদলেছে। রাহুলের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে গোয়ার জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশ ছিল খ্রিষ্টান, ৫০ শতাংশ হিন্দু ও ৫ শতাংশ মুসলিম। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী বর্তমানে হিন্দু জনসংখ্যা বেড়ে ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে, খ্রিষ্টান জনসংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ২৬ শতাংশে,  মুসলিম ৮ শতাংশ। অনেক খ্রিষ্টান পরিবার পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী হয়েছে। ভাষাতেও এসেছে পরিবর্তন। একসময় যেখানে পর্তুগিজ ও কঙ্কনি ছিল প্রধান ভাষা, এখন কঙ্কনির সঙ্গে ইংরেজি আর হিন্দির প্রাধান্য।

ভারতে ব্রিটিশ শাসন স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ২০০ বছর। কিন্তু গোয়ায় পর্তুগিজরা ছিল তার দ্বিগুণ সময়ের বেশি। ফলে ফুটবলের বীজও এখানেই তারা রোপণ করে গিয়েছিল।
রাহুলের কণ্ঠে কিছুটা আক্ষেপও শোনা গেছে অবশ্য, ‘ফুটবল এখনো জনপ্রিয় গোয়ায়, কিন্তু আগের মতো উন্মাদনা নেই। বাংলা বা কেরলমের মতো ধারাবাহিক ফুটবল সংস্কৃতি আমরা ধরে রাখতে পারিনি। এখন ভারতের অনেক ফুটবলার আসছে মণিপুর, মেঘালয়ের মতো রাজ্য থেকে।’ সমস্যাটা বৈষম্যেও দেখেন তিনি। এফসি গোয়ার ম্যাচে জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে সহজেই ১০ হাজার দর্শক হয়, অথচ ভারতের নারী জাতীয় ফুটবল দলের ম্যাচেও গ্যালারি থাকে ফাঁকা।

তবু গোয়ার গল্প শুধু সৈকত, ক্যাসিনো বা ‘নাইটলাইফ’–এর নয়। এটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস, পর্তুগিজ পরিচয়ের উত্তরাধিকার, নাগরিকত্বের জটিল বাস্তবতা এবং ফুটবলকে ঘিরে এক গভীর আবেগের গল্প। ভারতীয় মানচিত্রের মধ্যে থেকেও গোয়া যেন আজও পর্তুগালেরই ছায়া!