সান্তোস তারকা নেইমার
সান্তোস তারকা নেইমার

নেইমারকে বিশ্বকাপে চান না ৪৫ শতাংশ ব্রাজিলিয়ান, ব্রাজিল ট্রফি জিতবে না মনে করেন ৬৮ শতাংশ

২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে এখন একটাই প্রশ্ন—নেইমার কি কার্লো আনচেলত্তির বিশ্বকাপ দলে থাকতে পারবেন?

আগামী ১৮ মে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা করবেন আনচেলত্তি। তার আগে কিছুই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে নেইমারের ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলা না–খেলা নিয়ে ব্রাজিলিয়ানদের ব্যক্তিগত মতামত তো আছেই। সেটাই জরিপ করেছে ব্রাজিলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা ‘জেনিয়াল/কুয়েস্ট’।

গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তাদের জরিপে দেখা গেছে, নেইমারকে জাতীয় দলে ডাকার পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৭ শতাংশ ব্রাজিলিয়ান। তাঁর দলে ফেরার বিপক্ষে মত দিয়েছেন ৪৫ শতাংশ ব্রাজিলিয়ান। বাকি ৮ শতাংশ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি বা কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।

শুধু তা–ই নয়, জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি বা ৫৪ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ নিয়ে তাঁদের মনে কোনো ‘উত্তেজনা নেই’। মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ এবারের আসর নিয়ে ‘খুবই রোমাঞ্চিত’। ৩২ শতাংশের উত্তর ছিল, তাঁরা ‘খুব একটা রোমাঞ্চ অনুভব করছেন না’।

ব্রাজিলের হয়ে সর্বশেষ ২০২৩ সালের অক্টোবরে খেলেন নেইমার

বিশ্বকাপ নিয়ে ব্রাজিলিয়ানদের এমন অনীহার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নেতিবাচক পূর্বাভাস। ৬৮ শতাংশ ব্রাজিলিয়ানই মনে করেন, পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের এবারও বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা নেই। ২০২৩ সালের এপ্রিলে এ জরিপ শুরু হওয়ার পর ব্রাজিলে ফুটবল নিয়ে এমন চরম হতাশার চিত্র আর কখনো দেখা যায়নি। এটিই জরিপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ নেতিবাচক হার।

‘জেনিয়াল/কুয়েস্ট’ মূলত দুটি প্রতিষ্ঠানের একটি যৌথ প্রয়াস, যেখানে ‘জেনিয়াল ইনভেস্তিমেন্তোস’–এর আর্থিক খাতের দক্ষতা এবং সিইও ফেলিপে নুনেস প্রতিষ্ঠিত ‘কুয়েস্ট কনসাল্টোরিয়া ই পেসকুইসা’র তথ্যনির্ভর বুদ্ধিমত্তা ও বিশ্লেষণ একীভূত হয়েছে। এর আগে ব্রাজিলের ভোটারদের মনোভাব, নির্বাচনী সমীকরণ ও সরকারের জনপ্রিয়তার ওপর বড় আকারের জরিপ চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। দুই হাজার বা তার বেশি মানুষের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে তৈরি করা তাদের গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনগুলো বেশ নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

চোট ও ফিটনেস সমস্যায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে নেইমার জাতীয় দলের বাইরে। ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমার সর্বশেষ খেলেন ২০২৩ সালে অক্টোবরে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে। জাতীয় দলে ফিরতে হলে এখন সান্তোস তারকাকে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা পেতে হবে। কারণ, বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণার আগে ব্রাজিলের কোনো ম্যাচ নেই। বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণার পর পানামা ও মিসরের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলার কথা ব্রাজিলের। বিশ্বকাপের স্কোয়াড নিয়েই এ দুটি ম্যাচে শেষ প্রস্তুতি সারবেন আনচেলত্তি।

গত ১০ থেকে ১৩ এপ্রিল ব্রাজিলে এ জরিপ চালানো হয়। এতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন ২ হাজার ৪ জন মানুষ। ন্যূনতম ১৬ বছর বয়সীদের মধ্যে এ জরিপ চালানো হয়।

ব্রাজিলে অঞ্চলভেদে নেইমারকে নিয়ে ভক্তদের মতভেদের চিত্রটি বেশ স্পষ্ট। ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চলে নেইমারকে দলে নেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান অধিকাংশ মানুষের। তবে এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে; সেখানে কার্লো আনচেলত্তির চূড়ান্ত দলে এই ফরোয়ার্ডের উপস্থিতির পক্ষেই রায় দিয়েছেন বেশির ভাগ। এ ছাড়া মধ্য-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের ফুটবলপ্রেমীরাও নেইমারের জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পক্ষে। নেইমারের ক্লাব সান্তোস সাও পাওলো শহরে অবস্থিত। ব্রাজিলের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সাও পাওলো।

সাও পাওলোয় অবস্থিত সান্তোস ফুটবল ক্লাব

জরিপ অনুযায়ী, ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে দুই পক্ষের মধ্যে সমানে সমান লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যায়। আয়ের ভিত্তিতেও মতামতের ভিন্নতা চোখে পড়ার মতো। স্বল্প আয়ের মানুষদের মধ্যে নেইমারকে দলে রাখার পক্ষে ও বিপক্ষে প্রায় সমান সমর্থন দেখা গেছে। তবে উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে নেইমারকে দলে ডাকার সমর্থনে মনোভাব কিছুটা ইতিবাচক।

১০ থেকে ১৩ এপ্রিল ব্রাজিলে এ জরিপ চালানো হয়। এতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন ২ হাজার ৪ জন মানুষ। ন্যূনতম ১৬ বছর বয়সীদের মধ্যে এ জরিপ চালানো হয়।

জরিপের ফল বলছে, ব্রাজিল কোচ হিসেবে আনচেলত্তির পারফরম্যান্সের চেয়ে তাঁর জনপ্রিয়তার হার কম। ইতালিয়ান কোচের কাজে সন্তুষ্টি জানিয়েছেন ৪১ শতাংশ ব্রাজিলিয়ান। তাঁর ওপর নাখোশ ২৯ শতাংশ, আর বাকি ৩০ শতাংশ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। আনচেলত্তির অধীনে এখন পর্যন্ত ১০টি ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল। এর মধ্যে পাঁচটিতে জয় পেলেও ড্র করেছে দুটি এবং হেরেছে তিনটিতে। জয়ের হার ৫৬ শতাংশ।

৩৪ বছর বয়সী নেইমার এখন ক্যারিয়ারের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০১০ সালে ব্রাজিল দলে তাঁর অভিষেকের সময় মনে করা হয়েছিল, পেলে–রোনালদোদের পরম্পরা তিনি ধরে রাখবেন। প্রতিভায় তা নিয়ে সন্দেহ না থাকলেও চোটপ্রবণতা ও ফিটনেস সমস্যায় ক্যারিয়ারজুড়েই জর্জর হয়েছেন নেইমার। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আগের তিনটি আসরে (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২) গিয়েও পারেননি।

ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি

জাতীয় দলে জায়গা পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের শুরুতে নেইমার ফিরে যান তাঁর শৈশবের ক্লাব সান্তোসে। প্রত্যাবর্তনে তাঁর প্রথম বছরটি মোটেও সুখকর ছিল না। বড় কোনো অর্জনের বদলে সেবার দ্বিতীয় বিভাগ বা সিরি ‘বি’-তে অবনমন এড়ানোই ছিল সান্তোসের স্বস্তির জায়গা।

সান্তোসে ফেরার পর এ পর্যন্ত ৩৬টি ম্যাচ খেলেছেন নেইমার। এর মধ্যে ২৮ ম্যাচ খেলেছেন গত বছর এবং ৮টি ম্যাচ খেলেছেন চলতি বছরে। গোল করেছেন ১৫টি, করিয়েছেন আরও ৭টি। সর্বশেষ ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে শেষ দিকে মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ঝলক দেখালেও পেশি ও লিগামেন্টে নতুন সব চোটের কারণে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ‘ও গ্লোবো’ জানিয়েছে, সব দিক বিবেচনা করেই ব্রাজিল কোচ আনচলেত্তি নেইমারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। ব্রাজিলিয়ান সিরি ‘আ’–তে বাংলাদেশ সময় রোববার রাতে ফ্লুমিনেন্সের মুখোমুখি হবে সান্তোস। এ ম্যাচটি সান্তোস ফরোয়ার্ডের জন্য নিজেকে প্রমাণের বড় পরীক্ষা। ম্যাচটিতে নেইমারের খেলা নিশ্চিত করেছে সান্তোস।

নেইমার কি শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে সুযোগ পাবেন? উত্তর এখন সময়ের হাতে

তবে নেইমারকে নিয়ে ব্রাজিল জাতীয় দলের নির্বাচক কমিটির পর্যবেক্ষণ শিগগিরই চূড়ান্ত হচ্ছে না। নির্বাচক কমিটি সম্ভবত আরও কিছুদিন সময় নেবে বলে জানিয়েছে ‘ও গ্লোবো’। আগামী সপ্তাহে বাহিয়ার মাঠে নামবে সান্তোস। এরপর ২ মে পালমেইরাসের বিপক্ষে খেলবে ডার্বি ম্যাচ। আনচেলত্তি ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণার আগে সান্তোসের এই বড় ম্যাচগুলো কঠিন পরীক্ষা হতে যাচ্ছে নেইমারের জন্য। সব মিলিয়ে ১৮ মে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণার আগে নেইমারের হাতে আছে আর ৯ ম্যাচ।

আগামী ১১ জুন শুরু হবে বিশ্বকাপ। এবার আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ‘সি’ গ্রুপে ব্রাজিলের তিন প্রতিদ্বন্দ্বী দল মরক্কো, হাইতি ও স্কটল্যান্ড। ১৩ জুন নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মরক্কোর মুখোমুখি হয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ব্রাজিল।