
বিশ্বকাপ মানে শুধু চেনা মহিরুহদের ডালপালা মেলার গল্প নয়, অচেনা কিংবা কম চেনা কোনো চারা গাছের আচমকা বড় হয়ে ওঠার রোমাঞ্চও। ১৯৫৮-এর পেলে, ২০০৬-এর লিওনেল মেসি কিংবা সর্বশেষ বিশ্বকাপে এনজো ফার্নান্দেজ—বিশ্বকাপের ইতিহাস তরুণদের রাজকীয় উত্থানের গল্পেও রঙিন। এবারের বিশ্বকাপে সেই উত্থানের গল্প লিখবেন কে বা কারা? দেখুন তো নামগুলো রোমাঞ্চ জাগায় কি না—
মাইকেল ওলিসে (ফ্রান্স)
বয়স: ২৪
পজিশন: রাইট উইঙ্গার/অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ক্রিস্টাল প্যালেস থেকে মাত্র ৫ কোটি ৩০ লাখ ইউরোতে এই উইঙ্গারকে কীভাবে কিনেছিল বায়ার্ন মিউনিখ, তা এক রহস্য বটে! এই বাজারে এটা ‘ডাকাতি’ ছাড়া আর কী! বায়ার্নের হয়ে সদ্য সমাপ্ত মৌসুমটা অলিসের কেটেছে স্বপ্নের মতো। বুন্দেসলিগা চ্যাম্পিয়ন হওয়া অলিসের দল পিএসজির কাছে হেরে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালের টিকিট না পেলেও, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে তিনি চোখধাঁধানো।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২২ গোল আর ৩১ গোলে সহযোগিতা—সংখ্যাগুলো যেন চিৎকার করে বলছে, আসছে ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়েও তাঁর নামটা থাকা উচিত! ফ্রান্স দলে নক্ষত্রের মেলা, সেখানেও অলিসে নিজের দ্যুতিতে আলাদাভাবে ভাস্বর। তাঁর বাঁ পায়ের সেই চেনা ‘ইনভার্টেড কার্লার’ শটগুলো বিশ্বকাপে দর্শকদের চোখ জুড়াবে।
নিকো পাজ (আর্জেন্টিনা)
বয়স: ২১
পজিশন: অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার
তরুণ এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ারের সেরা সিদ্ধান্ত ছিল ২০২৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে ইতালিয়ান ক্লাব কোমোতে যোগ দেওয়া। স্প্যানিশ কিংবদন্তি সেস্ক ফ্যাব্রিগাসের অধীন পাজ যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন নতুন করে। গত মৌসুমে সিরি আ-তে ফেরা কোমোর হয়ে ১৫টি গোলে অবদান রাখা পাজ এই মৌসুমে করেছেন ১৩ গোল, করিয়েছেন আরও ৮টি। ফলাফল, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোমো সুযোগ পেয়েছে চ্যাম্পিয়নস লিগে।
এদিকে লিওনেল মেসির বয়স বাড়ছে, আনহেল দি মারিয়ার মতো ‘ক্রাইসিস ম্যান’ও এখন আর্জেন্টিনা দলে নেই। এই শূন্যতা পূরণে কোচ লিওনেল স্কালোনির ট্রাম্প কার্ড হতে পারেন পাজ। কেন তাঁকে লুকা মদরিচের আধুনিক সংস্করণ মনে করা হচ্ছে, কেন রিয়াল মাদ্রিদ তাঁকে বার্নাব্যুতে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে, বিশ্বকাপে হয়তো মিলবে সেসব প্রশ্নের উত্তরও।
আলেকজান্ডার পাভলোভিচ (জার্মানি)
বয়স: ২২
পজিশন: ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার
আপনার পজিশনের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় যখন আপনার প্রশংসা করবে, তখন বুঝে নিতে হবে আপনি ঠিক পথেই আছেন। সম্প্রতি আলেকজান্ডার পাভলোভিচকে ‘বিশ্বমানের’ ও ‘ভবিষ্যতের নেতা’ বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন জার্মানি ও বায়ার্ন কিংবদন্তি বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার।
পাভলোভিচ যে জার্মানির মাঝমাঠের ভবিষ্যৎ, এ নিয়ে এখন কারোরই খুব একটা সন্দেহ নেই। তাঁর খেলায় শোয়াইনস্টাইগার ও টনি ক্রুসের ছায়া স্পষ্ট। মাঝমাঠের গভীর থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ ও দলকে বিপদমুক্ত করার সামর্থ্য তাঁকে একাদশে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। পাশাপাশি দূরপাল্লার শটে দুর্দান্ত সব গোল করার সহজাত ক্ষমতা। তাঁর বয়স মাত্র ২২!
নিকো ও’রাইলি (ইংল্যান্ড)
বয়স: ২১
পজিশন: লেফট ব্যাক
মাত্র ২১ বছর বয়সেই পেপ গার্দিওলার আস্থা অর্জন করে ম্যানচেস্টার সিটির নিয়মিত মুখ হয়ে উঠা চাট্টিখানি কথা নয়। গত মার্চে আর্সেনালের বিপক্ষে লিগ কাপ ফাইনালে জোড়া গোল করা ও’রাইলি আসলে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন একজন গোলস্কোরিং মিডফিল্ডার হিসেবে। কিন্তু গার্দিওলা তাঁর উচ্চতা, গতি ও দক্ষতা দেখে তাঁকে বানিয়েছেন ‘অনেক কাজের কাজি’।
এবার ও’রাইলি থাকায় হয়তো ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলেরও অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে সবচেয়ে বেশি ডুয়েল (১৩২টি) জেতার রেকর্ডই বলে দেয়, ও’রাইলি কতটা লড়াকু। আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা মাত্র ৩টি। ইংল্যান্ডের শুরুর একাদশে জায়গা পাওয়ার অন্যতম দাবিদার ও’রাইলি।
এনদ্রিক (ব্রাজিল)
বয়স: ১৯
পজিশন: ফরোয়ার্ড
১৬ বছর বয়সে পালমেইরাসের হয়ে অভিষেক, আর ১৮ ছোঁয়ার আগেই রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে চুক্তি—এনদ্রিকের গল্পটা কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। তবে রিয়ালে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও কিলিয়ান এমবাপ্পের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাওয়ার পর গত জানুয়ারিতে ফরাসি ক্লাব লিঁও-তে ধারে গিয়েই আবার নিজের চেনা রূপ ফিরে পেয়েছেন ১৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড।
দুই বছর আগে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে রোনালদোর পর ব্রাজিলের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হয়েছিলেন। চওড়া ও শক্তিশালী গড়নের কারণে অনেকেই আবার তাঁকে রোমারিওর সঙ্গে তুলনা করেন। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে রোমারিও ৫ গোল করে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন, ফরোয়ার্ডও নিশ্চয়ই চাইবেন এবার সেই একই দেশে রোমারিওর সেই কীর্তি পুনরাবৃত্তি করতে।
লুইস সুয়ারেজ (কলম্বিয়া)
বয়স: ২৮
পজিশন: ফরোয়ার্ড
নামে মিল থাকলেই কি আর উরুগুইয়ান কিংবদন্তির মতো হওয়া যায়! তবে কলম্বিয়ান লুইস সুয়ারেজকে মাঠে দেখলে আপনার মনে হবে, শুধু নামে নয়, কাজেও তো তাঁর সেই কিংবদন্তির সঙ্গে মিল কম নয়! কলম্বিয়ার আক্রমণভাগের ব্যাটন এখন তাঁর হাতে। ২০২৫-২৬ মৌসুমটাও সুয়ারেজের কেটেছে স্বপ্নের মতো।
আর্সেনালে চলে যাওয়া ভিক্টর ইয়োকেরেসের বিকল্প হিসেবে স্পোর্টিং লিসবন বেছে নিয়েছিল তাঁকে। আর তিনি ক্লাবের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন ৩২ লিগ ম্যাচে ২৮ গোল ও ৭টি গোলে সহযোগিতা করে! জাতীয় দলের হয়ে ১০ ম্যাচে ৪ গোল করে তিনি ইতিমধ্যে জন ডুরানকে টপকে কোচের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছেন। এই দুর্দান্ত ফর্ম যদি বিশ্বকাপে ধরে রাখতে পারেন, তবে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ঘুম হারাম হতে বাধ্য।
দেজিরে দুয়ে (ফ্রান্স)
বয়স: ২০
পজিশন: অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার/উইঙ্গার
মাত্র ১৯ বছর বয়সে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে জোড়া গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন দেজিরে দুয়ে। ফরাসি ক্রীড়া দৈনিক লেকিপ তাঁকে ওই ম্যাচে ১০-এ ১০ রেটিং দিয়েছিল, যা তাদের ইতিহাসে মাত্র ১৮ জন খেলোয়াড় পেয়েছেন!
বল পায়ে আসার আগপর্যন্ত তাঁকে দেখে মনেই হয় না তিনি কতটা বিপজ্জনক, আর যখন বলটা তাঁর পায়ে পৌঁছায়, প্রতিপক্ষের জন্য ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে যায়! বিশ্বকাপে এমবাপ্পের ফিটনেস ধরে রাখতে কোচ দিদিয়ের দেশম হয়তো রোটেশন পলিসি ব্যবহার করবেন, আর সেখানেই বারকোলা বা শেরকির সঙ্গে শুরুর একাদশে থাকার লড়াইয়ে নামবেন দুয়ে।
লেখক: উপ–ক্রীড়া সম্পাদক, প্রথম আলো