হ্যাটট্রিকের পর রাফিনিয়ার উদ্‌যাপন
হ্যাটট্রিকের পর রাফিনিয়ার উদ্‌যাপন

রাফিনিয়া ‘দা লিমা’র টানা দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকে ‘পারফেক্ট’ বার্সা

সেভিয়া ১-৩ বার্সেলোনা

ক্যামেরাটা ধরতেই তিন আঙুলের ইশারায় রাফিনিয়াকে দেখিয়ে সব বুঝিয়ে দিলেন লামিনে ইয়ামাল। এতটা সাহায্যের অবশ্য দরকার ছিল না।

সানচেজ পিজুয়ান স্টেডিয়ামে ৪১ হাজার দর্শক থেকে বিশ্বের আনাচে কানাচে ম্যাচটি দেখা বাকিরাও তখন জানেন, হ্যাটট্রিকটি এ মুহূর্তে সম্ভবত বিশ্বের সেরা নয় নম্বরের!

অথচ বার্সায় রাইট উইং থেকে লেফট উইং ঘুরে চলতি মৌসুম থেকে দেখা যাচ্ছে স্ট্রাইকার রাফিনিয়াকে। শুধু দেখা যাচ্ছে কী, রীতিমতো চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে! সেভিয়ার বিপক্ষে বার্সার ৩-১ গোলের জয়ে ব্রাজিলিয়ান তারকার তিনটি গোলেই জাত স্ট্রাইকারের ছাপ। সেটাও এই প্রথম নয়।

রেসিংয়ের বিপক্ষে গত বুধবার রাতে বার্সার সর্বশেষ ম্যাচেও হ্যাটট্রিকে দেখা গেছে রাফিনিয়া ‘দা লিমা’কে! চার দিনের মধ্যে দুটো হ্যাটট্রিক করা রাফিনিয়াকে দেখা যেমন আনন্দের, তেমনি মৌসুমে প্রথম ৮ ম্যাচই জিতে ৩৬ গোল (লিগে ৩১) করে আন্তর্জাতিক বিরতিতে যাওয়া ‘পারফেক্ট’ বার্সাও।

যদিও সেভিয়ার মাঠে শুরুটা ভালো হয়নি। ১৯ মিনিটে হেডে ইউসুফ ফোফানার গোলে পিছিয়ে পড়তে হয়। রাফিনিয়ার তখনও ঘুম ভাঙেনি। মানে ম্যাচে তাঁকে সেভাবে দেখা যায়নি। সম্ভবত একটা ধাক্কা খাওয়ার দরকার ছিল, আর সেটা ছিল সেভিয়ার ওই গোল। এর তিন মিনিট পরই রাফিনিয়া ‘দা লিমা’র পায়ে ফুটল স্ট্রাইকারকের ‘ক্ল্যাসিক’ গোল। আন্দ্রেস ক্রিস্টেনসনের ডিফেন্সচেরা পাস ধরে এক পায়ের ইনসাইড ডজে প্রথমে ফেললেন সেভিয়া ডিফেন্ডারকে, তারপর গোলকিপারের উল্টো দিক দিয়ে স্নাইপারের নিশানায় ডান পায়ে লক্ষ্যভেদ; যেন প্রয়োজনের মুহূর্তে স্ট্রাইকার রাফিনিয়া জাগলেন!

রাফিনিয়া ও ইয়ামালের সেই চিরাচরিত উদ্‌যাপন। গোলের পর

বাকিটা সময় তাঁর ভেতরকার এই স্বত্ত্বাকে ধরে রাখতে হতো। সেই কাজটুকুর পুরোধা ছিলেন ইয়ামাল। ম্যাচে ৮ মিনিটে বল পোস্টে মারার আক্ষেপটুকু পুষিয়ে দেন ৫২ ও ৬৯ মিনিটে রাফিনিয়ার বাকি দুটোর উৎস হয়ে। এর মধ্যে প্রথমটিতে সেভিয়ার দুই ডিফেন্ডারকে নাচিয়ে দেওয়া ক্রসটি চামচে তুলে দেওয়া ‘রসগোল্লা।’ রাফিনিয়ার দারুণ টাইমিংয়ের হেড থেকে গোলে তার ‘স্বাদ’টা বোঝা গেল আরও ভালো।

কিন্তু বার্সার দারুণ খেলার আস্বাদ নেওয়ার তখনো বেশ কিছুটা বাকি। সেভিয়ার দুটি ভালো আক্রমণ ততক্ষণে ঠেকেছে বার্সার পোস্টে অভিষিক্ত দমিনিক লিভাকোভিচে। ওদিকে বার্সা খুঁজছিল সেভিয়ার রক্ষণ ভেঙে রাফিনিয়াকে দিয়ে হ্যাটট্রিক করানোর পথ।

৬৯ মিনিটে ইয়ামালের ডিফেন্স চেরা পাস সেই পথের দিশা। সেখান থেকে রাফিনিয়া ‘দা লিমা’র বাঁ পায়ের দারুণ চিপ। সেভিয়া গোলকিপার ভ্লাকোদিমিসকে ফাঁকি দিয়ে বলটা যেভাবে জালে পাঠালেন, তাতে মনে হলো এর চেয়ে সহজ কাজ আর নেই!

কিন্তু উইঙ্গার থেকে স্ট্রাইকার হয়ে যাওয়া যে সহজ কাজ নয়, সেটাও কারও অজানা না। এই রাফিনিয়াকে দেখে তা বিশ্বাস হয় না! মৌসুমের প্রথম ৮ ম্যাচেই ১৪ গোল, ৩ অ্যাসিস্ট। এর মধ্যে লিগে গোল ৭ ম্যাচে ১২টি। ন্যূনতম জোড়া গোল চার ম্যাচে। আর বিরতিতে যাওয়ার আগে করলেন ‘পারফেক্ট’ হ্যাটট্রিক। লা লিগায় লিওনেল মেসির ৩৬টি হ্যাটট্রিক থাকলেও ‘পারফেক্ট’ (বাঁ পা, ডান পা ও হেড) একটাও নেই। বার্সায় রাফিনিয়ার আগে সর্বশেষ এই হ্যাটট্রিক ২০১৫ সালে লুইস সুয়ারেজের।

কিছুদিন আগে রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে বলেছিলেন, দেম্বেলে ও রাফিনিয়ার চেয়ে তিনি বেশি গোল করেন। কিন্তু এ মৌসুমে ৮ গোল করা বিশ্বের অন্যতম সেরা এ গোলশিকারির চেয়ে রাফিনিয়ার গোল বেশি।  

স্পাইডারম্যানের মতো গোল উদ্‌যাপনও করেন রাফিনিয়া

শুধু কী তাই, লা লিগায় প্রথম ৭ ম্যাচে রাফিনিয়ার মতো এত ভালো শুরু বার্সার ইতিহাসে পেয়েছিলেন শুধু একজনই। সেটাও প্রায় ৮৩ বছর (১৯৪৩-৪৪) আগে মারিয়ানো মার্টিন। আর লা লিগার ইতিহাসেই প্রথম ৭ ম্যাচে তাঁর চেয়ে ভালো শুরু পেয়েছেন মাত্র দুজন। ১৯৪৩-৪৪ মৌসুমে ওভিয়েদোর এচেভেরিয়া (১৪ গোল) ও ২০১৪-১৫ মৌসুমে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (১৩ গোল)।

৭ ম্যাচে ২১ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবিলের শীর্ষে বার্সা। এক ম্যাচ কম খেলে দ্বিতীয় রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে ৬ পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে। বার্সার সমর্থকরা পয়েন্ট টেবিলের এই সন্তুষ্টি নিয়ে বিরতিতে যাওয়ার আগে চাইলে একটু পেছন ফিরে তাকাতে পারেন। গোল তো আছেই, এ মৌসুমে রাফিনিয়ার খেলা দেখে কি ব্রাজিলের সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকারের বক্সে চাতুরির ছিটে-ফোঁটা মনে পড়ে?

রোনালদো লুইস নাজারিও দা লিমা।

ঠিক ধরেছেন। এজন্যই গোলের পাশে লেখা রাফিনিয়া ‘দা লিমা।’