ডান প্রান্ত থেকে গোলমুখে বলটা তুলে দেন আলভারাদো। গোলের জন্য সেখানে ছুটে যান রাউল হিমিনেজ। মেক্সিকোর ৩৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড দারুণ এক হেডে গোল করে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোকে দ্বিতীয় গোল এনে দেন। ম্যাচের বয়স তখন ৬৭ মিনিট। গ্যালারিতে সবুজ জার্সি পরা সমর্থকেরা উল্লাসে মাতলেও সেই গোলের পর আবেগে কেঁদে ফেলেন ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপের ক্লাব উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সের ফরোয়ার্ড।
মেক্সিকোর জার্সিতে এই ম্যাচের আগে হিমিনেজ ১২৪ ম্যাচে পেয়েছেন ৪৫ গোল। কিন্তু বিশ্বকাপেই কোনো গোল ছিল না তাঁর। নিজের চতুর্থ বিশ্বকাপে অবশেষে পেলেন প্রথম গোল। শুধু এ কারণেই আবেগ তাঁকে ছুঁয়ে যেত। কিন্তু সদ্য বাবাকে হারানোর স্মৃতি আর নিজে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার স্মৃতিও তাঁকে আপ্লুত না করে পারেনি।
২০২০ সালের নভেম্বরে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে উলভারহ্যাম্পটনের হয়ে খেলার সময় আর্সেনালের এক ডিফেন্ডারের সঙ্গে মাথায় তীব্র আঘাত লাগে হিমিনেজের। তাঁর মাথার খুলি ফেটে যায় এবং শুরু হয় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। হিমিনেজ মাটিতে পড়ে পুরোপুরি অচেতন হয়ে যান। সতীর্থ এবং পরিবারের সদস্যরা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁরা জানতও না যে হিমিনেজ আদৌ বেঁচে আছেন কি না। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, তাঁর বেঁচে থাকাটাই ছিল একটা অলৌকিক ঘটনা।
সেই রাতেই তাঁর মাথায় জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর মাঠে ফিরে আসার সব শঙ্কা উড়িয়ে প্রায় ৮ মাস পর বিশেষ সুরক্ষামূলক হেডব্যান্ড পরে আবার মাঠে ফেরেন হিমিনেজ। শুধু তা–ই নয়, ২০২২ বিশ্বকাপেও গিয়েছিলেন। কিন্তু দলে ছিলেন শুধুই একজন বদলি খেলোয়াড় হিসেবে।
এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগে গত মার্চে তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে মারা যান। বাবা ছিলেন হিমিনেজের ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের ঠিক আগে প্রিয় বাবাকে হারানো তাঁর জন্য ছিল বিশাল মানসিক আঘাতও।
গতকাল রাতে মেক্সিকোর সিটির বিখ্যাত এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে সাতটি উদ্বোধনী ম্যাচ খেলে একটিও জিততে না পারা মেক্সিকো এবারই প্রথম জয় পেল। আর তাতে একটি দুর্দান্ত গোল করে হিমিনেজ রাখলেন বড় অবদান।
গোল করার পরপরই হিমিনেজ মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। আকাশের দিকে দুই হাত তুলে তাঁর এই উদ্যাপনে মিশে ছিল দুটি ভিন্ন অনুভূতি। একদিকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা, অন্যদিকে সদ্যপ্রয়াত প্রিয় বাবার প্রতি ভালোবাসা।
মেক্সিকো ম্যাচটি ২-০ গোলে জিতলেও এই জয় ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে হিমিনেজের জীবনযুদ্ধ। ফুরিয়ে গেছেন বলে অনেকে যাঁকে ধরে নিয়েছিলেন, দেশের মাটিতে বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনিই লিখলেন নিজের জীবনের রূপকথা।