মাঠে বল গড়ানোর আগে যখন জাতীয় সংগীত বাজে, প্রথা অনুযায়ী ফুটবলাররা তাতে কণ্ঠ মেলান। কিন্তু গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে এশিয়ান কাপের ম্যাচে ইরানের মেয়েরা যখন ঠোঁট মেলালেন না, সেই স্তব্ধতা আসলে হয়ে উঠল এক নীরব প্রতিবাদ। হাজার মাইলের দূরত্ব ঘুচিয়ে সেই প্রতিবাদ নাড়িয়ে দিয়েছে তেহরানের নীতিনির্ধারকদের থেকে শুরু করে ক্যানবেরার কূটনৈতিক পাড়াও।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক দুই দিন পর দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল ইরান। ম্যাচের আগে যখন ইরানের জাতীয় সংগীত বাজছিল, ফুটবলাররা তখন পাথরের মতো স্থির। ঠোঁট নড়েনি একজনেরও। অনেকেই মনে করছেন, এটি ইরানের বর্তমান শাসকদের বিরুদ্ধে নারী ফুটবল দলের প্রতিবাদ।
ওই একটি দৃশ্যই তাঁদের ঠেলে দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তার মুখে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি তাঁদের ‘যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক’ তকমা দেওয়া হয়েছে। আর এই তকমাই তাঁদের জীবনের ওপর ঝুলিয়ে দিয়েছে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
ইরানের প্রয়াত শাহের পুত্র রেজা পাহলভি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত। ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের সময় রাজতন্ত্রের পতনের পর থেকে ইরানে ফেরেননি পাহলভি। তিনি নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ইরান গঠনের সম্ভাব্য নেতা মনে করেন।
নারী ফুটবল দলের এ ঘটনার পর পাহলভি বলেছেন, এই মেয়েদের রক্ষা করার দায়িত্ব এখন অস্ট্রেলিয়ার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘ইরানের নারী ফুটবলাররা এখন প্রচণ্ড চাপের মুখে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পক্ষ থেকে তাঁদের প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি অস্ট্রেলিয়া সরকারকে আহ্বান জানাই, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হোক।’
এই লড়াইয়ে এবার শামিল হয়েছেন হ্যারি পটার স্রষ্টা জে কে রাউলিংও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি আকুতি জানিয়েছেন, ‘দয়া করে এই তরুণীদের রক্ষা করুন।’ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ক্যাম্পেইনার জাকি হায়দারি বলছেন আরও আশঙ্কার কথা। তাঁর কথা, ‘হয়তো এরই মধ্যে দেশে থাকা তাঁদের পরিবারগুলোকে হুমকি দেওয়া শুরু হয়েছে। যদি তাঁরা ফিরে যান, তবে তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটবে, তা কেউ জানে না।’
গতকালই নারী এশিয়ান কাপে নিজেদের শেষ ম্যাচটা খেলেছে ইরান। ফিলিপাইনের বিপক্ষে সেই ম্যাচের পর স্টেডিয়ামের বাইরে তৈরি হয়েছিল অভূতপূর্ব দৃশ্য। ড্রাম বাজিয়ে স্লোগান উঠেছিল—‘সেভ আওয়ার গার্লস’। অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ইরানি সমর্থকেরা নারী ফুটবলারদের বাসের চারপাশে ঘিরে ধরে দাবি তুলেছিলেন, তাঁদের যেন ইরানে ফেরত না পাঠানো হয়। আজ সকালে গোল্ড কোস্টে ইরানের টিম হোটেলের ব্যালকনিতে দেখা গেছে বিষণ্ন মুখগুলো। কারও কানে হেডফোন, কেউবা উদাস চোখে তাকিয়ে আছেন প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে।
ইরানের এই মেয়েদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হতে পারে কি না, এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি ক্যানবেরা থেকে। গতকাল বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং শুধু বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া ইরানের জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এখনই নিরাপত্তার স্বার্থে বিস্তারিত কিছু বলতে নারাজ। তবে জাকি হায়দারির মতে, কড়া নজরদারির মধ্যেও খেলোয়াড়দের সামনে হয়তো বিমানবন্দরে পৌঁছে আশ্রয় চাওয়ার জন্য খুব ছোট একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এএফপি জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় ইরানের দূতাবাস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।