কোটি কোটি ইউরোর তারকাদের পাওয়া যাচ্ছে বিনা মূল্যে

একসময় তাঁদের নাম উঠলেই দলবদলের বাজারে শুরু হয়ে যেত কাড়াকাড়ি। কেউ ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, কারও জন্য খরচ হয়েছে ১০ কোটি ইউরোর বেশি, কেউ আবার বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলে রাতারাতি বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ফুটবলারদের একজন হয়ে উঠেছিলেন।

আজ তাঁদের অনেকেই ক্লাবহীন। ফুটবলের ভাষায় ফ্রি এজেন্ট। সদ্য সমাপ্ত গ্রীষ্মকালীন ইউরোপীয় দলবদলের বাজারে তাঁদের কেউ ডাকেনি। বয়সের ভার, চোট, ফর্ম হারানো কিংবা শৃঙ্খলাজনিত সমস্যায় তাঁরা এখন ব্রাত্য, যেন ফুটবল মানচিত্রের বাইরের কেউ। ফ্রি এজেন্ট হওয়ায় তাঁদের জন্য ট্রান্সফার দিতে হবে না, দলে নেওয়া যাবে বিনা মূল্যে! শুধু বেতন–ভাতা ঠিকঠাক হলেই চলবে।

এ তালিকায় সবচেয়ে বড় নামগুলোর একটি করিম বেনজেমা। ৩৮ বছর বয়সী এই ফরাসি ফরোয়ার্ডের জীবনবৃত্তান্তে আছে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৬৪৮ ম্যাচে ৩৫৪ গোল, পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং ২০২২ সালে ব্যালন ডি’অর। একসময় বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকারদের আলোচনায় তিনি ছিলেন অন্যতম শীর্ষ নাম।

বেনজেমা এখন কোনো ক্লাবে চুক্তিবদ্ধ নন

সেই বেনজেমা সৌদি আরবের আল ইত্তিহাদে খেলার পর এবার আল হিলালও ছেড়েছেন। গত ৩১ আগস্ট চুক্তির মেয়াদ শেষে তাঁর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। সৌদিরই অন্য কোনো ক্লাবে যেতে পারেন বলে আলোচনা আছে, আবার গুঞ্জন আছে অবসরেরও। কিন্তু ৩৮ পেরোনো বেনজেমাকে নিয়ে বাজারের হিসাবও যে বদলে গেছে, সেটি তাঁর দলহীন হয়ে পড়াই বলে দিচ্ছে।

বয়সের ‘নির্মমতা’ আরও সত্য সের্হিও রামোসের ক্ষেত্রে। ৪০ বছর বয়সী স্প্যানিশ কিংবদন্তির ক্লাব ক্যারিয়ার রিয়াল মাদ্রিদ থেকে পিএসজি, সেভিয়া হয়ে মেক্সিকোর মন্তেরেতে পৌঁছেছে। সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডারদের একজন ধরা হয় তাঁকে। কিন্তু ফুটবল শেষ পর্যন্ত সময়কেই দাম দেয়। মন্তেরের পর রামোসও এখন নতুন গন্তব্য খুঁজছেন।

রিয়াদ মাহরেজের বয়স ৩৫। লেস্টার সিটির ২০১৬ সালের রূপকথার অন্যতম প্রধান চরিত্র তিনি। সেই মাহরেজ পরে ম্যানচেস্টার সিটিতে গিয়ে আরও চারটি প্রিমিয়ার লিগ জিতেছেন। ২০২৩ সালে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডে সৌদি ক্লাব আল আহলিতে যাওয়ার পরও তাঁকে নিয়ে আলোচনা থামেনি। কিন্তু এখন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তিনিও ফ্রি এজেন্ট।

সিটিকে বিদায় বলে আল আহলিতে গিয়েছিলেন রিয়াদ মাহরেজ

৩৯ বছর বয়সী জেমি ভার্ডির গল্পটা আরও ব্যতিক্রমী। ইংল্যান্ডের নিচের স্তরের ফুটবল থেকে উঠে এসে লেস্টারের হয়ে প্রিমিয়ার লিগ জিতেছিলেন। ২০১৬ সালের সেই অবিশ্বাস্য লেস্টার দলে মাহরেজ যেমন ছিলেন, ভার্ডিও ছিলেন তেমনি অপরিহার্য। লেস্টারে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে ২০২৫ সালে ইতালির ক্রেমোনেজে যান। এখন আবার নতুন ঠিকানা খুঁজছেন।

৩৪ বছর বয়সী ফিলিপে কুতিনিওর গল্পটা অবশ্য ভিন্ন। ২০১৮ সালে লিভারপুল থেকে তাঁকে দলে নিতে ১৬ কোটি খরচ করেছিল বার্সেলোনা। তখন কুতিনিও ইউরোপের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ফরোয়ার্ডদের একজন। কিন্তু খেই হারাতে সময় লাগেনি এই ব্রাজিলিয়ানের। ধারাবাহিক ইনজুরি, ফর্মের ওঠানামা এবং একের পর এক ক্লাব বদলে তিনি ধীরে ধীরে নিজের সেরা সময় থেকে দূরে সরে যান। ব্রাজিলে শৈশবের ক্লাব ভাস্কো দা গামায় দ্বিতীয় দফা খেলার পর এখন তিনি আবার ক্লাবহীন।

কুতিনিওর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট জ্যাডন সানচোর গল্পটি আরও অদ্ভুত। বয়স মাত্র ২৬। ২০২১ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থেকে তাঁকে কিনতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খরচ হয়েছিল প্রায় ৮৫ মিলিয়ন ইউরো। তার আগে ইউরোপের অন্যতম সেরা উইঙ্গার হিসেবে বিবেচিত হতেন তিনি।

কিন্তু ওল্ড ট্রাফোর্ডে এসে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন। ফর্ম হারিয়ে ধারেও যেতে হয়েছে। তাঁর পুরোনো ক্লাব ডর্টমুন্ড আবার তাঁকে ফেরানোর কথা ভাবছে বলে গুঞ্জন আছে। তবে এই মুহূর্তের বাস্তবতা, ২৫ পেরোতেই সানচোর ঠিকানা নেই।

জেডন সানচো এখন নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন

বিশ্বকাপের সেরা থেকে ক্লাবহীন

হামেস রদ্রিগেজের নামটি এই তালিকার সবচেয়ে বিস্ময়করগুলোর একটি। ২০১৪ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটজয়ী হামেস সেই আসরেই নিজেকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন বানিয়েছিলেন। কলম্বিয়ার হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর মোনাকো থেকে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ইউরোতে তাঁকে কিনেছিল রিয়াল মাদ্রিদ।

কিন্তু রিয়ালে সেই প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ হয়নি। বায়ার্ন মিউনিখে ধারে যাওয়া, তারপর এভারটন, আল রাইয়ান, অলিম্পিয়াকোস, সাও পাওলো, রায়ো ভায়েকানো, লিওঁ—একটি ক্লাব থেকে আরেকটিতে ঘুরেছে তাঁর ক্যারিয়ার। সর্বশেষ মেজর লিগ সকারের মিনেসোটা ইউনাইটেডও ছেড়েছেন।

অথচ এই হামেসই জুন–জুলাইয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে কলম্বিয়াকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। গড়েছেন কলম্বিয়ার পক্ষে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও। অর্থাৎ, জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা একজন ফুটবলারও একই সময়ে ক্লাবহীন থাকতে পারেন।

হামেস রদ্রিগেজ কিছুদিন আগে ফিফা বিশ্বকাপে খেলেছেন

তালিকায় হামেসের পাশাপাশি ডেভিড আলাবাও আছেন, যিনি অস্ট্রিয়ার অধিনায়ক হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপ খেলেছেন। ১২টি লিগ শিরোপা ও চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী এই ডিফেন্ডারের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা ইনজুরি ও ফিটনেস। বয়স তাঁর ৩৪ হলেও দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যার কারণে ক্লাবগুলো এখন স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক।

পগবা-স্টার্লিংদের হারিয়ে যাওয়া

পল পগবার গল্পে বয়সের চেয়ে বড় হয়ে এসেছে ক্যারিয়ারের নানা জটিলতা। ৩৩ বছর বয়সী ফরাসি মিডফিল্ডার একসময় বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার ছিলেন। ২০১২ সালে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছেড়ে জুভেন্টাসে যাওয়ার পর তিনি দ্রুতই বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডারদের একজন হয়ে ওঠেন।

চার বছর পর ইউনাইটেড তাঁকেই ফিরিয়ে আনতে খরচ করেছিল সে সময়ের বিশ্ব রেকর্ড ১০৫ মিলিয়ন ইউরো। কিন্তু ইনজুরি ও ফর্মের ওঠানামা তাঁর ক্যারিয়ারকে বাধাগ্রস্ত করেছে। পরে ডোপিংয়ের ঘটনায় চার বছরের নিষেধাজ্ঞা পান পগবা, যা আপিলে কমে ১৮ মাস হয়। নিষেধাজ্ঞা শেষে মোনাকোতে যোগ দিলেও সেখানে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি তাঁর অধ্যায়। একসময় বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার আজ ফ্রি এজেন্ট।

পল পগবারও এখন কোনো ক্লাব নেই

৩১ বছর বয়সী রাহিম স্টার্লিংয়ের ক্যারিয়ারও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বদলে গেছে। লিভারপুল, ম্যানচেস্টার সিটি, চেলসি ও আর্সেনাল—ইংল্যান্ডের চার বড় ক্লাবের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। ছিলেন ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম সেরা উইঙ্গারদের একজন।
কিন্তু কয়েক বছর ধরে তাঁর ক্যারিয়ারে ভাটার টান। গত মৌসুমে ফেইনুর্ডে ধারে গিয়ে মাত্র আট ম্যাচ খেলেছেন। মাঠের বাইরের সমস্যাও তাঁর ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। গত মাসে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো এবং নাইট্রাস অক্সাইড রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

আরও যাঁরা

ফ্রি এজেন্ট হয়ে যাওয়ার এই তালিকায় আরও আছেন জর্জিনিও ওয়াইনালডাম, উইলফ্রিড জাহা, অ্যান্থনি মার্শাল, দেলে আলি, ওলেক্সান্দর জিনচেঙ্কো, ইসমাইল বেনাসের, টাইরেল মালাসিয়া ও কনর কোডির মতো পরিচিত নামও। সব মিলিয়ে বিশ্ব ফুটবলে পরিচিত মুখগুলোর মধ্যে ফ্রি এজেন্ট খেলোয়াড়ের সংখ্যাটা বেশ বড়ই।

যা বলে দেয়, একদিন যাঁদের নিয়ে কাড়াকাড়ি ছিল, সময়ের ফেরে সেই ফুটবলাররাই ট্রান্সফার ফি ছাড়াই নতুন ক্লাবে যাওয়ার জন্য ফোনের অপেক্ষায় থাকেন।