ফর্টিসের দুই নেপালি ফুটবলার আরিক বিস্তা ও অনন্ত তামাং
ফর্টিসের দুই নেপালি ফুটবলার আরিক বিস্তা ও অনন্ত তামাং

ঘরোয়া ফুটবল

রুটিরুজির টানে বাংলাদেশে নেপালের তারকারা

রাজধানীর ১০০ ফিট ধরে খানিকটা এগোলেই বেরাইদে ফর্টিস এফসির তিনতলা ক্লাব ভবন। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। সেখানেই দেখা মেলে আরিক বিস্তা, অনন্ত তামাংয়ের। দুজনই নেপাল জাতীয় দলের তারকা ফুটবলার। নিজ দেশে ঘরোয়া খেলা নেই, ফিফার নিষেধাজ্ঞায় ফুটবল থমকে গেছে। অগত্যা রুটিরুজির তাগিদে আবারও বাংলাদেশে এসেছেন দুই ফুটবলার।

বাংলাদেশের লিগে নেপালিদের খেলার ঐতিহাসিক এক প্রেক্ষাপট আছে। আশির দশকের শুরুতে গণেশ থাপা মোহামেডানে যোগ দিয়েছিলেন। বেশ কয় বছর সাদা–কালোয় খেলার পাশাপাশি আবাহনী, ওয়ান্ডারার্স ও রহমতগঞ্জের জার্সিও গায়ে জড়িয়েছেন। বাংলাদেশে খেলেই নেপালের ফুটবলে বড় তারকা হয়ে ওঠেন গণেশ। পরে হরি খাড়কা, বালগোপাল মহারজনসহ অনেকে এসেছেন, তবে তাঁরা সবাই খেলেছেন বিদেশি কোটায়। গত মৌসুম থেকে বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে প্রবর্তিত হয় সাফ কোটা। প্রথমবার আসা ১১ জনের ৮ জনই ছিলেন নেপালের। এবারও ১৯ জনের ১৪ জনই হিমালয়ের দেশটির।

এই ১৪ জনের ৮-৯ জনই আবার নেপাল জাতীয় দলের খেলোয়াড়। ২৬ বছর বয়সী মিডফিল্ডার আরিক বিস্তা গত মৌসুমে ব্রাদার্সে খেলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা সেন্টারব্যাক ২৮ বছরের অনন্ত তামাং ফর্টিসেই ছিলেন। এবার বসুন্ধরা কিংসে আসছেন নেপাল জাতীয় দলের তারকা মিডফিল্ডার রহিত চাঁদ, ফরোয়ার্ড মানিশ ঢাঙ্গি ও অঞ্জন বিস্তা।

এত নেপালি ফুটবলার বাংলাদেশে আসার কথা বলতে গিয়ে আরিক নিজ দেশের ফুটবলের ভঙ্গুর অবস্থাকেই তুলে আনেন, ‘নেপালি ফুটবলারদের মান ভালো। ফলে বাংলাদেশি ক্লাবগুলো নেপালিদের প্রতি আস্থা রাখছে। নেপালে লিগ হচ্ছে না নিয়মিত। তিন বছর ধরে আমাদের ওখানে শীর্ষ লিগ নেই। তাই সুযোগ পেলে নেপালের ফুটবলাররা বাংলাদেশে আসছে।’

বন্যা-ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নেপালের অবস্থা বিপর্যপ্ত। দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলও সংকটে। ২০১৫ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে টানা ৩ বছর শীর্ষ লিগ বন্ধ ছিল। গত ১১ বছরে সেই লিগ হয়েছে মাত্র চারবার। শীর্ষ পর্যায়ের ‘মার্টার্স মেমোরিয়াল এ-ডিভিশন লিগ’ সর্বশেষ হয়েছে ২০২৩ সালে। মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত তিন মাসের সিঙ্গেল লিগে খেলেছে ১৪টি ক্লাব।

এ-ডিভিশন মাঠে ফেরানো যাচ্ছে না দেখে অল নেপাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আনফা) পুরোনো জাতীয় লিগ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। শীর্ষ লিগের ১৩টিসহ ১৭টি ক্লাব নিয়ে এ বছর জানুয়ারিতে সিঙ্গেল লিগ–ভিত্তিতে লিগ শুরু হলেও মার্চে তা স্থগিত করে দেওয়া হয়। বেশ কিছু ক্লাব কোনো বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই বিদেশি খেলোয়াড় মাঠে নামিয়েছিল, যা আইনগত জটিলতা তৈরি করে। খেলোয়াড়েরা পড়েন আর্থিক ক্ষতির মুখে।

বাংলাদেশের ক্লাবে নেপালি ফুটবলাররা মাসে দেড় থেকে আড়াই হাজার ডলার বেতন পান। তাতে আরিকের জীবনে স্বস্তি এসেছে।

এমনিতেই নেপালের শীর্ষ লিগের ফুটবলাররাও পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তার ওপর এখন তো খেলাই বন্ধ। খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধার দাবিতে আন্দোলন হলেও আনফা কোনো সমাধান দিতে পারেনি। উল্টো আনফার শীর্ষ কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন, বিদেশে চলে যাওয়া খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। বিমানবন্দরে গিয়ে তাঁদের আটকে রাখা সম্ভব নয়।

ঘরোয়া লিগ নিয়ে অনিশ্চতায় নেপালি ফুটবলারদের অনেকেই পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে। জাতীয় দলের নিয়মিত ডিফেন্ডার দীনেশ রাজবংশী, সুমন আরিয়াল, মিডফিল্ডার তেজ তামাং, আশিষ লামাসহ অনেক তারকা অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেছেন। গত কয়েক বছরে দেশছাড়া ফুটবলারের সংখ্যাটা ৪০-৫০ জনের মতো।

কঠিন পরিস্থিতিতে বাফুফে ও বাংলাদেশের ক্লাবগুলো নেপালিদের জন্য রুটিরুজির নতুন পথ খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা আরিকের কণ্ঠে, ‘আমাদের জন্য একটা সুযোগ বাংলাদেশে খেলা। এখানে নেপালি ফুটবলারদের জন্য বেতন বেশ ভালো, সেটাও ডলারে। এটা স্বস্তিকর আমাদের জন্য।’

বাংলাদেশের ক্লাবে নেপালি ফুটবলাররা মাসে দেড় থেকে আড়াই হাজার ডলার বেতন পান। তাতে আরিকের জীবনে স্বস্তি এসেছে। ২০২০ সালে ঢাকায় ফিফা প্রীতি ম্যাচে নেপাল জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া আরিক জানান, আনফার অধীনে খেলা স্থবির হলেও গ্রামগঞ্জে প্রচুর ম্যাচ হয়। নেপালে অনেক ফুটবলার খেপ খেলেন। ওখান থেকে যা পান, তা দিয়েই চলেন ফুটবলাররা।

বাংলাদেশি লিগের মান ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আরিক বেশ খুশি, ‘বাংলাদেশে ঘরোয়া মৌসুম আট-নয় মাসব্যাপী হয়। নেপালে শুধু সিঙ্গেল লিগ হয়। এ দেশে ছয়-সাতটি মাঠে খেলা হয়। নেপালে ভেন্যু মাত্র তিনটি—দশরথ ও আনফা কমপ্লেক্স যার অন্যতম। নেপালে সাধারণত আফ্রিকান ফুটবলার আনে ক্লাবগুলো। এখানে ব্রাজিলিয়ানসহ নানা দেশের ফুটবলার আসে, বিশ্বকাপে খেলা ফুটবলারও আসছে। লিগের মান ভালো হওয়ায় নেপালিরা আসতে চায়, শিখতে চায়।’

আনফার কার্যক্রমে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের অভিযোগে গত জুনে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নেপালকে নিষিদ্ধ করে ফিফা। নভেম্বরে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে তাই নেপালের খেলা অনিশ্চিত। নেপালকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সাফে খেলা নিশ্চিত করতে সময় বেঁধে দিয়েছে সাফ কর্তৃপক্ষ।

প্রতিবেশী দেশগুলো যখন আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রস্তুতি নিচ্ছে, নেপালের ফুটবলাররা তা দেখছেন অসহায় বসে। ব্যথিত কণ্ঠে আরিক বলছিলেন, ‘বাংলাদেশসহ সব দেশ ফিফা আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখছি। এটা ভীষণ বেদনার। নেপালের ফুটবলে সামনে কী হবে, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

জাতীয় দলের হয়ে ৭২টি ম্যাচ খেলা অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার অনন্ত তামাংও হতাশ, ‘আমরা সাফ খেলতে পারব কি না, ফিফার নিষেধাজ্ঞা উঠবে কি না, কিছুই জানি না। এ অবস্থায় জীবন-জীবিকার টানে বাংলাদেশে খেলার সুযোগ পাওয়া বড় স্বস্তি।’

নিজ দেশে যখন ফুটবলের আলো নিভে আসছে, তখন বাংলাদেশই যেন হিমালয়ের তারকাদের ক্যারিয়ার বাঁচানোর বড় আশ্রয়।