আর্জেন্টিনা ৭-০ বুরকিনা ফাসো
প্রথমার্ধ শেষে মনুমেন্তালের টানেলে ঢুকছিল আর্জেন্টিনা দল। প্রীতি ম্যাচ বলেই তখন এমিলিয়ানো মার্তিনেজদের ডেকে কথাটা বলতে পারতেন দু-একজন সমর্থক। এ ম্যাচ এখানেই শেষ। প্রথমার্ধেই ৫-০ গোলে এগিয়ে গেলে দ্বিতীয়ার্ধে আর খেলে কী হবে!
তবু খেলতে হলো, কিংবা ফুটবলের নিয়ম মেনে দুই দলই খেলল। প্রীতি ম্যাচের নামে বুরকিনা ফাসোকে ডেকে এনে লজ্জায় ফেলে দেওয়া আর্জেন্টিনা এই অর্ধে তার ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে কিপটেমি করল আতিথেয়তায়। দ্বিতীয়ার্ধে আফ্রিকার দলটি হজম করেছে যে মাত্র দুই গোল।
আর্জেন্টিনার ৭-০ গোলের এই জয়ে বিস্ময় না জাগলেও একটু খটকা তো লাগতেই পারে। প্রথমার্ধেই বুরকিনা ফাসোর পোস্টে ১১ শট আর্জেন্টিনার, আর এই ‘প্রীতি’র বিনিময়ে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৬২তম দলটি একটি শটও নিতে পারেনি। নেই কোনো কর্নারও। আর্জেন্টিনার বল দখলের হার ৮০ শতাংশের কাছাকাছি! পরের অর্ধে বুরকিনা ফাসো একটি শট নিতে পারলেও সেটায় হাতে ধরে ধন্যবাদ জানাতে পারেন আর্জেন্টিনার গোলকিপার মার্তিনেজ। তাঁর একটু নড়াচড়া তো হয়েছে!
কিন্তু সাইক্লিং দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলেও বুরকিনা ফাসো ফুটবল দলের তো এতটা নরম হওয়ার কথা নয়! ১৯৯৮ আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে সেমিফাইনাল এবং ২০১৩ সালে এই আসরে ফাইনালে খেলা দল। তাহলে!
ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে জানা গেছে, মরক্বো থেকে প্রথম চার্টার ফ্লাইট বাতিল হওয়ার খবরটি বুরকিনা ফাসো জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা বিমানবন্দরে গিয়ে পান। তাঁদের আর্জেন্টিনায় উড়াল দেওয়ার ব্যবস্থাপনায় থাকা প্রতিষ্ঠানটিও চুক্তি বাতিল করতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাড়াহুড়া করে পরবর্তী ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে করতে ম্যাচটি খেলতে বেঁকে বসেন জাতীয় দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়। বুরকিনা ফাসোর সংবাদমাধ্যম বুরকিনা ২৪ জানায়, কোচ আমির আব্দোউ বাধ্য হয়েই অনূর্ধ্ব-২৩ দলের খেলোয়াড়দের ডাকেন। মূল জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে শুধু মিডফিল্ডার চেক বেবেল দৌউম্বিয়াকে পেয়েছেন বুরকিনা ফাসো কোচ। মাঠে নামা দলটিকে তাই পুরোপুরি বুরকিনা ফাসো অনূর্ধ্ব-২৩ দল বলা যাচ্ছে না। কারণ, চেক বেবেল খেলেছেন।
কাসাব্লাঙ্কা থেকে রওনা হয়ে বুরকিনা ফাসো ফুটবল দল আর্জেন্টিনার মাটিতে পা রাখে এই ম্যাচ শুরুর ৫ ঘণ্টা ১৫ মিনিট আগে। এয়ারবাস এ৩৩০-২০৩ মডেলের বিমানে ৯ হাজার ২৩১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছে ১১ ঘণ্টা ৪২ মিনিট। জেট ল্যাগ কাটানোর সময় পাবে কী, বিমানবন্দর থেকেই খেলার সরঞ্জাম মাঠে পাঠিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হোটেলে যায় তারা। এরপর মাঠে নেমে সর্বশেষ বিশ্বকাপে রানার্সআপ দলের কাছে গোলের মালা পরাই তো স্বাভাবিক।
গোল করে সেই মালা গেঁথেছেন লাওতারো মার্তিনেজ, জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি, নিকো পাজ, হুলিয়ান আলভারেজ, বদলি নামা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো ও জুলিয়ানো সিমিওনে। হিসাব কি মিলল?
ওহ হ্যাঁ, সম্ভবত গোলের পর গোলের আতিথেয়তার চাপেই একটু বিনয়ী হয়ে উঠতে বুরকিনা ফাসো আত্মঘাতী গোল করে বসে ৮ মিনিটে! শেষ বাঁশি বাজার পর দুই দলের খেলোয়াড়দের হাত ও বুক মেলানোর দৃশ্যে অবশ্য বোঝা গেল না, ম্যাচটা একদমই একপেশে ছিল। এত ঝামেলা সয়ে বুরকিনা ফাসো শেষ পর্যন্ত খেলতে আসায় ম্যাচের শুরুতে ধন্যবাদসূচক করতালিও পেয়েছে গ্যালারি থেকে।
তবে বুরকিনা ফাসোর প্রায় সব খেলোয়াড়ই বয়সভিত্তিক দলের হওয়ায় একটু তুকতাকে বিশ্বাসী আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মনে কুডাক দেওয়ার কথা। জাতীয় দল পর্যায়ে এটা প্রথম মুখোমুখি হলেও বয়সভিত্তিক পর্যায়ে আফ্রিকান দলটির মুখোমুখি হয়ে আর্জেন্টিার অভিজ্ঞতা ভালো না। ২০০১ অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে দুবার মুখোমুখি হয়ে একবার (২-২) ড্র ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হারতে হয় ২-০ গোলে।
মনুমেন্তালে অবশ্য সেই সুযোগ ছিল না। ৩৬ মিনিটের মধ্যে ৪-০ করে ফেলে আর্জেন্টিনা। চার মিনিটে পেনাল্টি থেকে মার্তিনেজের গোলে শুরু। এর চার মিনিট পর মাউমানি দিয়ালোর আত্মঘাতী গোল। ১২ মিনিটে প্রেস্তিয়ান্নি, ৩৫ মিনিটে পাজ ও ৩৬ মিনিটে আলভারেজের গোলে একটি ব্যাপার খুবই ‘কমন’। ধারাবাহিকভাবে বুরকিনা ফাসোর বক্সে ক্রস ফেলা কিংবা ‘মন চায় যখন খুশি ঢুকে পড়া’র পুরস্কার পেয়েছে তারা। পাজের গোলে অবশ্য বরাবরের মতোই মুনশিয়ানা ছিল। বলিভিয়ার পর এই দ্বিতীয় প্রীতি ম্যাচেও দারুণ গোল করলেন আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ ১০ নম্বর। আর আলভারেজের গোলে ফুটেছে স্বস্তি। মৌসুমে তাঁর প্রথম গোল! দুই হাত ওপরে তুলে উদ্যাপনে স্মরণ করিয়েছেন লিওনেল মেসিকে।
শুধু প্রীতি ম্যাচ বলেই নয়। মেসি-পরবর্তী যুগের শুরুতে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিকে ভবিষ্যতও বাজিয়ে দেখতে হবে। সে জন্যই সম্ভবত মূল একাদশের সবাইকেই ধারাবাহিকভাবে তুলে বদলি নামান স্কালোনি। আলভারেজের বদলি মাস্তানতুয়োনো ও গিয়াইয়ের বদলি সিমিওনে গোল পান ৫৭ ও ৯০+৩ মিনিটে।
আর্জেন্টিনায় স্কালোনি যুগে এটি যৌথভাবে সবচেয়ে বড় জয়। ২০২৩ সালে কুরাসাওয়ের বিপক্ষেও স্কালোনির দলের জয়ের ব্যবধান একই ছিল।
রূপক অর্থে শক্তিতে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে এই জয়ে আর্জেন্টিনার স্বস্তির জায়গাও আছে। আর্জেন্টিনা এবারের আন্তর্জাতিক বিরতিতে শেষ প্রীতি ম্যাচটি খেলবে আগামী বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় বেনিনের বিপক্ষে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে এটাই হবে মেসির শেষ ম্যাচ। তার আগে এ দুটি (বলিভিয়ার বিপক্ষে ৪-০) প্রীতি ম্যাচে মোট ১১ গোল করে স্কালোনি অন্তত মেসিকে আশস্ত করতে পারলেন, তাঁকে ছাড়া ভবিষ্যৎ খুব একটা খারাপ নয়!