কানাডার টরন্টোতে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করছেন শিল্পী ইলিয়ানা ও জেসি রেয়েজ। ১২ জুন স্বাগতিক কানাডা ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার ম্যাচের আগে এই জমকালো অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়
কানাডার টরন্টোতে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করছেন শিল্পী ইলিয়ানা ও জেসি রেয়েজ। ১২ জুন স্বাগতিক কানাডা ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার ম্যাচের আগে এই জমকালো অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়

বিশ্বকাপ ২০২৬: ‘বিউটিফুল গেম’ যেভাবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে গেল

ফুটবলকে বলা হয় ‘বিউটিফুল গেম’ বা সুন্দরতম খেলা। ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে কথাটি বলেছিলেন মূলত ফুটবলের সারল্য, সর্বজনীন আবেদন আর শৈল্পিক ছন্দের কারণে। এটি এমন এক খেলা, যেখানে কোনো আভিজাত্যের দেয়াল নেই, নেই কোনো ধনী-গরিবের বিভেদ।

কিন্তু এবার উত্তর আমেরিকায় (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) ফিফা বিশ্বকাপের যে চিত্র সামনে আসছে, তাতে এই মহাযজ্ঞে সাধারণ মানুষের জায়গা কতটা, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ৪৩ দিনব্যাপী এবারের বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ। ১৬টি স্টেডিয়ামে মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু মাঠের উত্তেজনার আড়ালে লুকিয়ে আছে আকাশছোঁয়া ব্যয়ের পাহাড়। সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত ফুটবল–ভক্তদের জন্য যেন এক ‘অসম্ভব মিশন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে খরুচে এক আসর।

টিকিটের বাজারে আগুন

খেলার মূল আকর্ষণ হলো গ্যালারিতে বসে প্রিয় দলের লড়াই দেখা। কিন্তু সেই গ্যালারিতে বসার সামর্থ্য এখন কয়জনের আছে? ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে কাতার বিশ্বকাপ পর্যন্ত টিকিটের দাম যে হারে বেড়েছে, ২০২৬ সালে তা রূপ নিয়েছে মহাবিস্ফোরণে।

বিজনেস ইনসাইডারের প্রতিবেদক পিট সাইম দেখিয়েছেন, ১৯৯৮ সালে একটি ফাইনাল ম্যাচের ‘ক্যাটাগরি-১’ টিকিটের গড় দাম ছিল মাত্র কয়েক শ ডলার। অথচ ২০২৬ সালে সেই টিকিটের গড় দাম গিয়ে ঠেকেছে ১০ হাজার ৯৯০ ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১৩ লাখ টাকার কাছাকাছি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো টিকিটের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি। ফিফা এবার প্রথমবারের মতো ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ বা পরিবর্তনশীল মূল্যপদ্ধতি চালু করেছে। এটি অনেকটা রাইড শেয়ারিং অ্যাপ উবার বা পাঠাওয়ের মতো। যখন চাহিদা বাড়ে, তখন টিকিটের দামও হু হু করে বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

তথ্য বলছে, ফাইনালের একটি টিকিটের প্রাথমিক দাম ৬ হাজার ৪০০ ডলার থেকে শুরু হয়ে মুহূর্তের মধ্যে ৮ হাজার ৭০০ ডলার এবং শেষ ধাপে ১১ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি ফিফার অফিশিয়াল রিসেল প্ল্যাটফর্মে কিছু টিকিটের দাম ৩ লাখ ৪৫ হাজার ডলার বা প্রায় ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত হাঁকানোর ঘটনাও দেখা গেছে।

স্টেডিয়ামের ওপর দিয়ে কানাডীয় বিমানবাহিনীর বিশেষ মহড়া ‘স্নো বার্ডস’-এর ওড়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

আর্জেন্টিনার ভক্তদের চ্যালেঞ্জ

বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়ক লিওনেল মেসির জন্য এই আসরটি হবে সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ। ফলে বিশ্বজুড়ে ‘আকাশি-সাদা’–সমর্থকদের মধ্যে উন্মাদনা চরমে। কিন্তু এই ভালোবাসার মূল্য দিতে গিয়ে একজন ভক্তকে হতে হচ্ছে নিঃস্ব।

বিজনেস ইনসাইডারের তথ্য অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেস থেকে একজন ভক্ত যদি তাঁর প্রিয় দলকে গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল পর্যন্ত অনুসরণ করতে চান, তবে তাঁর ন্যূনতম খরচ হবে ৩১ হাজার ২৪৭ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৭ লাখ টাকা)। এই হিসাবের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি মহাদেশীয় ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট, পাঁচ সপ্তাহের হোটেলভাড়া, ম্যাচের টিকিট ও স্থানীয় যাতায়াত খরচ।

এখানেই শেষ নয়, এই খরচের তীব্রতা বোঝা যায়, যখন একে একটি দেশের মানুষের গড় আয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। আর্জেন্টিনার একজন মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু আয় মাত্র ১৪ হাজার ৩০০ ডলার। অর্থাৎ প্রিয় দলের খেলা মাঠে বসে দেখার জন্য একজন আর্জেন্টাইনকে তাঁর জীবনের দুই বছরেরও বেশি সময়ের পুরো আয় ব্যয় করতে হবে। প্রশ্ন হলো, এটি কি আসলেই কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব?

স্টেডিয়ামে পৌঁছাতেই পকেট ফাঁকা

বিশ্বকাপ টিকিটের আকাশচুম্বী দামের পাশাপাশি আয়োজক শহরগুলোয় স্থানীয় যাতায়াত ব্যয় এখন ভক্তদের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যালারিতে পৌঁছানোর এই অতিরিক্ত খরচকে অনেক বিশ্লেষক ‘ভাড়ার সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজক শহরগুলোয় স্থানীয় পরিবহনভাড়া অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। নিউ জার্সিতে পেন স্টেশন থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত ফিরতি ট্রেনের টিকিট যেখানে স্বাভাবিক সময়ে ১২ ডলার ৯০ সেন্ট, বিশ্বকাপের ম্যাচের দিন তা বাড়িয়ে ৯৮ ডলার করা হয়েছে। একইভাবে বোস্টনে ২০ ডলারের রেল টিকিট চার গুণ বাড়িয়ে ৮০ ডলার করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে মায়ামিতে। সেখানে দ্রুতগতির ট্রেন ‘ব্রাইটলাইন’-এর ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ১৪১ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় যাতায়াত কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট শহরগুলোর দাবি, বিপুল জনস্রোত সামাল দেওয়া এবং বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই বর্ধিত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

তবে সাধারণ সমর্থকদের কাছে এটি স্রেফ সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়িক নীতি। একদিকে ফিফা এই টুর্নামেন্ট থেকে রেকর্ড ১৩ বিলিয়ন ডলার মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে, অন্যদিকে স্টেডিয়ামে পৌঁছাতেই একজন ভক্তের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে।

মেসিকে একবার সামনাসামনি দেখার মূল্য

মণিপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের ফুটবল–ভক্ত ৪০ বছর বয়সী ওরচিহান জিংখাইয়ের গল্পটি যেন বিশ্বের কোটি কোটি নিম্নবিত্ত মানুষের প্রতিনিধি। জিংখাই প্রতিদিন মাত্র ৫০০ রুপি (প্রায় ৬ ডলার) আয় করেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল লিওনেল মেসিকে একবার সামনাসামনি মাঠে দৌড়াতে দেখা। কিন্তু একটি সাধারণ টিকিটের দামই এখন তাঁর এক বছরের আয়ের সমান।

জিংখাই আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি কয়েক বছর ধরে টাকা জমাচ্ছিলাম একটি ল্যাপটপ কেনার জন্য। কিন্তু বিশ্বকাপের টিকিটের দাম দেখে আমার সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে।’ পরিসংখ্যান বলছে, হাইতির একজন নাগরিকের জন্য বিশ্বকাপের একটি সস্তা টিকিট কিনতে তাঁর বার্ষিক আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ খরচ করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসের বলপার্ক ভিলেজে বড় পর্দায় প্রিয় দলের খেলা দেখছেন বসনিয়া-হার্জেগোভিনার সমর্থকেরা। জয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েও পয়েন্ট হারানোর পর তাঁদের বিষাদমাখা প্রতিক্রিয়া

বর্ণবাদের ছায়া

এবারের বিশ্বকাপ কেবল অর্থনৈতিক কারণেই নয়; বরং রাজনৈতিক কারণেও চরম বিতর্কিত। জেরেমি করবিন দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত তাঁর এক নিবন্ধে একে ‘ট্রাম্পময় বিশ্বকাপ’ বলে অভিহিত করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ৩৯টি দেশের হাজার হাজার ভক্ত এবার খেলা দেখতে আসতে পারছেন না। ইরান, সোমালিয়া বা হাইতির ভক্তদের জন্য ভিসা পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব।

সবচেয়ে বড় কলঙ্কজনক অধ্যায়টি তৈরি হয়েছে সোমালিয়ার রেফারি ওমার আরতানকে নিয়ে। ফিফা স্বীকৃত এবং আফ্রিকার বর্ষসেরা এই রেফারিকে মায়ামি বিমানবন্দরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁর বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদের যোগসাজশ’-এর হাস্যকর অভিযোগ তোলা হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এটি সরাসরি বর্ণবাদ। করবিন প্রশ্ন তুলেছেন, কাতার বিশ্বকাপের সময় যাঁরা মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন, তাঁরা এখন আমেরিকার এই বৈষম্যমূলক আচরণে চুপ কেন?

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম্পকে ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ দেওয়া হয়েছিল, কারণ, ফুটবল বিশ্বকে এক করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ফুটবল এখন বিশ্বকে বিভক্ত করছে।

এই বিশ্বকাপ চক্র থেকে ফিফার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা)। এটি হবে ফিফার ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক টুর্নামেন্ট।

কিন্তু এই অতি বাণিজ্যিকীকরণের প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপর। বিশাল দূরত্ব এবং ১৬টি শহরের মধ্যে ক্রমাগত আকাশপথের ভ্রমণের কারণে ২০২৬ বিশ্বকাপে কার্বন নিঃসরণ হবে প্রায় ৭ দশমিক ৮০ মিলিয়ন টন, যা কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এর ৮৭ শতাংশ নিঃসরণই হবে দর্শকদের বিমান ভ্রমণের কারণে।

‘স্পোর্টস প্রিমিয়ামাইজেশন’

এমআইটি স্লোন স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের শিক্ষক বেন শিল্ডস এই পরিস্থিতিকে বলছেন ‘স্পোর্টস প্রিমিয়ামাইজেশন’। অর্থাৎ খেলাকে এখন এমনভাবে প্যাকেজিং করা হচ্ছে, যাতে তা কেবল উচ্চবিত্তের ‘ভিআইপি’ অভিজ্ঞতা হিসেবে টিকে থাকে। গ্যালারিতে বসা সাধারণ মানুষগুলোর জায়গা দখল করে নিচ্ছে করপোরেট স্পনসর আর ধনকুবেররা।

২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলকে বিশ্বজনীন করার যে ‘কৃত্রিম’ স্বপ্ন ফিফা দেখাচ্ছে, তার নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের হাহাকার। মাঠের বাইরের এই টিকিটের লড়াই, ভিসার জটিলতা, বর্ণবাদ আর ভাড়ার দাপট যেন ফুটবলকে তার আদি ও অকৃত্রিম আত্মা থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।

একটি দেশের একজন সাধারণ মানুষকে যখন তাঁর প্রিয় খেলোয়াড়কে দেখার জন্য তাঁর কয়েক বছরের সমপরিমাণ আয় বা দীর্ঘদিনের জমানো সঞ্চয় উজাড় করে দিতে হয়...যখন একজন রেফারিকে বর্ণবাদের কারণে আটকানো হয়, তখন সেই খেলা আর ‘বিউটিফুল গেম’ থাকে না।

২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো রেকর্ডভাঙা মুনাফা করবে, কিন্তু ফুটবলের যে ‘গণতিলক’ কপালে ছিল, তা কি এই ডলারের পাহাড়ে হারিয়ে যাবে না? সময়ের কাছেই এর উত্তর তোলা থাকল।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, বিজনেস ইনসাইডার, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ফিফা