ছেলে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিল কাতারে। রোসা গঞ্জালেস তখন থেকেই আর সাধারণ মা রইলেন না। হয়ে গেলেন বিশ্বকাপজয়ী সন্তানের মা!
সেই মুহূর্ত কিংবা তারও একটু আগে থেকে জীবনটা বদলাতে শুরু করেছিল রোসার। এখন তো পুরোই পাল্টে গেছে। কর্দোবায় বাংলাদেশ সময় আজ সকাল ছয়টার প্রীতি ম্যাচ ঘিরেই যেমন—রোসার ছেলে ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। সে জন্যই কিনা (স্থানীয় সময়) বুধবার সকাল থেকেই তাঁর কাছে ফোনের পর ফোন আসতে শুরু করে! আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ‘ক্ল্যারিনে’র কাছে রোসা একটু অভিযোগের সুরেই বললেন, ‘সবাই মিলে একসঙ্গে বসে যে একটু সকালের নাশতা করব, সেই সুযোগটাও পাইনি!’
রোসার তা পাওয়ারও কথা নয়। কর্দোবাবাসী তাঁদের ঘরের ছেলের দারুণ এক লগ্নে উচ্ছ্বাসে ভাসবে না! ভেসেছে বলেই তো ফোনে শুভেচ্ছা নিতে নিতে হয়তো একটু অরুচি ধরে গিয়েছিল রোসার। ওহ, অর্জনটাই তো বলা হলো না। রোসার ছেলের আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে ঘরের মাঠে এটাই ছিল প্রথম ম্যাচ। আর রোসা দেখেছেন জন্মভূমি কর্দোবায় প্রথমবারের মতো আকাশি–সাদায় ছেলের প্রত্যাবর্তন। ম্যাচটি দেখে থাকলে এতক্ষণে ধরে ফেলার কথা সেই ছেলে কে!
আর্জেন্টাইন রক্ষণের প্রাণভোমরা ক্রিস্টিয়ান ‘কুতি’ রোমেরো।
লিওনেল মেসি জাতীয় দল থেকে অবসর ঘোষণার পর নতুন অধিনায়ক হিসেবে রোমেরোর নাম ঘোষণা করেছিলেন স্কালোনি। সে অনুযায়ী এই ম্যাচে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড উঠেছিল রোমেরোর বাহুতে। রোসা এই সামান্য ব্যাপারেও শিহরিত। কারণ, ছেলে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পেয়েছেন তো তর্কযোগ্যভাবে সর্বকালের সেরার কাছ থেকে। তবে এবার আন্তর্জাতিক বিরতিতে আর্জেন্টিনার তিন ম্যাচের মধ্যে শেষটি খেলে মেসি তুলে রাখবেন জাতীয় দলের জার্সি। তারপর হয়তো অধিনায়কত্বে নিয়মিত হবেন রোমেরো। এর আগে তিনবার অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করলেও সেগুলো আনুষ্ঠানিক ছিল না।
আনুষ্ঠানিকভাবে এবার দায়িত্বটি পাওয়ার পর তাই রোমেরো পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে গেছে। বলিভিয়ার বিপক্ষে ৪–০ গোলে জয়ের পর রোমেরো নিজেও বলেছেন, ‘আমার জন্য বিশেষ দিন।’
আতলেতিকো মাদ্রিদ সেন্টারব্যাকের এই বিশেষ দিনে ‘আইসিং অন দ্য কেক’ সম্ভবত তাঁর গোলটি। এই তো কিছুদিন আগেও আর্জেন্টিনার ‘এক্স ফ্যাক্টর’ বলতে রক্ষণে রোমেরো আর আক্রমণে মেসিকে বিবেচনা করা হতো। পরেরজন বিদায় বলে দেওয়ায় সেই জায়গায় একই কাজ করার দায়িত্ব পেয়েছেন নিকো পাজ। ৫৩ মিনিটে সেই পাজের সেট পিস থেকেই হেডে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলটি রোমেরোর। তখন কি তাঁর ১০ বছর আগের সেই স্মৃতি মনে পড়েছে?
এক দশক আগে এই মারিও কেম্পেস স্টেডিয়ামেই কর্দোবার স্থানীয় দল বেলগ্রানোর হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক রোমেরোর। সেই স্মৃতি স্মরণও করেন রোমেরো, ‘১০ বছর আগে বেলগ্রানোর হয়ে এখানে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম। জাতীয় দলের ইতিহাসে সেরা সময়ের সঙ্গীও হয়েছি। তারপর এখানে অধিনায়ক হিসেবে ফিরে আসা—সত্যিই দারুণ এক অনুভূতি। কখনো এটা কল্পনাও করিনি। এটা অনেক বড় একটা দায়িত্ব, তবে আমি প্রস্তুত।’
মজার ব্যাপার, রোমেরোর এই প্রস্তুতির মধ্যে শুধু গোল ঠেকানো এবং অধিনায়কত্ব নেই। আছে মাথাকে ব্যবহার করে গোল করার অভ্যাসও। আর্জেন্টিনার জার্সিতে রোমেরোর পাঁচ গোলের সব কটিই এসেছে হেডে!
‘হেড মাস্টার’ রোমেরো স্থানীয় কচি–কাঁচাদের মাঝেও তুমুল জনপ্রিয়। কেম্পেস স্টেডিয়ামে আমন্ত্রিত ১২ বছর কিংবা তার কম বয়সী আট হাজার শিশুর মুখে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নামগুলোর একটি ছিল রোমেরো। কর্দোবার বিভিন্ন ক্লাব, ক্রীড়া ও সামাজিক সংগঠন থেকে আসা এসব খুদে গাসপারিনি গ্যালারির একটি বড় অংশ জুড়ে বসেছিল। ছিল রোমেরোর পরিবারও।
বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন মিলিয়ে রোমেরোর প্রায় ২০ জন কাছের মানুষ ছিলেন গ্যালারিতে। তাঁদের নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশের সময় রোসা বলেন, ‘ছেলের জন্য ভীষণ গর্বিত। সে একাগ্রতা ও ত্যাগের অনন্য উদাহরণ; তার সাফল্যই আমার সাফল্য। আর তার অধিনায়কত্ব পাওয়ার আনন্দ পুরো পরিবারের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি।’
সেই প্রাপ্তির আনন্দে ম্যাচ শুরুর আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করে বসেন রোমেরোর চাচা। মাঠে সেটাই ফলে যাওয়ায় রোমেরোর পরিবার আনন্দে ভেসে গেলেও পুরো ভবিষ্যদ্বাণী মেলেনি। রোমেরোর চাচা বলেছিলেন, ‘সে আজ হেডে গোল করবে। আমরা জিতব ২-১ ব্যবধানে।’ শেষ অংশটুকু না মিললেও রোমেরোকে নিয়ে তাঁর পরিবার কতটা গর্বিত, সেটা বুঝিয়ে দেন তাঁর দাদি, ‘কুতির জন্য আমি সব সময় খুশি। আমার শুভকামনা সব সময়ই থাকে। এত অল্প সময়ে সে যা অর্জন করেছে, তা সত্যিই দারুণ। পুরো পরিবার তার জন্য ভীষণ গর্বিত।’
তবে এই আনন্দের ক্ষণেও রোমেরোর হৃদয়ে বেজেছে এক বিরহ–রাগিণী। লিওনেল মেসি!
রোমেরোর ভাষায় সেই রাগিণী বেজে উঠল এভাবে, ‘আমাদের অধিনায়ক লিওকে খুব মনে পড়বে। তাঁর মতো আর কেউ কখনো হবে না।’