রেক্সহ্যাম ওয়েলসের ছোট্ট একটা শহর। একসময় এটি ছিল বাজার, খনি ও বিয়ার তৈরির শহর। ২০২১ সালে হলিউড অভিনেতা রায়ান রেনল্ডস ও রব ম্যাকএলহেনি ২৫ লাখ ডলারে দুরবস্থায় থাকা ফুটবল ক্লাব রেক্সহ্যাম এএফসি কিনে নেওয়ার পর শহরটির চেহারাই বদলে যায়। এই দুই মালিক শুরুতেই ক্লাব ও শহরকে কেন্দ্র করে ‘ওয়েলকাম টু রেক্সহ্যাম’ নামে একটি তথ্যচিত্র সিরিজ নির্মাণ করেন। ২০২২ সালে সিরিজটি প্রচার শুরু হওয়ার পরই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে।
বিশ্বজুড়ে লাখো দর্শক রেক্সহ্যামের গল্প দেখতে শুরু করেন। তাঁরা শুধু একটি ফুটবল ক্লাবের উত্থান দেখেননি, দেখেছেন শহরের মানুষ, স্থানীয় ব্যবসা, সমর্থকদের আবেগ এবং একটি সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা। এরপরই রেক্সহ্যাম ধীরে ধীরে একটি পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে। ফুটবল ক্লাবটি এখন হয়ে উঠেছে একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড।
এ নিয়ে এখনো অনেক লেখালেখি হচ্ছে, গবেষণাও হচ্ছে। ফুটবল যে একটি শহরের অর্থনীতি বদলে দিতে পারে—গবেষণা এ নিয়েই। এই
পরিবর্তনকে এখন ‘রব অ্যান্ড রায়ান ইফেক্ট’ বলা হচ্ছে।
একটা ছোট ফুটবল ক্লাব যদি একটি শহরকেই বদলে দিতে পারে, তাহলে ভাবুন ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর, ফিফা বিশ্বকাপ একটি দেশকে কতটা বদলে দেয়। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল হবে ১৯ জুলাই, নিউইয়র্কে। কিন্তু বিশ্বকাপের গল্প ফাইনাল খেলার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় না। অনেক পরেও এর প্রভাব থেকে যায়।
নতুন নতুন পর্যটক আসেন, হোটেলের ব্যবসা বাড়ে, শহরের পরিচিতি বৃদ্ধি পায়। আবার কিছু প্রভাব আছে, যা এত সহজে দেখা যায় না। যেমন মানুষ বেশি খেলাধুলা শুরু করে, স্থানীয় ব্যবসা প্রসারিত হয়, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি দেশের ভাবমূর্তি বদলে যায়।
ফিফা, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওপেন ইকোনমিকস এবারের বিশ্বকাপের আসর নিয়ে একটি গবেষণা করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এবারের বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ৮ হাজার ১০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে হবে ৩ হাজার ৫০ কোটি ডলার, আর বিশ্বের অন্যান্য দেশে হবে ৪ হাজার ৯৬০ কোটি ডলার। আর সব খরচ বাদ দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে যোগ হতে পারে ৪ হাজার ৯০ কোটি ডলার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বকাপ শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যই বাড়াবে না, মানুষের আয়ও বাড়াবে। এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত কর্মী, কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের মোট ২ হাজার ৮০ কোটি ডলার আয় হতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে হবে ১ হাজার ২০ কোটি ডলার এবং অন্যান্য দেশে ১ হাজার ৬০ কোটি ডলার।
কর্মসংস্থানেও এর বড় প্রভাব পড়বে। হিসাব বলছে, বিশ্বকাপকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮ লাখ ২৪ হাজার মানুষের পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে ১ লাখ ৮৫ হাজার চাকরি হবে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ৬ লাখ ৯২ হাজার চাকরি বিশ্বের অন্যান্য দেশে।
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল মাত্র ১৩টি দল। আর এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেবে ৪৮টি দল। এর আগে সর্বোচ্চ ৩২টি দল খেলেছে। ভাবতে পারেন যে ফুটবলকে বিশ্বে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই ফিফা আরও ১৬টি দেশকে এই সুযোগ করে দিয়েছে। বিষয়টাকে অর্থনীতির জায়গা থেকেও দেখা যেতে পারে। কারণ, ৪৮টি দেশ মানে আরও বেশি ম্যাচ, আরও বেশি দর্শক, আরও বেশি পর্যটক, আরও বেশি সম্প্রচার আয় এবং আরও বেশি ব্যবসা। এবার তো খেলা হবে তিনটি দেশে, তাই তিন দেশেরই লাভ।
এটা ঠিক যে বিশ্বকাপ আয়োজন করলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ে। কিন্তু সব দেশই যে লাভবান হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল ধরা হয় ২০০৬ সালের আয়োজক জার্মানিকে। কারণ, দেশটির অবকাঠামো আগে থেকেই শক্ত ছিল। আবার ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ২০১৪ সালের ব্রাজিল দেখায় যে নতুন স্টেডিয়াম ও অবকাঠামোতে অতিরিক্ত ব্যয় করলে পরে লোকসান হতে পারে। ২০২২ সালে কাতার অনেক অর্থ ব্যয় করেছিল, সে তুলনায় আয় ছিল কম। তবে বিশ্বকাপ যে কখনো কখনো অর্থনৈতিক লাভের চেয়েও রাষ্ট্রীয় ব্র্যান্ডিং ও অর্থনীতি বৈচিত্র্যকরণের প্রকল্প হয়ে ওঠে, কাতার বিশ্বকাপ তার প্রমাণ।
১৯৩৪ সালে আয়োজক ইতালি বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেছিল মুসোলিনির রাজনৈতিক প্রচার ও জাতীয় ভাবমূর্তি বাড়ানোর কাজে। একই কথা ১৯৭৮ সালের আয়োজক আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দেশটির সামরিক জান্তার রাজনৈতিক প্রচারই ছিল বড় লক্ষ্য।
এ তো গেল আয়োজক দেশের কথা। কিন্তু যারা অংশ নিচ্ছে, তাদের কী লাভ। এটা ঠিক, বিশ্বকাপে জয়ী হওয়া মানেই তো সর্বোচ্চ অর্জন। কিন্তু চারপাশে যে হারে অর্থের ছড়াছড়ি, তাতে অংশগ্রহণকারী দেশ ও খেলোয়াড়েরা কিছুই পাবেন না, তা তো হয় না।
এদিক দিয়ে খানিকটা দুর্ভাগা ব্রাজিল। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে তারা। এর তিনবারেই ট্রফি ছাড়া তারা কিছুই পায়নি। কেননা বিশ্বকাপে প্রাইজমানি চালুই হয়েছে ১৯৮২ সাল থেকে, সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইতালি। অবশ্য চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় নিজের দেশ কোনো অর্থ দিয়ে থাকলে সেটা আলাদা কথা।
তবে আরেকটি বিশাল প্রাপ্তি ছিল ব্রাজিলের। তখন বিশ্বকাপ ট্রফির নাম ছিল জুলে রিমে কাপ। নিয়ম ছিল, তিনবার বিশ্বকাপ জিতলে সেই ট্রফি একেবারেই দিয়ে দেওয়া হবে। তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে ব্রাজিল সেই কাপটি পায় ১৯৭০ সালে।
ট্রফিটিতে রুপার ওপর সোনার প্রলেপ ছিল। এর ধাতবমূল্য খুব বেশি না থাকলেও ঐতিহাসিক ও প্রতীকী মূল্য ছিল অমূল্য। তবে ১৯৮৩ সালে রিও ডি জেনিরোতে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। ধারণা করা হয়, ট্রফিটি গলিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে ১৯৯৭ সালে লন্ডনে এক নিলামে জুলে রিমে ট্রফির একটি প্রতিরূপ ২ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ পাউন্ডে কিনেছিল ফিফা। জল্পনা ছিল, এটিই হয়তো হারিয়ে যাওয়া আসল ট্রফি। কিন্তু পরে পরীক্ষায় দেখা যায়, ট্রফিটি আসল নয়।
বর্তমান বিশ্বকাপ ট্রফির উচ্চতা সাড়ে ৩৬ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ দশমিক ২ কেজি। ট্রফিতে ব্যবহার করা করা হয়েছে ১৮ ক্যারেটের প্রায় ৪ দশমিক ২ কেজি সোনা। ১৯৭৪ সালে ওই পরিমাণ সোনার দাম ছিল ২১ হাজার ডলার। আর এখন তার মূল্য প্রায় সোয়া ৬ লাখ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা। তবে এই ট্রফিটি এখন কাউকেই দেওয়া হয় না। বিজয়ী দল পায় একটি রেপ্লিকা।
তবে কেবল বিজয়ী দলই নয়, বিশ্বকাপে এখন অংশগ্রহণ করলেই অর্থ পাওয়া যায়। অথচ ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে হাতে–পায়ে ধরেও চারটির বেশি ইউরোপের দেশকে অংশ নিতে রাজি করানো যায়নি। প্রাইজমানির সূচনা ১৯৮২ বিশ্বকাপ থেকে, সেবার চ্যাম্পিয়ন ইতালি পেয়েছিল ১৪ লাখ ডলার। ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনা পায় ২২ লাখ ডলার, ১৯৯০ সালে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি ৩৫ লাখ ডলার, ১৯৯৪ সালে ব্রাজিল পায় ৪৫ লাখ ডলার, ১৯৯৮ ফ্রান্স ৬৪ লাখ ডলার, ২০০২ সালে ব্রাজিল ৮৫ লাখ ডলার, ২০০৬ সালে ইতালি পায় ১ কোটি ২২ লাখ ডলার, ২০১০ সালে স্পেন ৩ কোটি ১ লাখ ডলার, ২০১৪ সালে জার্মানি ৩ কোটি ৫১ লাখ ডলার, ২০১৮ সালে ফ্রান্স ৩ কোটি ৮১ লাখ ডলার, ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল ৪ কোটি ২২ লাখ ডলার। অর্থাৎ ৪০ বছরে বিশ্বকাপজয়ীর প্রাইজমানি প্রায় ৩০ গুণ বেড়েছে। এবার চ্যাম্পিয়ন দল পাবে ৫ কোটি ডলার।
আমরা তো কেবল দর্শক। তাহলে এই বিশ্বকাপ থেকে আমরা কী পাব? ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী বিএমসি সাইকোলজিতে প্রকাশিত ‘ক্যান ওয়াচিং দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ মেক ইউ মেন্টালি হেলদিয়ার?’ শীর্ষক এক গবেষণায় এর উত্তর রয়েছে। দেখা গেছে, যারা বিশ্বকাপ বা অন্যান্য ক্রীড়া আয়োজন নিয়মিত দেখেন, তাঁদের মধ্যে আনন্দ, জীবন সন্তুষ্টি ও মানসিক বিকাশের অনুভূতি তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ, খেলা দেখা মানুষকে অন্যদের সঙ্গে যুক্ত করে, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং প্রিয় দলকে সমর্থনের মাধ্যমে একধরনের পরিচয়বোধ ও একাত্মতার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
গবেষণাটি আরও বলছে, বিশ্বকাপ দেখা মানুষের তিন ধরনের মৌলিক মানসিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে পারে। যেমন অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের অনুভূতি, নিজের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এবং সক্ষমতার অনুভূতি। এসব উপাদানই মানুষের ভালো থাকতে সাহায্য করে।
গবেষণাটি বাংলাদেশের ওপর করা হয়নি। এখানে তো ভালো থাকা নির্ভর করছে মূলত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ওপর। এবার কি এই দুই সমর্থক গোষ্ঠীর একদল ভালো থাকবে, নাকি কেউই না—সেটি জানতে অপেক্ষা করতে হবে ১৯ জুলাই পর্যন্ত। মিষ্টি বেশি বিক্রি হবে, না সেভেন আপ—সেদিনই জানা যাবে।
লেখক: হেড অব অনলাইন, প্রথম আলো