দাবা খেলার প্রেমে পড়েছেন সিটি স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড
দাবা খেলার প্রেমে পড়েছেন সিটি স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড

দাবার নেশায় মজেছেন সালাহ–হলান্ড

মাঠে খেলার পাশাপাশি মাথার খেলায়ও মেতেছেন তাঁরা।

কারা? ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ থেকে ইউরোপিয়ান ফুটবলের তারকারা। যেমন ধরুন আর্লিং হলান্ড ও মোহাম্মদ সালাহ। দাবার নেশায় পড়েছেন দুই তারকা। তাঁদের এই অনুরাগ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে খেলাটিকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।

ম্যানচেস্টার সিটি স্ট্রাইকার হলান্ড দাবার প্রতি এতটাই মুগ্ধ যে খেলাটির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা কাজে লাগাতে সম্প্রতি তিনি একটি অত্যাধুনিক নতুন দাবা ট্যুরে বিনিয়োগ করেছেন। হলান্ড ছাড়াও লিভারপুল ফরোয়ার্ড সালাহ এবং ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হ্যারি কেইন, ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড ও অ্যান্থনি গর্ডনও নিয়মিত দাবা খেলেন।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, মিসরীয় তারকা সালাহ ছদ্মনামে অনলাইনে দ্রুতগতির ‘ব্লিটজ’ দাবা খেলায় আসক্ত। সালাহর নিজের স্বীকারোক্তি, ‘আমি দাবার নেশায় মজেছি। আক্ষরিক অর্থেই প্রতিদিন আমি দাবা খেলি।’ আর্সেনাল মিডফিল্ডার মার্টিন ওডেগার্ড ও এবেরচি এজেও ভালো দাবাড়ু। ২০২৫ সালে একটি অপেশাদার টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়নও হন এজে।

মেয়ের সঙ্গে দাবা খেলছেন লিভারপুল তারকা মোহাম্মদ সালাহ

পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নরওয়ের গ্র্যান্ডমাস্টার ম্যাগনাস কার্লসেন ফুটবলের বড় ভক্ত। ফুটবল ও দাবার প্রতি তাঁর ভালোবাসা দুটি ভিন্ন জগতের মিলনে বড় ভূমিকা রেখেছে। আলেকজান্ডার-আর্নল্ড প্রায়ই তাঁর ভাইদের সঙ্গে দাবা খেলেন। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা একবার দাবার বোর্ডে কার্লসেনের মুখোমুখিও হয়েছেন। হেরেছিলেন মাত্র ৫ মিনিটে, ১৭ চালে।

এসি মিলান উইঙ্গার ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচ খুব ছোটবেলায় দাবা খেলা শিখেছিলেন তাঁর দাদার কাছে। সেই দাদার স্মরণে দাবার ‘কুইন’ হাতে ট্যাটু করিয়েছেন। ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী আঁতোয়ান গ্রিজমান ও রিয়াল মাদ্রিদের দানি কারভাহালও দাবার বেশ ভালো সমঝদার।

অথচ দাবা খেলাটা আপাতদৃষ্টিতে ফুটবলের বিপরীত ঘরানার খেলা বলেই মনে হয়। এই খেলায় ছোট্ট একটি বোর্ডে বর্গক্ষেত্র আকারের ৬৪টি ঘরে চলে বুদ্ধির লড়াই। খেলাটি আপাতদৃষ্টিতে ধীরস্থির ও বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। ফুটবল সেখানে বড় আকারের মাঠে শক্তি, দক্ষতা, বুদ্ধি ও আগ্রাসনের লড়াই। তবে গভীরে তাকালে কিন্তু মিলও খুঁজে পাওয়া যায়। হলান্ড বলেন, ‘দাবা অবিশ্বাস্য একটি খেলা। এটি মস্তিষ্ককে ধারালো করে। ফুটবলের সঙ্গে স্পষ্ট মিল আছে। আপনাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, নিজের সহজাত প্রবৃত্তির ওপর বিশ্বাস রাখতে হয় এবং কয়েক চাল পরের কথা আগেভাগে ভাবতে হয়। পরিকল্পনা ও কৌশলই এখানে সব।’

দাবায় মজেছেন বায়ার্ন মিউনিখ তারকা হ্যারি কেইনও

‘ফুটবল ও দাবার কৌশল একই রকম’

আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশনের (ফিদে) পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন এ ট্যুরে প্রতিবছর চারটি ভিন্ন শহরে টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। ফাস্ট ক্ল্যাসিক, র‍্যাপিড ও ব্লিটজ—এই তিন বিভাগে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নির্বাচন করা হবে। প্রতি মৌসুমে পুরস্কারের অঙ্ক রাখা হয়েছে অন্তত ২০ লাখ পাউন্ড।

ফিদে সভাপতি আরকাদে দোভোরকোভিচ বলেন, ‘আর্লিং হলান্ডের মতো বিশ্বমানের একজন ক্রীড়াবিদের “টোটাল ওয়ার্ল্ড চেস চ্যাম্পিয়নশিপ ট্যুর”-এ যোগ দেওয়াটা বর্তমান বিশ্বে দাবার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতারই শক্তিশালী ইঙ্গিত।’

দাবার শিকড় প্রোথিত সপ্তম শতাব্দীতে ভারতে। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে সে খেলাই এখন দারুণ গতি পেয়েছে। চেনা বোর্ডের জায়গা দখল করে নিয়েছে অনলাইন অ্যাপ, যা এখন দাবার প্রধান বিচরণক্ষেত্র। করোনাকালে অনলাইনে দাবা খেলার প্রবণতা বহুগুণ বেড়েছিল। ফিদের তথ্যমতে, বর্তমানে অন্তত ১৫০ কোটি মানুষের স্মার্টফোনে দাবার অ্যাপ রয়েছে। নেটফ্লিক্স সিরিজ ‘দ্য কুইনস গ্যাম্বিট’ এবং তারকা ফুটবলারদের মতো প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততা দাবার পুরোনো ও একঘেয়ে ভাবমূর্তিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

ফুটবল কোচরাও মাঠের কৌশলগত লড়াইয়ে এগিয়ে থাকতে দাবার কৌশলের দিকে ঝুঁকছেন। ‘পেপ কনফিডেনশিয়াল’ বইয়ে ম্যানচেস্টার সিটি কোচ গার্দিওলা বলেন, ‘ফুটবল ও দাবার মধ্যে যে কতটা মিল, তা আপনার ধারণার বাইরে।’

ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা

রিয়াল মাদ্রিদের একনিষ্ঠ ভক্ত ও দাবাড়ু কার্লসেনও গার্দিওলার সুরেই সুর মিলিয়ে বলেন, ‘দাবা ও ফুটবলের মূল বিষয় হলো মাঝমাঠ বা বোর্ডের মাঝখানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। যদি আপনি মাঝখানটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবে পুরো মাঠ বা বোর্ডই আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। জায়গার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি আশ্চর্যজনকভাবে একই রকম।’

তবে দাবার ‘কিস্তিমাত’ বা চেকমেট কি কখনো ফুটবলে জয়সূচক গোল করার রোমাঞ্চকে ছাপিয়ে যেতে পারবে? বায়ার্ন মিউনিখ তারকা কেইনের কাছে কিন্তু ফুটবলই আসল ভালোবাসা, আর দাবা মানসিক ক্লান্তি দূর করার মাধ্যম। তাঁর ভাষায়, ‘নিজেকে সতেজ রাখতে আমি দাবা খেলি। এটি পুরোপুরি মানসিক একাগ্রতার খেলা, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে আপনাকে মনোযোগ ধরে রাখতে হয়।’