
বিশ্বকাপ মানে তো শুধু মাঠের লড়াই নয়; এর আশপাশে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের কোলাজ। যে গল্পের কোনোটিতে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, আছে রোমাঞ্চ কিংবা অজানা চমক। বিশ্বকাপের তেমন কিছু গল্প নিয়ে এ আয়োজন—
আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, বিশ্বকাপ আর ফুটবল...
এই চারটি শব্দ শুনলেই একটি নাম মাথায় আসার কথা—ডিয়েগো ম্যারাডোনা! তাঁর সেই ‘ঈশ্বরের হাতে’র গোল কিংবা ইংলিশ ডিফেন্ডারদের খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’—এগুলো সবই ফুটবল রূপকথার অংশ।
তবে এর বাইরেও এই দুই দলের ফুটবল ইতিহাসে অবিশ্বাস্য এক গল্প আছে। যার মূল চরিত্র আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ডিফেন্ডার হাভিয়ের জানেত্তি। তাঁর একটি গোল বাঁচিয়ে দিয়েছিল এক ব্যক্তির জীবন।
১৯৯৮ বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের সেন্ট-এতিয়েনে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। মাঠে একদিকে ক্যাম্পবেল, নেভিল, স্কোলস, বেকহ্যাম, ওয়েন, শিয়ারারদের মতো ইংলিশ তারকারা, অন্যদিকে আয়ালা, সিমিওনে, ভেরন, ক্রেসপো, বাতিস্তুতা ও জানেত্তির আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের শুরুটা ছিল খ্যাপাটে। মাত্র ৬ মিনিটে ইংল্যান্ডের গোলকিপার ডেভিড সিম্যান পেনাল্টি খেয়ে বসেন, এমনকি রেফারির সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে লাল কার্ড দেখে মাঠও ছাড়েন। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার পেনাল্টি গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। ৩ মিনিট পর ইংল্যান্ডও পেনাল্টি পায় এবং শিয়ারারের গোলে সমতায় ফেরে।
ম্যাচের ১৬ মিনিটে ১০ জনের ইংল্যান্ডকে দুর্দান্ত এক গোলে এগিয়ে নেন মাইকেল ওয়েন। ম্যাচের প্রথম ১৭ মিনিটেই এক লাল কার্ড আর ৩ গোল! নাটকের তখনো অনেক বাকি।
এই রোমাঞ্চকর ম্যাচ যখন মাঠে চলছে, তার থেকে ঠিক ১,৭১০ কিলোমিটার দূরে পোল্যান্ডের ‘শদলোভিয়েতস’ শহরে নিজের ড্রয়িংরুমে বসে টিভির পর্দায় খেলা দেখছিলেন এক ব্যক্তি। নাম তাঁর নারেক কোপাচেন। পেশায় তিনি আইনজীবী, ওই সময় সরকারি কৌঁসুলি।
নারেক নিয়মানুবর্তী মানুষ। প্রতিদিন রাত ঠিক ১০টায় তিনি তাঁর পোষা কুকুরটিকে নিয়ে হাঁটতে বের হতেন। এরপর তাঁর সরকারি গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে বাড়ির কাছের পুলিশ স্টেশনের পার্কিং লটে রেখে আসতেন। এটাই ছিল তাঁর রোজকার রুটিন।
সেদিনও, অর্থাৎ ১৯৯৮ সালের ৩০ জুন রাত ১০টায় নিজের রুটিন অনুযায়ী বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন নারেক। প্রথমার্ধের খেলা যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন ঘড়িতে রাত ১০টার কাছাকাছি। প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী ঠিক এই সময়েই খাওয়া শেষ করে নারেকের গাড়ি নিয়ে পুলিশ স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা।
নারেক যখন সোফা ছেড়ে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই মাঠে ঘটে দারুণ কিছু। প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে বল পেয়ে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হাভিয়ের জানেত্তি দুর্দান্ত এক গোল করে বসেন। স্কোরলাইন হয়ে যায় ২-২!
ম্যাচের এই অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চ নারেককে আক্ষরিক অর্থেই সোফায় ধরে রাখে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আজ রাতের মতো নিজের এই কঠোর রুটিনটি তিনি ভাঙবেন এবং ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে কী হয়, তা দেখেই ছাড়বেন!
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে কেঁপে ওঠে বোমার শব্দে। বোমার বিস্ফোরণে উড়িয়ে যায় নারেকের গাড়ি। সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে নারেক তখন মাফিয়াদের বিরুদ্ধে মামলা লড়ছিলেন। একাধিকবার তাঁকে হত্যারও চেষ্টা চালায় তারা। শেষ পর্যন্ত গাড়িতে বেঁধে রেখেছিল টাইম-বোম। ঘাতকেরা জানত, ওই সময় নারেক গাড়ির কাছে থাকবেন।
কিন্তু জানেত্তির ওই একটি গোল যদি নারেককে আর কয়েক মিনিটের জন্য টিভির সামনে আটকে না রাখত, তবে ঘড়ির কাঁটা ধরে গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণও হারাতে হতো এই আইনজীবীকে। ফুটবল মাঠের এক গোল এভাবেই মাঠের বাইরে একজনের জন্য হয়ে উঠেছিল সাক্ষাৎ জীবনরক্ষক।
কয়েক বছর পর নারেক যখন উপলব্ধি করেন জানেত্তির সেই গোলই তাঁর জীবন বাঁচিয়েছিল, তিনি তখন আর্জেন্টাইন তারকাকে একটি চিঠি পাঠিয়ে কৃতজ্ঞতা জানান।