
গ্রামোফোন রেকর্ডে যাঁরা গান শুনেছেন, তাঁরা ব্যাপারটা ভালো বুঝবেন। সুচটা যখন প্রথম কালো ডিস্কের খাঁজে স্পর্শ করে, তখন সুরের আগে একটা মৃদু খসখসে শব্দ হয়। সেই শব্দটা গানের অংশ নয়, কিন্তু ওটাই জানান দেয়—গানটা শুরু হতে যাচ্ছে। ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচগুলোও ঠিক সেই খসখসে সুরের মতো। যেন মহাকাব্য লেখার আগের মুখবন্ধ!
আর বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, সেই মুখবন্ধে সবচেয়ে ঘুরেফিরে এসেছে একটা নাম—মেক্সিকো! বিশ্বকাপ ফুটবলের আঙিনায় এমন এক চরিত্র, যাকে ছাড়া মহাকাব্যের প্রথম অধ্যায়টি রচনাই করা যায় না। ট্রফি ছোঁয়া হয়নি কোনো দিন, সর্বোচ্চ দৌড় স্বাগতিক হিসেবে দুবার কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত। অথচ যখনই বিশ্বমঞ্চের পর্দা ওঠে, এক অদ্ভুত আকর্ষণে স্পটলাইটের নিচে এসে দাঁড়ায় ‘এল ত্রি’রা। এবারও যেমন বিশ্বকাপের পর্দা উঠছে মেক্সিকোর ম্যাচ দিয়ে, যে ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা।
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে হওয়া সেই প্রথম বিশ্বকাপ থেকে আজকের ২০২৬; বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে সবচেয়ে বেশিবার নামার রেকর্ডটি মেক্সিকোর—এ নিয়ে আটবার। অথচ কী আশ্চর্য নিয়তি! একবারও উদ্বোধনী ম্যাচে জয়ের মুখ দেখেনি মেক্সিকো। ব্রাজিল বা জার্মানি যখনই উদ্বোধনী ম্যাচ খেলেছে, খেলেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। মেক্সিকো সেখানে খেলেছে অবধারিত এক সহযাত্রী হিসেবে কিংবা স্বাগতিক হিসেবে।
ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে দেখা যায়, আগের সাতটি উদ্বোধনী ম্যাচে একটিও জয় নেই মেক্সিকোর। এমনকি পরপর পাঁচবার উদ্বোধনী ম্যাচে খেলার বিরল রেকর্ড তাদের, কিন্তু কখনো হাসিমুখে মাঠ ছাড়া হয়নি। কখনো ব্রাজিলের সাম্বার তোড়ে ভেসে গেছে, কখনো সুইডেন বা ফ্রান্সের কাছে মাথা নোয়াতে হয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচটা হার। সঙ্গে দুটি ড্র—১৯৭০ সালে ঘরের মাঠে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ০–০। তারপর ১৬ বছর আগে জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে ভুভুজেলার কানফাটানো আওয়াজের ভেতর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১-১।
সেই দক্ষিণ আফ্রিকাই ১৬ বছর পর আবার বিশ্বমঞ্চে ফিরছে এবং উদ্বোধনী ম্য্যাচে প্রতিপক্ষ হিসেবে আবার সেই মেক্সিকো! নিয়তি যেন এক বৃত্ত পূরণ করছে। তবে এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এবার মেক্সিকো খেলছে নিজের চেনা উঠোনে, প্রায় লাখো উন্মাদ সমর্থকের সামনে।
একটা সময় ছিল, যখন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ মানেই ছিল বুককাঁপানো অনিশ্চয়তার গল্প। ১৯৭৪ থেকে ২০০২ পর্যন্ত নিয়ম ছিল, আগেরবারের চ্যাম্পিয়নরা খেলবে প্রথম ম্যাচ। সেই নিয়ম জন্ম দিয়েছিল তীব্র সব মহানাটকের। ১৯৯০ সালের মিলানের সান সিরোর সেই বিকেলটার কথা ভাবুন। ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনাকে কীভাবে স্তব্ধ করে দিয়েছিল ক্যামেরুনের ওমাম বিয়িকের অবিস্মরণীয় হেড! কিংবা ২০০২-এর সিউলে জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সকে নবাগত সেনেগালের হারিয়ে দেওয়ার সেই রূপকথা। এখন সে রকম গল্পের দেখা মিলে কদাচিৎ।
জার্মানিতে হওয়া ১৯৭৪ বিশ্বকাপের আগপর্যন্ত অবশ্য উদ্বোধনী ম্যাচটা কোন দুই দেশ খেলবে তার কোনো বাঁধাধরা নিয়ম ছিল না। ১৯৩৪ বিশ্বকাপে যেমন একই সঙ্গে ৮টি ম্যাচ হয়েছে উদ্বোধনী দিনে। ১৯৫৪ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপে উদ্বোধনী দিনে হয়েছে একসঙ্গে চারটি করে ম্যাচ। ২০০৬ সাল থেকে আবার ফিফা নিয়ম বদলে ঠিক করল স্বাগতিক দল খেলবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ। এখন পর্যন্ত সেটাই বহাল আছে। আর তাতেই রোমাঞ্চ কমে গেছে অনেকটুকু। সব সময় তো আর পরাশক্তি দল স্বাগতিক হচ্ছে না। ২০০৬ জার্মানি আর ২০১৪ ব্রাজিলকে বাদ দিলে আর কোনো স্বাগতিক দলই তো পরাশক্তি ছিল না, এবারও নয়। স্বাগতিকদের জয়-হারে বিশ্বকাপের ভাগ্য তাই টালমাটাল হয়ে যায় না।
তবে এবার মেক্সিকো বলেই উদ্বোধনী ম্যাচের একটা আলাদা মাহাত্ম্য যোগ হচ্ছে। শুধু ইতিহাসে নাম লেখানোর উপলক্ষ বলে নয়, এবার মেক্সিকোর সামনে নিজেদের দীর্ঘদিনের সেই ‘উদ্বোধনী অভিশাপ’ ভেঙে ফেলার অগ্নিপরীক্ষা।
আজ রাতে আজতেকার আকাশে সেই অনিশ্চয়তার মেঘ আর আশার আলো তাই একসঙ্গে খেলা করবে। গ্যালারিতে যখন লাতিনোদের বিখ্যাত ‘মেক্সিকান ওয়েভ’ উঠবে, যখন গায়কদের কণ্ঠে সুর বাঁধবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, ভিআইপি বক্সে বসা ফিফা কর্তারা যখন উল্লাসে চিয়ার্স করবেন, মাঠে নামা এগারোটা মেক্সিকান হৃদয় কি তখন একটুও কাঁপবে না? তারা কি পারবে ঘরের মাঠে তাদের ওপর চেপে বসা ওই প্রাচীন অভিশাপটা ভাঙতে?