লিওনেল মেসি
লিওনেল মেসি

আজ পৃথিবীর মন খারাপ: ‘বিদায়’ বললেন, ফুটবলের কবি

আজ পৃথিবীর মন খারাপ। আকাশে–বাতাসে যেন সেই মন খারাপেরই কলরব। মানুষে, মানুষে কত ভেদাভেদ; ভাষা, কাঁটাতার, মানচিত্র কিন্তু মন খারাপের কারণটা এক। মেসি বিদায় নিলেন। একজন ফুটবলারের বিদায়ে পৃথিবীর এত মানুষের মন খারাপ হওয়ার ঘটনা বোধ হয় খুব বেশি নেই।

এই অসম্ভব কীভাবে সম্ভব করলেন মেসি? কারণ আর কিছু নয়, মেসি আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছেন। তাঁর পায়ের জাদুতে কারও কৈশোর জড়িয়ে আছে, কারও তারুণ্য, কারও বন্ধুত্ব, কারও রাত জাগা। আবার কারও জীবনের সবচেয়ে আনন্দের রাত হয়তো তাঁর কোনো একটি ম্যাচের রাত। একইভাবে তাঁর কোনো হারের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে মন খারাপ, হইচই, তর্কবিতর্ক।

কত রাত যে কেটেছে মেসির সঙ্গে, দুই পায়ের জাদুতে হাততালি আর চিৎকার দিয়ে—ইয়ত্তা নেই। পরদিন পরীক্ষা থাকলেও খেলা দেখেছি। সকালে ক্লাস থাকলেও রাত জেগেছি। ঘুম চোখে সকালে উঠে বন্ধুর সঙ্গে আগের রাতের ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করেছি। মনেই হয়নি তখন, একদিন এগুলো স্মৃতি হয়ে যাবে। এমন একটা সকাল আসবে, যেদিন মেসির বিদায়ের কথা লিখতে বসে পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে পড়বে। বলতে ইচ্ছে করবে, ‘যেতে আমি দিব না তোমায়।’

বার্সেলোনার মেসিকে দেখার মধ্যে একটা বিস্ময় ছিল। বল পায়ে গেলেই মনে হতো, কিছু একটা হবে। একজন খেলোয়াড়ের কাছে দর্শকের এ উৎকণ্ঠার চেয়ে পূর্ণতার বোধ হয় আর কিছু হতে পারে না।

মেসি অসাধারণ, আমার কাছে তিনি ফুটবলের কবি। কী অসম্ভব, ভয়ংকর সুন্দর তাঁর খেলার কৌশল। বাঁ পায়ে বল থাকলে তিনজন ডিফেন্ডারও যথেষ্ট মনে হতো না। তাঁর গোলের সৌন্দর্য তো আছেই, কিন্তু কখনো কখনো তাঁর একটা পাসও গোলের চেয়ে সুন্দর মনে হতো। তাঁর খেলা দেখলে মনেই হতো না, ফুটবল কঠিন কোনো খেলা।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর খেলবেন না মেসি

আর্জেন্টিনার মেসির সঙ্গে আবার সম্পর্কটা একটু অন্য রকম। এখানে মুগ্ধতার সঙ্গে মায়াও জড়িয়ে আছে। কারণ, তাঁর এই জার্নিটা সুখকর ছিল না। তাঁকে যেমন ফাইনালে হেরে মাঠ ছাড়তে হয়েছে, তেমনি সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি একসময় জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার কথাও বলতে শুনেছি।

২০২১ সালের কোপা আমেরিকার কথা মনে পড়ে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে আর্জেন্টিনা জিতল। মেসির মুখের সেই হাসিটা মনে আছে। তখন মনে হয়েছিল, বহু বছরের একটা অপেক্ষা শেষ হলো। কিন্তু সবচেয়ে বড় অপেক্ষাটা এখনো বাকি, হাতে বিশ্বকাপ উঠলেই পূর্ণতার বাঁশি বাজবে।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের কথা মনে করলে বুকের ভেতর অন্য রকম একটা অনুভূতি হয়। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হার। চারদিকে হতাশা। মনে হচ্ছিল, আবার কি সেই পুরোনো গল্প হবে? কাছে গিয়েও কি আবার ফিরে আসতে হবে? প্রতিটি ম্যাচের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, মেসি শুধু একটা টুর্নামেন্ট খেলছেন না। নিজের জীবনের অসমাপ্ত গল্পের শেষ অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

ফাইনালের আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স ম্যাচ। সেই রাতের কথা কি ভোলা যায়? নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটের মধ্য দিয়ে মেসির হাতে উঠল স্বপ্নের বিশ্বকাপ। দৃশ্যটি দেখে মনে হয়েছিল মেসির গল্পের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাটা পূর্ণ হলো।

রূপকথার গল্পের নায়ক ফুটবলকে বিদায় বললেন

আজ এই রূপকথার গল্পের নায়কই, ফুটবলকে ‘বিদায়’ বললেন। আর তাঁকে বিশ্বকাপের রাতে আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখব না। ম্যাচ শুরুর আগে আর মনে হবে না, মেসি কী করবেন? বলটা তাঁর পায়ে গেলে যে অদ্ভুত প্রত্যাশা তৈরি হতো, সেটাও আর হবে না। কিন্তু মেসি কি সত্যিই চলে যাচ্ছেন?

কোনো এক রাতে ইউটিউবে পুরোনো ম্যাচ চালিয়ে, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে রিলসে কোনো গোলের দৃশ্য দেখে কি থমকে যাব না!

মেসির অর্জন কী, কেবল ট্রফিগুলো? মনে হয় না। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন ‘সবার’ হতে পারা। তর্কবিতর্কের স্বার্থে কেউ কেউ নানা কথা বললেও মেসির প্রশংসা না করে পারা যায় না।

হ্যাঁ, মেসি আজ সত্যিই বিদায় নিলেন। বিদায়ী বক্তব্যে বলেছেন, ‘মন চায় আজীবন এখানেই থেকে যাই, তবে আমার মনে হচ্ছে এটাই সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময়।’ কিন্তু কেন জানি না, এই বাস্তব সত্য মেনে নিতে মন মানছে না। মনে হচ্ছে, ডেকে বলি, আরেকটু থাকুন। আরেকটা ম্যাচ খেলুন। আরেকবার আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নামুন, বাঁ পায়ে বল নিন। তারপর কয়েকজনকে কাটিয়ে গিয়ে, গোল করুন।

আমরা আরও অনেক রাত জাগতে চাই, আপনাকে নিয়ে আলাপ–আলোচনা করতে চাই। চিৎকার দিয়ে বলতে চাই, মেসি, মেসি, মেসি। অপেক্ষা করতে চাই ম্যাচের একেবারে লাস্ট মিনিট পর্যন্ত। বলতে চাই, মেসি আছেন, কিছু না কিছু একটা হবে।

সময় বড় কঠিন বিচারক, তাকে ম্যানুপুলেট করা যায় না, ধরে রাখা যায় না, শুধু বয়ে যেতে দিতে হয়। তাই ইচ্ছা থাকলেও কাউকে ধরে রাখা যায় না। একদিন কবির কলম, শিল্পীর সুর, খেলোয়াড়কে জার্সি খুলে রাখতে হয়। মেসিও রাখলেন। কিন্তু তাঁর প্রতি ভালোবাসা কি ফুরিয়ে যাবে? যাবে না, তিনি থাকবেন, হৃদয়ে, নিভৃতে, নীরবে।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘যেতে নাহি দিব। যত বার পরাজয় / তত বার কহে, আমি ভালোবাসি যারে / সে কি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে।’