
বিশ্বকাপের বল মাঠে গড়াতে বাকি মাত্র তিন মাসের মতো। তবে ফুটবলের মহাযজ্ঞ শুরুর আগেই বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির আঁচ লেগেছে ২০২৬ বিশ্বকাপের গায়েও। বৈশ্বিক এ আসরে না খেলার কথা জানিয়েছে ইরান। দেশটির ক্রীড়ামন্ত্রী আহমাদ দানিয়ামালির সাফ কথা—যাদের হাতে তাদের নেতার রক্ত লেগে আছে, সেই যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে যাবে না ‘পার্সিয়ান লায়ন’রা।
আজ ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে আহমাদ দানিয়ামালি এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বলেছেন, ‘যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার আমাদের নেতাকে হত্যা করেছে, কোনো পরিস্থিতিতেই তাদের দেশে আমরা বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারি না।’
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া সংঘাত যুদ্ধের রূপ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই। মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রীর কথাটা দেখতে হবে সেই প্রেক্ষাপটেই, যখন তিনি বলছেন, ‘গত আট-নয় মাসে আমাদের ওপর দুটি যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের হাজারো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এমন অবস্থায় আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা যেখানে নেই, সেখানে খেলতে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।’
গত ডিসেম্বরে হওয়া বিশ্বকাপের ড্র অনুযায়ী, ইরান ছিল গ্রুপ ‘জি’-তে। যেখানে তাদের সঙ্গী বেলজিয়াম, মিসর ও নিউজিল্যান্ড। সূচি অনুযায়ী ইরানের তিনটি ম্যাচই হওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে—দুটি লস অ্যাঞ্জেলেসে ও একটি সিয়াটলে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দলই যদি নিজেদের গ্রুপে দ্বিতীয় হয়, তাহলে আগামী ৩ জুলাই শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে হওয়ার কথা তাদের।
গত সপ্তাহে আটলান্টায় ফিফার প্রস্তুতি সভায় একমাত্র ইরানই অনুপস্থিত ছিল। এ নিয়ে তখনই অনেক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কিছুদিন আগে ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি একদমই ভাবছেন না। কারণ, দেশটি “খুবই বাজেভাবে পরাজিত” একটা দেশ।’
তবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এখনো আশাবাদী। মঙ্গলবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি ইনস্টাগ্রামে জানান, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রে আসার অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্প তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন। ট্রাম্প নাকি তাঁকে বলেছেন, ইরান এই টুর্নামেন্টে অংশ নিলে তাঁর কোনো আপত্তি নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইনফান্তিনো লিখেছেন, ‘আমরা ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেছি। বিষয়টা হলো, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে ইরান। ওই আলোচনায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে এই টুর্নামেন্টে (বিশ্বকাপে) অবশ্যই ইরান দলের অংশগ্রহণের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।’
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, সেটা স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে বিশ্বকাপ বড় একটা উপলক্ষ হতে পারে বলেও বিশ্বাস করেন ইনফান্তিনো, ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপের মতো একটা ইভেন্ট আরও বেশি দরকার সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে। আমি আন্তরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে তাঁর সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই।’
ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের সখ্য দীর্ঘদিনের। ফিফার প্রবর্তিত প্রথম ‘শান্তি পুরস্কার’ও দেওয়া হয়েছে ট্রাম্পকে!
এর আগে সপ্তাহের শুরুতে ফিফার বিশ্বকাপের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হেইমো শিরগি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণেও টুর্নামেন্ট পেছানোর সুযোগ নেই। কারণ, এ আয়োজনের পরিধি অনেক বড়। তবে সংস্থাটি ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানিয়ে ছিলেন তিনি।
শিরগির কথাটা ছিল এ রকম, ‘আমরা মূলত প্রতিদিনকার পরিস্থিতি বিবেচনা করছি। কোনো এক পর্যায়ে এর সমাধান হবে। আর বিশ্বকাপ অবশ্যই অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বকাপ এত বড় একটি আয়োজন যে আমরা আশা করি, যোগ্যতা অর্জন করা সব দলই এতে অংশ নিতে পারবে।’
কিন্তু ইরান যদি শেষ পর্যন্ত না খেলে, তখন ফিফা কী করবে? তিন বছর আগে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে ইসরায়েলকে আতিথ্য দিতে রাজি না হওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার স্বাগতিক মর্যাদা কেড়ে নিয়েছিল ফিফা। এবার আয়োজক স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র। তারা যদি ইরানকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় বা ইরান নিজ থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোন পথে হাঁটে, সেটাই দেখার বিষয়।