ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জেমস ট্রাফোর্ড
ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জেমস ট্রাফোর্ড

গোলকিপারদের দাম কেন এত কম

ফুটবল মাঠে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ লোকটা কে? গোলকিপার।

বাকিদের করতালি পাওয়ার সুযোগ অনেক বেশি, নায়ক হওয়ারও। কিন্তু গোলপোস্টের নিচে যে লোকটা দাঁড়িয়ে থাকেন, তাঁর দিকে আসলে খেলার বেশির ভাগ সময় চোখই যায় না। বাকিরা গোল করবেন, করতালি পাবেন, নায়ক হবেন। আর তিনি? ভুল করলে দোষী। ঠিক করলে সেটাই স্বাভাবিক।

দলবদলের বাজারে গেলেও বোঝা যায়, ফুটবল–বিশ্ব এখনো তাঁকে শুধু একজন প্রহরীই ভাবে, নায়ক নয়।

ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জেমস ট্রাফোর্ডের গল্পটা দিয়েই শুরু করা যাক। ম্যানচেস্টার সিটি থেকে তাঁর লিডসে যোগ দেওয়া প্রায় নিশ্চিত, সম্ভাব্য দলবদল ফি পড়তে যাচ্ছে ৪ কোটি ৭০ লাখ ইউরোর মতো। যদি শেষ পর্যন্ত এই দলবদলটা হয়, তাহলে লিডস ইউনাইটেড হবে প্রিমিয়ার লিগের একমাত্র ক্লাব, যাদের ইতিহাসের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় একজন গোলরক্ষক!

এই তথ্য কি একটু অবাক হওয়ার মতো নয়? আধুনিক ফুটবলে সাফল্যের অন্যতম শর্তই ভালো গোলকিপিং। প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনালের শিরোপা জয়ে দাভিদ রায়ার ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে উনাই সিমোন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, সেটাও নিশ্চয়ই কাউকে আলাদা করে বোঝাতে হবে না। পিএসজির গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়েও মাতভি সাফোনভ ছিলেন বড় নির্ভরতা। কিন্তু গোলকিপারদের এই গুরুত্ব দলবদলের খরচে কেন জানি প্রতিফলিত হয় না।

ইতিহাস বলছে, দলবদল ফির বিচারে এখনো ফুটবলের সবচেয়ে দামি গোলরক্ষক কেপা আরিসাবালাগা। ২০১৮ সালে অ্যাথলেটিক বিলবাও থেকে তাঁকে ৮ কোটি ইউরোতে কিনেছিল চেলসি। একই বছরে আলিসন বেকার রোমা থেকে লিভারপুলে যোগ দেন ৭ কোটি ২৫ লাখ ইউরোতে, তালিকায় এখনো যিনি দ্বিতীয়। আরও পেছনে গেলে ২০০১ সালে পার্মা থেকে জিয়ানলুইজি বুফনকে কিনতে জুভেন্টাস খরচ করেছিল ৫ কোটি ২ লাখ ৮৮ হাজার ইউরো।

বিস্ময়করভাবে এ তালিকায় ৫ কোটি ইউরো ছাড়ানো গোলরক্ষক মাত্র চারজন। ২০২৩ সালে ৫ কোটি ২ লাখ ইউরোতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে গিয়েছিলেন আন্দ্রে ওনানা। ট্রাফোর্ডের দলবদল সম্পন্ন হলে তিনি হবেন ইতিহাসের পঞ্চম দামি গোলরক্ষক।
অথচ সব মিলিয়ে দলবদলের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়ের তালিকায় কেপা নিজেই গতকাল পর্যন্ত সেরা ৪০-এ নেই। অন্য গোলরক্ষকেরা যে আরও অনেক পেছনে, তা তো বুঝতেই পারছেন।

পার্থক্য কতটা, সেটা অন্য পজিশনের খেলোয়াড়দের সঙ্গে তুলনা করলে কিছুটা স্পষ্ট হবে। সেই ২০১৩ সালে ওয়েলস ফরোয়ার্ড গ্যারেথ বেলকে টটেনহামের কাছ থেকে ১০ কোটি ইউরোতে কিনেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। ফরাসি মিডফিল্ডার পল পগবা ২০১৬ সালে জুভেন্টাস ছেড়ে ইউনাইটেডে গিয়েছিলেন ১০ কোটি ৫০ লাখ ইউরো ট্রান্সফার ফিতে। এমনকি ডিফেন্ডারদের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের ব্যয় এখন নিয়মিত দৃশ্য। ২০১৯ সালে হ্যারি ম্যাগুয়ারকে ৮ কোটি ৭০ লাখ ইউরোতে কিনেছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। এরপর গতকাল পর্যন্ত আরও ১৯ জন ডিফেন্ডারের দাম উঠেছে অন্তত ৫ কোটি ৮০ লাখ ইউরো। তাহলে গোলরক্ষকেরা পিছিয়ে কেন?

এর সবচেয়ে সহজ উত্তর, আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা বরাবরই বেশি আকর্ষণীয়। তাঁদের মূল্য মাপাও তাই সহজ। গোলের সংখ্যা, ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত, সবই চোখে পড়ে। ফলে ক্লাবের বোর্ডরুমে তাঁদের জন্য বড় অঙ্ক খরচ করার কারণ বোঝানো সহজ।

১৯৭৭ সালের ব্রায়ান ক্লফের একটা গল্প বলা যাক। সেই সময়ে নটিংহাম ফরেস্টের কোচ ক্লফ গোলরক্ষক পিটার শিলটনের জন্য ২ লাখ ৭০ হাজার পাউন্ড খরচ করতে চেয়ে বোর্ডের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। বোর্ডের এক সদস্য নাকি প্রশ্ন তুলেছিলেন: যে খেলোয়াড় ম্যাচের ৮৫ মিনিট কিছুই করে না, তার জন্য এত টাকা কেন?

এই মানসিকতা বহু বছর ধরে গোলকিপারদের দলবদলে প্রভাব ফেলেছে। যদিও এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ক্লাবগুলো আধুনিক স্কাউটিং ও ডেটা বিশ্লেষণের সাহায্যে খেলোয়াড়দের মূল্য নির্ধারণ করে। কিন্তু গোলরক্ষকদের ক্ষেত্রে সমস্যা থেকেই গেছে।
২০১২ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত লিভারপুলের গবেষণা পরিচালক ছিলেন ইয়ান গ্রাহাম। ‘হাউ টু উইন দ্য প্রিমিয়ার লিগ’ বইয়ের এই লেখক দ্য অ্যাথলেটিককে বলেন, ‘গোলরক্ষকদের বিশ্লেষণ করা এখনো কঠিন। শট ঠেকানো ডেটায় ধরা পড়ে ঠিকই, কিন্তু ক্রস ধরতে বের হওয়া উচিত ছিল কি না, কর্নারে সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল কি না, এসব বোঝার জন্য উন্নত ট্র্যাকিং ডেটা লাগে। বেশির ভাগ ক্লাবের সেই সক্ষমতা নেই।’

ইয়ান গ্রাহামের কথা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, গোলরক্ষকদের নিয়ে তৈরি হয় একধরনের দুষ্টচক্র। অসম্পূর্ণ তথ্য থেকে ভুল সিদ্ধান্ত, সেখান থেকে ব্যর্থ দলবদল, আর তারপর বিনিয়োগে অনীহা।

গ্রাহামের মতে, সাম্প্রতিককালে গোলরক্ষকদের অনেক বড় অঙ্কের দলবদল সফল হয়নি। এর একটি কারণ বিশেষায়িত স্কাউটিংয়ের অভাব। বেশির ভাগ ক্লাবেই গোলরক্ষণ কোচ যিনি থাকেন, তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই কাজ করেন।

চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলে, এমন একটা ক্লাবের এক স্কাউট যেমন নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য অ্যাথলেটিককে বলেছেন, গোলরক্ষক সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান সীমিত। অন্য কোনো পজিশনের ক্ষেত্রে এমনটা ভাবাই যায় না। তাঁর কথায়, ‘উইঙ্গারদের সম্পর্কে জানি না, এ কথা কেউ বলবে না। কিন্তু গোলরক্ষকের ক্ষেত্রে এটা স্বাভাবিক।’

ব্যাতিক্রমও আছে। লিভারপুল যেমন অনেক আগেই হান্স লাইটার্টকে গোলরক্ষণ-পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল এবং তিনি আলাদাভাবে গোলরক্ষকদের ডেটা সংগ্রহ করতেন। সেই প্রক্রিয়াই আলিসনের মতো সফল সাইনিংয়ে ভূমিকা রেখেছিল। তবে সব ক্লাবের সেই সামর্থ্য নেই।

বায়ার লেভারকুসেনে একসময় দলবদল আর স্কোয়াড পরিকল্পনার কাজ করেছেন দেভিন ওজেক। সাম্প্রতিককালে তিনি ছিলেন ফেনারবাচের স্পোর্টিং ডিরেক্টর। দ্য অ্যাথলেটিককে ওজেক বলেন, গোলরক্ষকদের বাজার আলাদা হওয়ার আরেকটি কারণ স্থিতিশীলতা। ওজেকের ব্যাখ্যা, ‘দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করাটা এখানে কিছুটা সহজ। এই পজিশনে খুব বেশি পরিবর্তনের দরকার হয় না। একবার গোলরক্ষক সই করালে অনেক সময় তিনি থেকে যান পাঁচ, ছয়, সাত এমনকি আট বছর। ফলে প্রতি মৌসুমে নতুন করে বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে না।’

তাঁর সঙ্গে ইয়ান গ্রাহামও একমত। তাঁর কথায়, ‘শীর্ষ দলগুলোর অনেকের প্রতি মৌসুমেই এক-দুজন নতুন ফরোয়ার্ড বা মিডফিল্ডার দরকার হয়, কিন্তু ভালো একজন গোলরক্ষক থাকলে হয়তো পাঁচ বছরে একবারই নতুন ১ নম্বর গোলরক্ষক লাগে।’

আরেকটি বড় কারণ সরবরাহ ও চাহিদা। শীর্ষ মানের গোলরক্ষক খুব বেশি নেই। যাঁরা আছেন, তাঁরা বেশির ভাগ শীর্ষ ক্লাবেই খেলছেন। ফলে বাজারে তাঁদের প্রাপ্যতা কম। জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মাকে গত বছর পিএসজির কাছ থেকে কিনেছে ম্যান সিটি। এর বাইরে গত কয়েক বছরে শীর্ষ মানের গোলরক্ষক কেউ দল বদল করেছেন, এমন উদাহরণ আসলে নেই বললেই চলে।

সব মিলিয়ে গোলরক্ষকের বাজারটা যেন আলাদা এক জগৎ। তাঁরা অপরিহার্য, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁদের প্রকৃত মূল্য কত হওয়া উচিত, ক্লাবগুলো ঠিক কতটা খরচ করবে, এই প্রশ্নের উত্তর যেন কেউই জানে না।