লুসাইলের সেই মহাকাব্যিক রাতের পর প্রায় সাড়ে তিন বছর কেটে গেছে। কিন্তু কিছু রাত আসলে কখনো শেষ হয় না। প্যারিসের কোনো এক নিরিবিলি সন্ধ্যায়, হয়তো নিজের ড্রয়িংরুমের নরম আলোয় বসে কিলিয়ান এমবাপ্পে যখন চোখ বন্ধ করেন, তাঁর চোখে কি এখনো ভেসে ওঠে মার্তিনেজের সেই অবিশ্বাস্য সেভটার দৃশ্য! কিংবা শুনতে কি পান পেনাল্টি শুটআউটের পর আকাশি-সাদা রঙের সেই বাঁধভাঙা উৎসবের গর্জন!
অতিমানবীয় এক হ্যাটট্রিক করেও যে ট্রফিটা ছোঁয়া হয়নি, সেই শূন্যতা আসলে গোল্ডেন বুটের পুরস্কার দিয়ে ঢাকা যায় না। এমনিতে তাঁর বিশ্বকাপ জেতা হয়ে গেছে মেসির চার বছর আগেই। তারপরও সম্প্রতি ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা পারিসিয়েন-এ সতীর্থ ওয়ারেন জাইর-এমেরি যখন সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, সুযোগ থাকলে ক্যারিয়ারের কোন ম্যাচটা আবার নতুন করে খেলতে চান, এমবাপ্পে লুকোছাপা করেননি। উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আর্জেন্টিনার বিপক্ষের ২০২২-এর ফাইনালটা। পারলে সেই ম্যাচের ফল বদলে দিতাম।’
সেই ম্যাচের ফল তো আর বদলানোর সুযোগ নেই, তবে যে বিশ্বকাপ ট্রফিটা তাঁর কাছে থেকে লিওনেল মেসি নামের এক জাদুকর কেড়ে নিয়েছিলেন, সেটা ফেরত আনার আরেকটা সুযোগ আবার এসেছে এমবাপ্পের সামনে। সমস্যা একটাই, মেসি যে এবারও আছেন!
নতুন করে দুজনেরই বিশ্বকাপ মিশন শুরু হচ্ছে প্রায় কাছাকাছি সময়ে। বাংলাদেশ সময় আজ রাত একটায় সেনেগালের বিপক্ষে মাঠে নামবে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স। তার কয়েক ঘণ্টা পর, আগামীকাল সকাল সাতটায় কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে আলজেরিয়ার মুখোমুখি হবে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।
কিছু খেলোয়াড় মাঠে নামেন ম্যাচ জিততে, আর কিছু নামেন সময়কে থমকে দিতে। মেসি এখন পরের ঘরানার প্রতিনিধি। ইউরোপের ঝলমলে আলো ছেড়ে ইন্টার মায়ামির হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাঠে যখন তিনি খেলেন, তখন প্রাত্যহিক তীব্রতার চেয়ে ফুটবলীয় আনন্দটাই তাঁর কাছে মুখ্য। অনেকেই ভেবেছিলেন, কাতারেই শেষ। খোদ মেসির মনেও ছিল সংশয়। কিন্তু ফুটবল এমনই সম্মোহনী, যার মায়া কাটানো সহজ নয়। তাই সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব উড়িয়ে মেসি আবার এসেছেন। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ২০ মিনিটের উজ্জ্বল উপস্থিতি আর পেনাল্টি থেকে গোল প্রমাণ করেছে—হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট বা বয়সের জ্যামিতি, কোনো কিছুই তাঁর বাঁ পায়ের ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারেনি। তাই তো এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার বা রদ্রিগো দি পলরা এখনো মাঝমাঠ থেকে সামনে তাকালেই দেখতে পান সেই চেনা ১০ নম্বর জার্সি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামলেই যিনি পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও কুয়েতের বদর আল-মুতাওয়ার পর ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচের মাইলফলক ছোঁবেন। যে স্বপ্ন নিয়ে মেসি বিশ্বকাপে নামছেন, সেটা সত্যি হলে সংখ্যাটা ২০৭ হয়ে যেতে পারে ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে।
৮টা ম্যাচ না খেলে এই বিশ্বকাপ থেকে ফিরে যাওয়ার কথা যে এমবাপ্পেও ভাবছেন না, এটা নিশ্চিত। কাতারের সেই ২৬ জনের মধ্যে তিনিসহ এখনো ১২ জন আছেন ফ্রান্স দলে। যাঁদের বেশির ভাগের বুকের ভেতরই হয়তো জ্বলছে কাতারের সেই ‘নিষ্ঠুর’ পেনাল্টি শুটআউটের প্রতিশোধের আগুন। লড়াই আসলে আরও একটা আছে।
আগের পাঁচটা বিশ্বকাপ মিলে মেসির মোট গোল ১৩টি। মাত্র দুই বিশ্বকাপ খেলেই এরই মধ্যে এমবাপ্পের গোল হয়ে গেছে ১২। মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ১৬ গোলের রেকর্ড হাতছানি দিয়ে ডাকছে দুজনকেই। কেউ কাউকে ছাড় দেবেন না নিশ্চিত।
কাতার ফাইনালে এমবাপ্পের সেই গোল্ডেন বুট জয় আর মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি ওঠার দৃশ্যটি আসলে এক মহাকাব্যিক ব্যাটন বদলের মুহূর্ত হতে পারত। কিন্তু মেসি সেই ব্যাটন পুরোপুরি ছেড়ে দিতে রাজি হননি। কেড়ে নেওয়া ছাড়া আর উপায় কী!
আজ রাতে তাই যখন এমবাপ্পে দৌড় শুরু করবেন আর আগামীকাল ভোরে যখন মেসি বল পায়ে প্রথম টার্নটা নেবেন, তখন আসলে কোনো নতুন খেলা শুরু হবে না। শুরু হবে লুসাইলের সেই অসমাপ্ত উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ড।
যার পাতায় পাতায় থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য দারুণ রোমাঞ্চ।